Total Pageviews

Showing posts with label অভিযাত্রী. Show all posts
Showing posts with label অভিযাত্রী. Show all posts

Saturday, October 1, 2011

স্বপ্ন পূরণের সারথি

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্লাস নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী একজন শিক্ষক সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্লাস নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী একজন শিক্ষক
ছবি: প্রথম আলো
অভাবের সংসারে ইরফানের জন্ম। একদিন বাবা মারা গেলেন। ইরফান তখন মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে। থমকে দাঁড়াল লেখাপড়া শিখে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন। সংসারের হাল ধরতে ওই বয়সেই কাজ নিতে হলো পাটকলে।
তবে ইরফানের স্বপ্ন থমকে দাঁড়াতে দেয়নি ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মানুষ হওয়ার স্বপ্নের জাল বুনছেন।
শুধু ইরফান নন, তাঁর মতো অন্তত ৪০০ শিক্ষার্থী ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’র সহায়তায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সারথি একজন হাফিজুর রহমান। তিনিই গড়ে তুলেছেন বিনা পয়সার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’। নরওয়ে প্রবাসী হাফিজুরের বাড়ি খুলনা মহানগরের ফুলবাড়ী গেটে। নগরের যোগীপোল এলাকায় চলছে তাঁর এ শিক্ষা কার্যক্রম।
যেভাবে শুরু: স্কুলে পড়ার সময় থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা ভাবতেন হাফিজুর রহমান। স্বপ্ন দেখতেন, একটি দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষিত সমাজের। সেই স্বপ্নের কাজ শুরু করেন নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন। তখন থেকেই বাড়ির পাশের বস্তির শিশুদের বাড়িতে এনে বিনা পয়সায় পড়াতেন। পুরো ছাত্রজীবনে এটা চালিয়ে যান। ২০০৫ সালে সাতটি শিশুকে বই-খাতা কিনে দিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন তিনি। একই বছর উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে নরওয়ে চলে যান। তবে সেখানে গিয়েও ওই সব শিশুর কথা ভোলেননি। ওদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেন ভাগনে আল আমিনকে।
আল আমিন নিজের বাড়ির একটি কক্ষে মাদুর বিছিয়েই ওদের পড়াতেন। মামা-ভাগনের এই উদ্যোগের কথা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বিষয়টি মামাকে জানান আল আমিন। মামা নরওয়ে থেকে তাঁর বৃত্তির অর্থ থেকে একটি অংশ পাঠিয়ে দেন। সেই অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি বেঞ্চ, একটি ব্ল্যাকবোর্ড ও কিছু বই-খাতা কেনেন আল আমিন। চালিয়ে যান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর কাজ।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: হাফিজুর রহমানের এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০০৮ সালে গঠিত হয় ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’ (এডুকেশন ফর ডিপ্রাইভ স্টুডেন্ট), সংক্ষেপে ইডিএস। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন হাফিজুরের বৃত্তি থেকে পাঠানো অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে নরওয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পান হাফিজুর। তাঁর বেতন থেকে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা করে পাঠানো শুরু করেন। ওই বছর প্রতিষ্ঠানের জন্য আট লাখ টাকা দিয়ে নগরের যোগীপোল এলাকায় একটি একতলা ভবন কেনা হয়। পরের বছর ওই ভবনে পড়ানোর কাজ শুরু করেন আল আমিন। শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমে পড়ানো শুরু করেন।
শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ায় ওই ভবনেও জায়গা হচ্ছিল না। তাই ভবনের পাশের গোলপাতার ছাউনির একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়। এখানে সকাল ও বিকেলে পালা করে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ২০০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চলছে।
কিন্তু শিক্ষার্থী আরও বাড়তে থাকায় সোনালী জুটমিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অ্যাজাক্স জুটমিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই পালায় আরও ২০০ শিক্ষার্থীকে পড়ানো হচ্ছে।
সাড়া: নগরের মহেশ্বরপাশা, কার্তিককুল, তেলিগাতি, খানাবাড়ী, জাবদিপুর, যোগীপোল, বণিকপাড়া, মানিকতলা, কালীবাড়ি, সেনপাড়া ও ফুলবাড়ী গেটসহ বিভিন্ন এলাকার হতদরিদ্র ও স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তানেরা এখানে পড়ছে। অভাবী পরিবারের যে শিশুরা ভিক্ষা, দিনমজুরি বা চুরিতে জড়িয়ে পড়েছিল, হাফিজুরের প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এখন তারা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিনোদন, খেলাধুলা ও বনভোজনেরও ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। ভালো ফলের জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।
এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা অনেকেই ভালো ফল করছে। চলতি বছর এখানে পড়াশোনা করেছেন এমন ১২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষা দেন। সবাই পাস করেছেন। একজন জিপিএ ৫ পেয়েছেন। যাঁদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তাঁরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংয়ের ফিও দিচ্ছেন হাফিজুর।
শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবক: আটজন শিক্ষককে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে। সঙ্গে রয়েছেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী। তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমে পড়াচ্ছেন। সঙ্গে আছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মতিউল ইসলাম ও খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক বিষ্ণু সরকার।
স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেলিম রেজা বলেন, ‘হাফিজুর রহমানের এমন মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে অংশীদার হতে পেরে আমি গর্বিত।’
ওদের কথা: নগরের ফুলবাড়ী গেটের হোটেল কর্মচারী আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে মারিয়া বেগম। তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। হাফিজুরের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয় তাকে। এখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। ‘হাফিজুর ভাই না হলে ক্লাস এইটে ওঠা হতো না।’ জানাল, মারিয়া।
ভ্যানচালক আবুল গাজীর মেয়ে জান্নাতুল আখতার। পঞ্চম শ্রেণীর পর সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছিল না। এখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। জান্নাতুল বলে, ‘হাফিজুর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে বিনা পয়সায় পড়ছি। এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছি।’
নরসুন্দর বিষ্ণুপদ সরকারের ছেলে গৌরাঙ্গ সরকার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। ছেলেকে ওই প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রসঙ্গ তুললে বিষ্ণুপদের উত্তর, ‘প্রাইভেট পড়াতে না পারায় ছেলে পড়াশোনায় ভালো করছিল না। ওখানে পাঠানোর পর ভালো করছে।’
তাঁরা যা বলেন: প্রায় শুরু থেকেই হাফিজুর রহমানের উদ্যোগের সঙ্গে আছেন আল আমিন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ‘মামার এই উদ্যোগে সহায়তা করতে পেরে আমি গর্বিত। তাঁর মতো মানুষ আমাদের সমাজের দৃষ্টান্ত।’ বলেন, আল আমিন।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান কে এম আজহারুল জানান, তিনি কয়েকবার ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটা ভালো উদ্যোগ। এতে উৎসাহ দিতে আমার বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওখানে স্বেচ্ছাশ্রমে ক্লাস নিতে উদ্বুদ্ধ করেছি। অনেকে ক্লাসও নিচ্ছে।’
মুঠোফোনে কথা হয় হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান তাঁর স্বপ্নের কথা। ‘এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করবে। দেশ ও জনগণ এগিয়ে যাবে। জানি কঠিন কাজ, তার পরও চেষ্টা থাকবে।’ বলে যান তিনি, ‘প্রতিষ্ঠানটি আমার প্রাণ। এটি আরও বড় করার ইচ্ছা আছে। আমার স্বপ্ন সেদিনই সার্থক হবে, যেদিন সুবিধাবঞ্চিত এই শিক্ষার্থীরা শিক্ষিত হয়ে সমাজে আলো জ্বালাবে

Friday, September 16, 2011

দীপ জ্বেলে যাই

পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে
ছবি: প্রথম আলো
ছেলে অসুস্থ। ওষুধ খাওয়াতে হবে। আশপাশে কেউ নেই যে সাহায্য নেবেন। গ্রামের নিরক্ষর মা ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। একপর্যায়ে ওষুধ মনে করে ঘরে থাকা কীটনাশক ছেলের মুখে তুলে দিলেন। যখন বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে।
মর্মান্তিক এ ঘটনা প্রতিবেশী এক তরুণের মনে নাড়া দেয়। ওই তরুণ ভাবেন, ওই মা যদি লিখতে-পড়তে পারতেন, তবে হয়তো এমন ভুল করতেন না। এসব মানুষকে শিক্ষার আলো দেওয়ার ব্রত নেন তিনি। সেই ব্রত থেকেই গ্রামে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। গৃহশিক্ষকতা করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যাত্রা শুরু সেই পাঠশালার, যেটি পরিচিতি পায় ‘জনির স্কুল’ নামে।
তরুণের নাম নজরুল ইসলাম জনি। পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে তাঁর বাড়ি। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। পড়াশোনা করেছেন এইচএসসি পর্যন্ত। এরপর ওই স্কুল নিয়েই ব্যস্ত।
শুরুর কথা: মন নাড়া দেওয়া ওই ঘটনাটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের। এ ছাড়া লেখাপড়া না জানায় গ্রামের সাধারণ মানুষের নানাভাবে প্রতারণার শিকার হওয়া, শিশু ও নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, মাদকের ছোবল তো আছেই। বিষয়টি ভাবায় জনিকে। তিনি চিন্তা করেন, শিক্ষাই এর সমাধান। এসব নিয়ে আলোচনা করেন সহপাঠী একই গ্রামের একরামুল হাসানের সঙ্গে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন পাঠশালা গড়বেন। দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেন জনির বাড়ির পাশের সুপারির বাগানে গ্রামের নিরক্ষরদের পড়ানো হবে।
জনি ও একরামুল তাঁদের ইচ্ছার কথা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানান। নিরক্ষর নারী-পুরুষকে পড়তে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নারীদের ঘর থেকে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে খোলা আকাশের নিচে শুরু হয় লেখাপড়া। প্রথমদিকে সেখানে পড়তে আসত মাত্র ১৮ থেকে ২০ জন। দুটি পালায় পড়ানো শুরু হয়। বিকেলে পড়েন নারীরা, রাতে পুুরুষেরা। জনির প্রাইভেট পড়ানোর টাকায় কেনা তিনটি হারিকেন ও পাঁচ লিটার কেরোসিন তেল দিয়ে শুরু হয় রাতের পড়া।
দিনের পালায় পড়ানো ভালোমতো চললেও রাতের পালায় সমস্যা হতো। কারণ, কেরোসিন কেনার খরচ কম নয়। একপর্যায়ে একরামুলের সহায়তা আর পান না জনি।
জনির হার না মানা মানসিকতা দেখে এগিয়ে আসেন গ্রামের দিনার চৌধুরী। দুজনে মিলে স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের বই, খাতা-কলম, চক-ডাস্টার, বসার চট, মোমবাতি-হারিকেনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করেন। তার পরও যেন এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না। জনির উদ্যোগের কথা জানতে পেরে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা এগিয়ে আসেন।
জনির বাড়ির উঠানে টিনের চালা করে বানানো হয় পাঠশালা। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে তিন পালায় চলছে পাঠদান। দুপুরের পালায় পড়ানো হয় শিশুদের। বর্তমানে এ পালায় সুবিধাবঞ্চিত ৩৬টি শিশু পড়াশোনা করছে। বিকেলের পালায় পড়ছেন ৩০ জন নারী। আর রাতের পালায় পড়েন ২৫ থেকে ৩০ জন পুরুষ। কাউকে বেতন দিতে হয় না।
পাঠশালার শিক্ষক বলতে জনি নিজেই। শিশুরা ছয় মাস এখানে পড়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়। বয়সী নারী-পুরুষেরাও ছয় মাস এখানে পড়েন।
আরও কিছু: জনির পাঠশালায় লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রথা রোধ, ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি, মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বিপদে-আপদে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করা, সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা, বাড়িতে ছোটখাটো খামার তৈরি, শাকসবজির বাগান, হাঁস-মুরগি-কবুতর, গরু-ছাগল পালনেও উদ্বুদ্ধ করা হয়।
একদিন পাঠশালায়: জনির পাঠশালায় ঢুকে দেখা গেল, দুই সারিতে বসে শিশুশিক্ষার্থীরা বই নিয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার জানাল, সে আগে স্কুলে যেতে পারেনি। এখন জনির স্কুলে এসে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক সব বিষয় পড়ছে।
কথা হলো বিকেলের পালায় পড়তে আসা গৃহবধূ আছিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি বললেন, পড়তে না পারায় ওষুধ ভেবে ছেলেকে কীটনাশক খাইয়েছিলেন। সেই যন্ত্রণা এখনো ভোগ করছেন। এ স্কুলে এসে এখন পড়া ও লেখা দুটোই পারেন। ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে পারিনি। কম বয়সেই বিয়ে হয়। পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল। এখন এই স্কুলে এসে পড়াশোনা করছি।’ বলছিলেন গৃহবধূ মমতাজ বেগম। গৃহবধূ সহিদা বেগম বললেন, প্রথম প্রথম পড়তে আসতে লজ্জা লাগত। কিন্তু এখন ভালোই লাগছে।
সারা দিন খাটা-খাটুনির পর রাতের পালায় পড়তে আসেন মনজুর রহমান (৪০)। ‘পড়াশোনা না জানলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এখন পড়তে ও লিখতে পারি।’ সরল উত্তর মনজুরের।
অন্যদের কথা: জনির সহযোগী দিনার বলেন, ‘জনির মহ ৎ উদ্যোগ আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। তাই ওঁর সঙ্গে যোগ দিই। এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পেরে ভালোই লাগছে।’
জনির বাবা আবদুস ছাত্তার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আবদুস ছাত্তার বলেন, এ কাজকে প্রথমদিকে ছেলের পাগলামি মনে হতো। এখন সবাই ছেলের প্রশংসা করে। খুব গর্ব হয়।
পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মো. মজাহারুল হক প্রধান এ উদ্যোগের প্রশংসা করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। একই কথা বলেন পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলাম। তিনি স্কুলের উন্নয়নে সহযোগিতাও করেছেন।
জনির ইচ্ছা: এরই মধ্যে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন জনি। সাক্ষরতাদানে বিশেষ অবদান রাখায় ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে জেলা প্রশাসন জনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্মাননা সনদ’ দিয়েছে।
জনি বলেন, ‘ইচ্ছা আছে পাঠশালার জন্য একটি পাকা ঘর তৈরি করার। সেখানে বিদ্যু ৎ, পানীয় জল এবং শৌচাগার থাকবে। এ ছাড়া সুযোগ পেলে এ এলাকার প্রতিটি গ্রামে এমন একটি করে পাঠশালা গড়ে তুলব।

Sunday, June 12, 2011

বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর বিস্ময়কার আবিষ্কার



undefined
এক বাংলাদেশী বিজ্ঞানীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলছে তোলপাড়। মূল ধারার বিভিন্ন মিডিয়াতে এখন তাকে নিয়েই আলোচনা-পর্যালোচনা। এ সময়ের প্রত্যাশিত সর্বশেষ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন তিনি। এই বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর নাম ড. আনিসুর রহমান। তিনি বর্তমানে পেনসিলভানিয়ার হেরিসবার্গের বাসিন্দা।
বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারপোর্টসহ নিরাপত্তা এলাকাগুলোতে যখন দেহ তল্লাশি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক, তখন তিনি আবিষ্কার করেছেন একটি বিস্ময়কার প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো মানুষের শরীরে বিস্ফোরকের যেকোনো উপাদান থাকলে সেটি এমনিতেই ধরা পড়বে। এ জন্য বর্তমানের এক্সরে মেশিনের প্রয়োজন হবে না।

আমরা সত্যিই মানবকল্যাণে এমন একটি কাজ করছি, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী


undefined
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালমানের ‘খান একাডেমি’ পেয়েছে ‘গুগুল’-এর ২০ লাখ ডলার মূল্যমানের পুরস্কার। এক লাখ চুয়ান্ন হাজার প্রকল্পের মধ্য থেকে শিক্ষা বিভাগে সেরা নির্বাচিত হয়েছে খান একাডেমির বিনা মূল্যে শিক্ষামূলক অনলাইন ভিডিও টিউটরিয়াল। এই অর্জনের খবর পেয়ে আমরা ‘স্বপ্ন নিয়ে’র পক্ষ থেকে সালমানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ৩ অক্টোবর সালমান ই-মেইলে জানান তাঁর স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা।
২০ লাখ ডলারের পুরস্কার পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। খান একাডেমি এত দিন স্বল্প পুঁজি নিয়ে কাজ করছিল, এই পুরস্কার আমাদের সামনের ধাপে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। এত এত যোগ্য ও ভালো প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে খান একাডেমিকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, আমরা সত্যিই মানবকল্যাণে এমন একটি কাজ করছি, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এক মাসে আমাদের পোর্টালে পাঁচ লাখ ব্যবহারকারী নিবন্ধন করেছে এবং এখানে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ বার ভিডিও দেখা হয়েছে, যার পেছনে মোটামুটি আমার নিজের শ্রম ছাড়া তেমন কোনো ব্যয়ও হয়নি। এখন আমরা কিছু পেশাদার প্রকৌশলী নিয়োগ দিতে পারব, তখন বিশ্বের শীর্ষ ভাষাগুলোয় এ তথ্য অনুবাদ করা সম্ভব হবে।

স্বপ্নচূড়ায় সালমান


undefined
ছোট্ট একটা ঘর। দেয়ালগুলো ছাওয়া হালকা সবুজ রঙে। বইপত্রে ঠাসা পুরো জায়গাটা। একটা টেবিল, কাঠের গদিওয়ালা চেয়ার, প্রিন্টার আর কম্পিউটার—ঘরের আসবাব বলতে এগুলোই। এখানেই দিনমান কাজ করে যান টগবগে যুবক সালমান খান। অনেক দায়িত্ব তাঁর। বুক ভরা অনেক অনেক স্বপ্ন। প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য নির্ভর করে তাঁর ওপর। সংখ্যাটা কোটিতে নিয়ে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। লাখো অভিভাবকের আশীর্বাদ আছে সঙ্গে। কাজে গাফিলতি করার উপায় নেই তাই একদমই। ভোর হলেই জানালার কাচ ভেদ করে হুড়মুড়িয়ে আলো ঢোকে তাঁর ঘরে। ঘুমে ঢুলুঢুলু। সামান্য কিছু মুখে দিয়েই নিজের চেয়ারটাতে বসে যান তখন সালমান। মনিটরে চোখ রেখে ভাবতে থাকেন শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো নিয়ে। একটানা চলে কাজ। গণিত ও বিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানের জন্য ইউটিউবে এক হাজার ৬৩০টি ভিডিও দিয়েছেন সালমান। প্রতিদিন কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থীরা প্রায় সত্তর হাজারবার সাহায্য নেয় এ ভিডিওগুলো থেকে। আনন্দদায়ক এক পদ্ধতিতে গণিত ও বিজ্ঞানের নিরস বিষয়গুলো আয়ত্ত করে নেয় সবাই। অল্প সময়ের ভেতর এত শিক্ষার্থীকে সহজ পদ্ধতিতে শিক্ষা দিতে পেরে আনন্দে ভরে যায় মন। সালমানের আনন্দে খুশি হন তাঁর স্ত্রী উমাইয়া মারভিও। চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় স্বামীর ওপর যে অভিমানটা ছিল এত দিন, উবে যায় তা নিমেষেই।

তিন তরুণের স্বপ্ন-উদ্যোগ


undefined
তাঁদের মাথায় ঘুরতে থাকে ‘আইডিয়া’। একটি ভাবনা নিয়ে তিনজন মগ্ন থাকে দিনের পর দিন। সেই ভাবনাই এনে দেয় পুরস্কার। বদলে দেয় তাঁদের জীবন। বলছি সাবাবা ইসলাম, সিফাত সারোয়ার ও সাজ্জাদুর রহমানের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী তাঁরা তিনজন।
‘এখন আমরা তৃতীয় বর্ষে পড়ছি। এর আগে দুই বছর তরুণ উদ্যোক্তা পুরস্কারে শুধু বড়দের অংশগ্রহণ দেখতে গিয়েছি। এবার ভাবলাম নিজেরাই করি। দেখি পারি কি না। নানা আইডিয়া মাথায় ঘুরতে লাগল। একই ক্লাসের হওয়ায় আমরা একে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করতাম। তবে এ প্রকল্পের চিন্তাটা প্রথম আসে সাজ্জাদের মাথায়। কৃষিভিত্তিক এমন কিছু, যা পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু কীভাবে করব বুঝতে পারছিলাম না। এরপর এ বিষয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করি। ইন্টারনেটে নানা তথ্য পাই। এগিয়ে যেতে থাকে কাজ।’ শুরুর কথা এভাবেই বলেন সাবাবা।
‘এইচএসবিসি তরুণ উদ্যোক্তা পুরস্কার ২০০৯-১০’ বাংলাদেশ পর্ব জয় করার পথে তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথাও শোনা গেল। চূড়ান্ত পর্বে যখন জানা গেল, ওঁরাই সেরা, তখন অদ্ভূত এক আনন্দে ভরে গেল ওদের মন। গত পাঁচ মাস এই তিনজন ছিলেন যেন ঘোরের মধ্যে। সেই ঘোর এখনো কাটেনি। তাঁরা তাঁদের স্বপ্নকে নিয়ে গেছেন এক ধাপ এগিয়ে। এই তরুণেরা প্রমাণ করতে পেরেছেন নিজেদের। পরিচিত করেছেন উদ্যোক্তা হিসেবে।
এখন তাঁরা কেমন আছেন, তা জানা যাক। সকালে পরীক্ষা। মাঝে খানিকটা বিরতি। দুপুরে ফের পরীক্ষা। এরই ফাঁকে কথা হয় ওদের সঙ্গে। ‘কাজের জন্য পড়ার বেশ ব্যাঘাত হয়েছে। এখন তা পুষিয়ে দিতে হচ্ছে।’ জানালেন ওরা। এভাবেই নিজেদের কথা শুরু করেন। জানান গত পাঁচ মাসের ঘোরলাগা দিনের গল্প। সেই ঘোর এখনো কাটেনি তাঁদের। একটি পুরস্কার বদলে দিয়েছে জীবন।
‘কী কাজ করেছেন আপনারা। কোন কাজ এনে দিল এত বড় একটি পুরস্কার?

একটা সাগর কীভাবে হারিয়ে ফেললাম!


undefined
দলপতির আশকারা পেয়েই দলছুট হওয়ার সাহসটা পেয়েছিলাম; বুঝতে পারিনি যে পরিণতি মোটেই সুখকর হবে না। এখন উপকূলটা কোন দিকে, সেটাই আমি ঠাহর করতে পারছি নে। দল ছেড়ে দক্ষিণমুখো হওয়ার সময় মনে হয়েছিল, ম্যাকারনির বাসা দেখে ফিরতি পথে এই ছোট পাহাড়টা ডিঙিয়ে গেলেই উপকূলের নাগাল পাব, তারপর সৈকত ধরে আধাঘণ্টা জোর-কদম হাঁটলে মূল দলকে ধরে ফেলতে পারব। ম্যাকারনির ছবি তুলে বাঁয়ের পাহাড় ছাড়িয়ে আরও দুটো পাহাড় পার হয়েছি; এখন দেখি চারদিকে বরফঢাকা পাহাড় আর পাহাড়, সৈকতের কোনো চিহ্ন নেই। ম্যাকারনির খোঁজে ‘ব্রাউন ব্লাফ’ উপকূল থেকে দক্ষিণে বড়জোর এক কিলোমিটার দূরে গেছি; এখন ফিরতি পথে প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর পানি তো নজরে আসেই নি, ঢেউয়ের শব্দও কানে আসছে না। দলছুট হয়ে দেড় ঘণ্টার মধ্যে একটা আস্ত সাগর আমি কীভাবে হারিয়ে ফেললাম বুঝি নে!
ঘণ্টা দুই আগে আমরা একটা সাদামাটা হিমবাহের শিখরে উঠেছিলাম; সবাই আগ্রহ নিয়ে আজ ট্র্যাকিংয়ে এসেছে হিমবাহ পার হয়ে একটা ফিয়র্ড দেখা আর ১০ হাজার জেন্টু পেঙ্গুইনের বিশাল এক কলোনির ছবি তোলার জন্য। হিমবাহ থেকে নেমে সবাই বাঁয়ে মোড় নিয়ে ফিয়র্ড দেখতে যাবে, তারপর সৈকত ধরে ট্র্যাকিং করবে জাহাজের দেখা না পাওয়া পর্যন্ত। হিমবাহ থেকে নেমে আর সবার মতো উত্তরমুখো না হয়ে দক্ষিণে এগিয়ে গেলে ১৫ মিনিট পর একডজন ম্যাকারনি পেঙ্গুইনের একটা খুদে কলোনি দেখা সম্ভব—এই সংবাদটা গোপনে আমাকে দিয়েছিল ল্যারি হব্স। ল্যারি আমাদের

‘আর এগিয়েছ কি মরেছ’


undefined
‘এই, হ্যালো, পিছে হটো, পিছে হটো, আর এগিয়েছ কি মরেছ।’ সাহেবি ভদ্রতার ধার না ধেরে অভিযাত্রীদের কানে তালা লাগিয়ে চিৎকার করে দলপতি বলল, ‘শিগগির পিছে আসো, পিছে চলে আসো, ওভার-হ্যাং ভেঙে পড়বে।’ আমার উদ্দেশেই এত সব চেঁচামেচি, আমিই ফালমারের ফটো তোলার জন্য দলছুট হয়ে হিমবাহের প্রান্তে চলে এসেছি। আর সব অভিযাত্রী লাঞ্চ-প্যাকেট নিয়ে দলপতির পাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছেন। সকালে লঙ্গিয়ার্বেনের উষ্ণ আস্তানা ছেড়ে অন্তহীন হিমবাহে নেমে টানা চার ঘণ্টা আইস-স্কুটার হাঁকিয়ে সবাই ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, স্তিমিত; ইতিউতি তাকানোর উৎসাহ নেই কারও, শুধু এই রাইফেলধারী হামবড়া দলপতিটা ছাড়া।
আমারও উৎসাহ ছিল না হিমবাহের কার্নিশে ঝুল-বারান্দার মতো লটকে থাকা জমাট বরফের ওভার-হ্যাং কত ভর নিতে পারে, তা পরখ করার। চার ঘণ্টা আইস-স্কুটারের ক্লাচ ধরে রাখার পর লাঞ্চের ঠোঙা ছেঁড়ার জোরটুকুও ছিল না আঙুলে। আমরা বারেন্টস আর গ্রিনল্যান্ড সাগরের উত্তরে চির-শুভ্র দ্বীপপুঞ্জ সভালবার্ডের হিমবাহ পার হচ্ছি। এপ্রিলের ১১ তারিখ, এখন এখানে ২৪ ঘণ্টা দিনের আলো। বরফ-ঢাকা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার জন্য আইস-স্কুটার অসাধারণ এক বাহন; কিন্তু মুশকিল হলো, সারাক্ষণ এর ক্লাচ চেপে ধরে রাখতে হয়, ক্লাচ ছাড়লেই চলা বন্ধ। যাত্রী পড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ স্কুটার নিশ্চল করার জন্যই এ ব্যবস্থা। ক্লাচ ধরার সহজ কাজটুকু এ মহা হিমের জগতে যে কী এক জ্বালাতন, তা দুই হাতের শীতল ও অচল পেশিগুলো প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছিল। তাই একটু শ্যাডো-বক্সিং করে জমাট পেশি সচল করার মতলবে দল থেকে সরে হিমবাহের কার্নিশের দিকে হাঁটা দিয়েছিলাম।

Saturday, June 11, 2011

‘মুসাআআআ! রোপ ধরে ওঠো’


undefined
স্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
‘প্রথম বা দ্বিতীয় বলে কোনো কথা এখানে নেই। এটা এভারেস্ট। এতে আরোহণ করতে হয় ধীরে ধীরে এবং নিজের গতিতে।’ ২৩ জুন দিবাগত রাত ১২টার পর যখন আকাশে চাঁদ ঝলমলিয়ে উঠল, সেই প্রায় সাড়ে আট হাজার মিটার উচ্চতায় তেনজিং নোরগের এ কথা মনে পড়ছিল বারবার। বাংলাদেশ থেকে এভারেস্টে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, দেশের লাল-সবুজ পতাকা এভারেস্টের চূড়ায় ওড়াতে হবে—ক্লাবের সেই অভিযানের সহযোদ্ধাদের কথা ভাবছিলাম। রিমি-রাইদের কথাও ঝিলিক দিয়ে মনে উদয় হচ্ছিল। ক্ষুদ্র পরিসরটা নিজের, কিন্তু এর সার্বিক অর্জন তো দেশের। দেশের জন্যই তো এ অভিযান। আরেকটা নতুন অভ্যুদয়। আরেকটা নতুন সূচনা এবং নিজের ক্ষেত্রে তা পুনর্জন্মের প্রসবপর্ব। সবই ছিল অনুপ্রেরণার বিষয়বস্তু। সুতরাং ২০১০ সালে এভারেস্ট অভিযানে যাত্রাটা সবার জন্য ছিল অবশ্যম্ভাবী। এক ধরনের প্রতিযোগিতাও। তবে তেনজিং নোরগে মননে, আরোহণে সঙ্গেই ছিলেন প্রেরণাদাতা হিসেবে। এভারেস্টের বেস ক্যাম্প ও অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে তার ম্যান অব এভারেস্ট: অটোবায়োগ্রাফি অব তেনজিং নোরগে বইটি পড়ে এভাবেই শিহরিত হয়েছিলাম বারবার। আর ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, ২৩ জুন ছিল সেই অভিযানের ৪৬তম দিন। বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর হিসাবে (১৪ এপ্রিল) তা ছিল ৪০তম দিন এবং প্রতিটি দিন ছিল নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার দিন। ‘আমিও পারি’ কথাটি প্রমাণ করার দিন।

এভারেস্ট জয়ের সেই সকালটি


undefined
স্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ
থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
কৈলাসের কথা শুনে গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে। সেই রক ফেসের ডান দিয়ে সরু একটা খাঁজ। তার ওপর ক্র্যাম্পন ঠেকিয়ে কোনোমতে পার হচ্ছি। এ পর্যায়ে এভারেস্টজয়ী ফিরতি দলের সঙ্গে একের পর এক সাক্ষাৎ হচ্ছে। তাদের যে অভিনন্দন জানাব, মনের সেই অবস্থাও নেই। সেই রাত আটটায় শুরু হয়েছিল ক্লাইম্বিং, এখন প্রায় ভোর। এর মধ্যে কোনো খাওয়া-দাওয়া নেই, পানিও খাওয়া হয়নি। তার পরও শরীরের শক্তির শেষবিন্দু ঠেলে দিচ্ছি পাহাড়ে ওঠার দিকে। মনের তাড়না ও জেদের প্রায় পুরো অংশ ব্যয় করছি। শুধুই ভাবছি—বিশ্বের কোনো একজন মানুষ এ কাজ পারলে তা আমিও পারব। এই ভেবে নিজেকে চাঙা রাখছি।
শেষ দিকে প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাড়া একটা ঢাল পেরোতেই চোখে পড়ল এভারেস্টের চূড়া। আমি আনন্দে আত্মহারা। সেটা মনের মধ্যে চেপে ধরে এগোতে শুরু করলাম।
এবার হেডল্যাম্প পুরোপুরি বেঁকে বসেছে। কোনো আলোই বেরোচ্ছে না হেডল্যাম্প থেকে। ভাবলাম—তাহলে এগোচ্ছি কী করে? পূর্ব দিগন্তে চোখ ফেরাতেই দেখি আকাশ ফরসা হয়ে আসছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সেই আলোতেই যতটুকু পথ দেখা যায়, মনের অজান্তে তাকেই ভরসা ধরে নিচ্ছি। যাক, বাঁচা গেল তাহলে, নামার সময় তাহলে আর সমস্যা হবে না—মনে মনে ভাবছি।
আর মাত্র ৫০ মিটার ঢাল। পুরোটাই বরফ। দেখলাম, চূড়ার কাছে আরোহীদের লম্বা সারি। সামিট লাইন। সেই ঢাল পার হচ্ছি। আর মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছি। পাঁচ মিনিট, ছয়—সাত—আট—নয় মিনিটের মাথায় গিয়ে পৌঁছালাম এভারেস্টের চূড়ায়। লক্ষ্য পূরণ হলো। চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে। চিৎকার করে বলতে মন চাইছে, ‘আআআমিইই পেরেছিইইই। বিশ্বের দম্ভ, সর্বোচ্চ চূড়া এখন বাংলাদেশের পায়ের নিচে। এক বাংলাদেশির কাছে এভারেস্ট হার মেনেছে।’ সাফল্য লাভের পর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে এও প্রার্থনা করছি, যেন নিরাপদে নামতে পারি।

‘এভারেস্টের চূড়া দেখতে পাবে’


undefinedস্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
প্রথম পর্বের পর
কৈলাসের কথা শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। কান গরম হয়ে উঠল। আবারও জেদ চেপে গেল। দাঁতে দাঁত কামড়ে আগুন চোখে কৈলাসের দিকে তাকালাম। এরপর ঘাড় ফেরালাম আরও ডানে। এবার চার-পাঁচটা পুরোনো রোপ দৃষ্টিসীমায় এল। সেটা কিছুটা ডানে সরে গিয়ে পাকড়ালাম এবং আগের মতো বাঁ হাতে জুমার ঠেলে এবং ডান হাতে রোপ আঁকড়ে ধরে সেই ওভারহ্যাং ট্র্যাভার্স করতে শুরু করলাম।
বিধি বাম। ২০ সেকেন্ডের চেষ্টায় সেই ওভারহ্যাং পাশ কাটালাম ঠিকই। পিঠে ব্যাগপ্যাকের ভেতর অক্সিজেন বোতল রেখে রেগুলেটরটা বাইরে রেখেছিলাম, যাতে সহজেই বোতলে অক্সিজেনের পরিমাণ এবং অক্সিজেন প্রবাহ পরীক্ষা করা যায়। সেই রেগুলেটরের সঙ্গে যুক্ত রাবার পাইপ, যা বোতল থেকে অক্সিজেন মাস্কে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যায়—ঠিক ওপরের দিকে ফুটো হয়ে গেল ওভারহ্যাং রক ফেসে ঘষা খেয়ে। শশশশশশ। একটানা শব্দ হচ্ছে। অক্সিজেন বের হয়ে যাচ্ছে ফুটো পাইপ দিয়ে, ফুসফুসে যাচ্ছে শুধু সাধারণ বাতাস। যাতে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ৩৩ শতাংশ।
এতক্ষণ জীবন বাজি রেখে সেই ওভারহ্যাং পার হয়ে এলাম ঠিকই। কিন্তু বুক দ্বিগুণ বেগে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আর পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ায় সেই হাপর মনে হলো এখনি ফেটে যাবে—ভেতরে বাতাস নেই ঠিকই, কিন্তু বাইরের বাতাসের চাপে। বাতাস নাক-মুখ দিয়ে ফুসফুসে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকায় মনে হলো মরে যাচ্ছি। সেই রক ফেসের ওপর দুই হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাস্কের ভেতর মুখ হাঁ করে অক্সিজেন পাওয়ার চেষ্টা করছি। পারছি না, পারছি না। মরে যাচ্ছি, আর মনে হয় হলো না।

রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে স্লেজে ফিরে গেলাম


undefined
‘হাসকিদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ো, এর মুখ থেকে ওকে ছাড়িয়ে নাও, রক্ত দেখে ভয় পেয়ো না, হাত লাগাও, হার্নেস ধরে টান মারো, একে সরাও, ধরো ওটাকে।’ দলনেতা রবার্ট উন্মত্ত কুকুরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে পাগলের মতো চিৎকার করে আমার উদ্দেশে এসব কথা বলল। আমাদের দুই স্লেজের কুকুর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ১২টি হাসকির গর্জনে কানে তালা লাগছে, মুলার মতো দাঁত ঢুকে যাচ্ছে কারও পেটে-পিঠে। পায়ের তলায় হিমবাহের সাদা জমি কুকুরের রক্তে লাল। রবার্ট যতই চেঁচাক, এক ডজন সংগ্রামী হাসকির মাঝে সশরীরে দাঁড়ানো কি সোজা কথা! কিন্তু আমারই ‘পদস্খলনে’ শুরু হয়েছে এ হাসকি-লড়াই, এখন খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে তো থাকতে পারি না। বিকশিত দাঁতের বীভৎস সারি অগ্রাহ্য করে ভূলুণ্ঠিত একটা হাসকিকে টেনে সরালাম। অমনি তার ক্ষিপ্ত প্রতিপক্ষ ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। তার ভারে আমি ধরাশায়ী হলাম। চরকির মতো চার হাত-পা চালিয়ে রবার্ট দুই দল হাসকির মধ্যে কোনোমতে এক যুদ্ধবিরতি রেখা কায়েম করল। সেই নো-ডগ্স-ল্যান্ডে আমি রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে বসে রইলাম।

আমার মাথায় চাটি মেরে দৈত্যটা উড়ে গেল….ইনাম আল হক


‘দৈত্য, দৈত্য—পেট্রেল আসছে, মাথায় ঘা মারবে, বসে পড়ো বোকারাম, বসে পড়ো।’ চিৎকার করে এসব নির্দেশ দিতে দিতে ব্রেন্ট হিউস্টন হঠাৎ বসে পড়ে উত্তর দিকে সেজদা দিল। নির্দেশগুলো আমার উদ্দেশেই ছিল, কিন্তু আমার মাথায় তখন কি আর কিছু ঢোকে! দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে সদ্য অ্যান্টার্কটিকায় পা ফেলেছি, তারপর ‘প্যারাডাইস বে’ বা স্বর্গোপকূলের পাথুরে দেয়ালে আরোহণ করে একেবারে ঘোরের মধ্যে আছি। সমুদ্রের গর্জন কমে এসেছে, সৈকতে আমাদের সহযাত্রীদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শত শত ‘অ্যাডেলি পেঙ্গুইন’। আজ শীতের তীব্রতা কমেছে, তাপমাত্রা বেড়ে শূন্য ডিগ্রিতে এসেছে, সারাক্ষণ ঝুরঝুর করে তুষার ঝরছে। পাহাড়ের ওপর ওড়াউড়ি করছে দক্ষিণ মহাসাগরের বিরল পাখি, দৈত্য-পেট্রেল ও খয়রা-স্কুয়া। কাছে গিয়ে এদের দেখার জন্য আমরা দুই পাখিপ্রেমী পাহাড়ে উঠেছি। আরোহণের শ্রমে শরীর গরম, মন আরও উষ্ণ। গায়ের প্রকাণ্ড লাল জ্যাকেট খুলে ফুরফুরে মনে আমি ব্রেন্টকে বললাম, ‘এ স্বর্গোপকূলে আমার একটা ছবি তুলে দাও।’

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons