Total Pageviews

Showing posts with label গ্রাম বাংলা. Show all posts
Showing posts with label গ্রাম বাংলা. Show all posts

Sunday, March 25, 2012

বাড়তি জমির সবুজ ফসল

মেঘনার মাঝে জেগে ওঠা চর। সবুজ ফসলে খুশির ঝিলিক কৃষকের মুখে মেঘনার মাঝে জেগে ওঠা চর। সবুজ ফসলে খুশির ঝিলিক কৃষকের মুখে
ছবি: প্রথম আলো
ভোলার ইলিশা বিশ্বরোডের মাথা থেকে ইঞ্জিনের নৌকা ছাড়ল। চারদিকে পানি, ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন নীলাকাশ, দেশি-বিদেশি পাখির ওড়াউড়ি। চরগুলোকে দূর থেকে কালোরেখা মনে হয়। কাছে গেলে রং পাল্টে হয় সবুজ।
দুই পাশে ফসলের খেত। মাঝখানে স্রোতোস্বিনী খাল। বড় বড় ট্রলার সে খালে দাঁড়িয়ে সবজি-তরমুজ তুলছে। ঢাকাগামী ট্রলার-মালিক ও চালক মিজানুর রহমান বললেন, এখন আর বাজারে গিয়ে ফসল বিক্রি করতে হয় না। এখানে থেকেই ফসল বিক্রি করা যায়।
বছর পঞ্চাশ আগে ভোলা-গাজীপুর সড়কে চলত লম্বা নাকওয়ালা, হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে চালু করা বাস। সেই গাজীপুর ইউনিয়ন বহু আগেই বিলীন হয়েছিল মেঘনা নদীতে। বছর পাঁচেক আগে মেঘনার মাঝে গাজীপুর ও তার আশপাশের কিছু অংশে আবার চর জেগে উঠেছে। এই বাড়তি চরাঞ্চল এখন ভরে উঠেছে সবুজ ফসলে।
চর আর চর
ভোলার শুরু রাজাপুর ইউনিয়ন দিয়ে। চলমান নৌকায় দাঁড়িয়ে দেখা যায়, মেঘনার মাঝে চর আর চর। নৌকার সঙ্গী রাজাপুরের বাসিন্দা আমির হোসাইন জানান, ভাঙনের কয়েক বছরের মধ্যে মেঘনার মাঝে সদর উপজেলাতেই গাজীপুর চর, কালুপুরা চর, খরকির চর, বারাইপুর, রামদেবপুরসহ ১০-১২টি চর জেগে উঠেছে। দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যে জেগে ওঠা ৫৫টি চরে প্রতিবছর রবি মৌসুমে আবাদ হচ্ছে লক্ষাধিক একর জমি।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সমীক্ষায় দেখা যায়, ভোলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯৭৩-২০০০ সাল পর্যন্ত নদীগর্ভ থেকে বাড়তি জমি পাওয়া গেছে ৫০ হাজার ৮০০ হেক্টর। নদী ভেঙেছে ৮৩ হাজার ৩৬৬ হেক্টর। আর চর পড়েছে এক লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ হেক্টর। এ চর পড়ছে জলস্রোতে ভেসে আসা পলি থেকে।
সবুজ চরাঞ্চল
মেঘনার মাঝে সবুজ আর সবুজ। ইলিশা বিশ্বরোডের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, বর্ষায় মেঘনা থাকে উত্তাল। উত্তর থেকে ঘোলাপানির সঙ্গে পলি ভেসে এসে জমে এসব চরের জমিতে। জমি হয় উঁচু ও উর্বর। কম সারেই ফলন হয় ভালো। এসব চরে রবি মৌসুমে চাষ হচ্ছে বোরো ধান, বাঙ্গি, তরমুজ, আলু, ডাল, বাদাম, মরিচ, সয়াবিন, করলা, চিচিঙ্গা, লাউ, কুমড়া। আর বর্ষায় হয় বোনা আমন।
গাজীপুর চরে নামতেই যেন তরমুজের লতায় পা জড়িয়ে যায়। মাইলের পর মাইল ফসলি খেত। চরের কৃষক হাজি ফারুক হোসাইন জানান, তিনি গত তিন বছর এ চরে সবজির চাষ করছেন। এ বছর তরমুজ, করলা, চিচিঙ্গা, মরিচ ও বোরো ধান লাগিয়েছেন। গাজীপুর চরে শাহজল হাজি চাষ করেছেন ১৩ একর জমিতে। তিনি জানান, মেঘনার মাঝে জেগে ওঠা চরে বোরো আবাদই করতেন কৃষকেরা। এখন ধানের পাশাপাশি বাঙ্গি, তরমুজ, আলু, ডাল, বাদাম, মরিচ, সয়াবিন, সবজি চাষও হচ্ছে প্রচুর।
রবি ও খরিফ-১ মৌসুমে চাষাবাদ করে কৃষক বাম্পার ফলন পাচ্ছেন। বিক্রিতেও সমস্যা নেই। বেপারি এসে নৌকাভরে ফসল কিনে নিচ্ছেন।
ভোলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শান্তি রঞ্জন মণ্ডল প্রথম আলোকে জানান, মেঘনা-তেঁতুলিয়ার মাঝে জেগে ওঠা চর উর্বর। এখানে বাম্পার ফলন হচ্ছে। prothom-alo

Friday, March 23, 2012

গরিবের সহায় সাথী আপা

দিনাজপুরের চিবিরবন্দর উপজেলার সাতনালা গ্রামে কর্মীদের সঙ্গে নকশিকাঁথার কাজ করছেন সাথী দিনাজপুরের চিবিরবন্দর উপজেলার সাতনালা গ্রামে কর্মীদের সঙ্গে নকশিকাঁথার কাজ করছেন সাথী
প্রথম আলো
বাঙালি গৃহবধূ বলতে চট করে আমাদের চোখের সামনে নারীর যে চেহারা ফুটে ওঠে তা থেকে তিনি আলাদা। বাঙালি নারীর মতোই তিনি সহজ-সরল ও মার্জিত। তবে তাঁর কিছু বিশেষ গুণ আছে। তিনি সংগ্রামী, পরোপকারী এবং পরিশ্রমী। পরিশ্রম করে শুধু নিজেরই নয়, ৬০০ দরিদ্র নারীর সংসারের অভাব দূর করেছেন, দেখাচ্ছেন সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
এই গৃহবধূর নাম শামীমা আক্তার সাথী। সবার কাছে তিনি প্রিয় সাথী আপা। মেয়েদের পোশাক তৈরি দিয়ে শুরু পথচলার। পরে কাঁথা ও শিশুদের পোশাকে সুঁই-সুতা দিয়ে নকশার কাজ করে নজর কেড়েছেন সবার। প্রায় দিনই ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পড়েন। কাজ নিয়ে ছুটে চলেন রংপুরের তারাগঞ্জ, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, খানসামা ও নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আবার ফেরেন বাড়িতে। দরিদ্র নারীদের দুঃখ ঘোচাতে এ যেন তাঁর ভিন্ন এক আন্দোলন।
শুরুর কথা: সৈয়দপুর উপজেলার সোনাখুলি গ্রামের শামসুদ্দিনের মেয়ে সাথীর বিয়ে হয় ১৯৯৮ সালে সৈয়দপুর শহরের পুরাতন বাবুপাড়া মহল্লার শামসুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে। বিয়ের সময় এই দম্পতি ছিল বেকার। শ্বশুরবাড়িতে সাথীর মনে হলো, বেকার জীবন সম্মানের নয়। তাই তিনি স্বামীকে ঢাকায় গিয়ে চাকরির সন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। স্নাতক পাস সাথী নিজেও চাকরি খোঁজেন হন্যে হয়ে।
ঢাকায় স্বামী একটা চাকরি জোটালেও বেকারই থাকতে হলো সাথীকে। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না তিনি। বাবার বাড়িতে মায়ের কাছে শিখেছিলেন সুঁই-সুতার কাজ। সেটা কাজে লাগিয়ে মেয়েদের পোশাক তৈরির জন্য একটি দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নেন। ভাবলেন, এখানে তৈরি করা পোশাক হবে আলাদা, যাতে থাকবে সুঁই-সুতার কাজ। পোশাকে ফুটে উঠবে প্রকৃতি, রূপকথা, দেশসহ নানা আকর্ষণীয় নকশা।
এই ভাবনা থেকেই ২০০০ সালে নিজ বাড়ির একটি কক্ষে দুটি সেলাই মেশিন দিয়ে শুরু হয় কাজ। পুঁজি ছিল স্বর্ণালংকার বিক্রির ৫০ হাজার টাকা। বাড়ির একটি কক্ষে পোশাক বিক্রির জন্য ছোট একটি দোকান করেন, নাম দেন ‘লাল সবুজ’। ধীরে ধীরে এই পোশাকের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। আয় ও ব্যবসার পরিধি বেড়ে যাওয়ায় সৈয়দপুর শহরের গ্যারিসন সিনেমা হল সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে বিক্রয়কেন্দ্র খুললেন। এর পাশেই রয়েছে একটি কারখানা।
নকশিকাঁথা: ২০০৬ সালে হঠাৎ করে সাথী নকশিকাঁথা তৈরির প্রস্তাব পান। এ কাঁথা তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে, আয়ও হয় বেশি। এ কারণে এ কাজের সঙ্গে গ্রামের দরিদ্র ও অভাবী পরিবারের নারীদের যুক্ত করার চিন্তা করেন সাথী। গ্রামে গ্রামে ঘুরে নারীদের কাঁথা তৈরির কাজ শেখান। প্রকারভেদে একটি কাঁথা তৈরিতে তিন হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এসব কাঁথা দেশ-বিদেশে পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ টাকায়ও বিক্রি হয়। গুণেমানে ভালো হওয়ায় সাথীর নকশিকাঁথার চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। প্রসার বেড়ে যাওয়ায় ২০০৭ সালে স্বামীকে ঢাকা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন সাথী।
৭০০ মানুষের কর্মসংস্থান: সাথী আপার প্রতিষ্ঠান লাল সবুজে এখন ৭০০ দরিদ্র মানুষ কাজ করে। এদের ৯০ ভাগই নারী। এখানে নকশিকাঁথার কাজ বেশি হয়। পাশাপাশি মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ, শিশুদের ফ্রক, থ্রি-পিছ, ফতুয়া, পাঞ্জাবিও তৈরি করা হয় তাঁর কারখানায়। প্রত্যেক নারীকর্মী প্রতি মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করেন।
কর্মীদের কথা: লাল সবুজে কাজ করে সংসারের অভাব দূর করেছেন সাবিনা বেগম, রেহানা পারভিন, গুড়িয়া বেগমের মতো অনেক অসহায় ও দরিদ্র নারী। গুড়িয়া বেগম জানান, চার বছর আগে তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। এক ছেলেকে নিয়ে বিপদে পড়েন তিনি। বিষয়টি জানতে পেরে সাথী তাঁকে কাজ দেন। এখন মাসে চার হাজার টাকা আয় করছেন।
সাথীর স্বপ্ন: তিনি ভবিষ্যতে সৈয়দপুর শহরে একটি বড় পোশাক কারখানা করতে চান। সেখানে দরিদ্র নারী ও কিশোরীরা কাজ করবে। সংসারের খরচ জোগাতে পুরুষদের সহায়তা করার জন্য তিনি নারীদের স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী করতে চান।
সংশ্লিষ্টদের কথা: সৈয়দপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোসলেম উদ্দিন জানান, কী করে ছোট্ট একটি সুঁই-সুতার কাজ বিশাল কর্মযজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে তা সাথীর কাছে শিখতে হবে। উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সাবিকুন্নাহার বলেন, ‘সাথী দরিদ্র নারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। আমরা তাঁকে সাধ্যমতো সহায়তা করব।’

Friday, March 9, 2012

তুষ হারিকেন পদ্ধতির জয়

তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে সদ্য ফোটানো হাঁসের বাচ্চা হাতে তাড়াইলের দামিহা গ্রামের আবুল হোসেন তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে সদ্য ফোটানো হাঁসের বাচ্চা হাতে তাড়াইলের দামিহা গ্রামের আবুল হোসেন
ছবি: প্রথম আলো
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার দামিহা গ্রামে হাঁসের ডিম ফোটাতে প্রায় এক যুগ ধরে ব্যবহূত হচ্ছে ‘তুষ-হারিকেন পদ্ধতি’। এই গ্রামেরই এক ব্যক্তি এই পদ্ধতি ব্যবহারের সূচনা করেন। তাঁর নাম মো. আবুল হোসেন।
পদ্ধতিটি শুধু দামিহা গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে পাশের রাহেলা ও কাচিলাহাটি গ্রামে। এই তিন গ্রামের ৩০টি হ্যাচারিতে প্রতি মৌসুমে প্রায় এক কোটি হাঁসের ছানা উৎপাদিত হচ্ছে।
তুষ-হারিকেন পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এতে খরচ বেশ কম হয়। তাড়াইলে তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের ছানা ফোটানোকে ‘বিপ্লব’ আখ্যায়িত করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ছাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাকরি করেছি। আমার জানামতে, তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে এত বিপুলসংখ্যক হাঁসের বাচ্চা আর কোথাও ফোটানো হচ্ছে না।’
যেভাবে শুরু: দারিদ্র্যের কারণে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েই স্কুল ছাড়তে হয় আবুল হোসেনকে। যোগ দেন কৃষিকাজে। কিন্তু চাষবাস তাঁর ভালো লাগত না। চেয়েছিলেন নতুন কিছু করতে। এক পরিচিতজনের মাধ্যমে খোঁজ পেয়ে ভর্তি হন ঢাকার সাভার যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেটা ১৯৯১ সাল। সেখানে তিনি তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের ডিম ফোটানোর ওপর মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ নেন।
এরপর ১৯৯৪ সালে কিশোরগঞ্জে সরকারি হাঁস-মুরগির খামারে আরও এক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে দামিহা বাজারে শুরু করেন ওই পদ্ধতিতে হাঁসের ডিম ফোটানোর কাজ। প্রথমদিকে মুনাফা কম হলেও হাল ছাড়েননি। প্রায় দুই বছর পর প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি আয়ত্ত করেন। এরপর সাফল্যের দেখা পান। বিষয়টি অজানা থাকে না প্রতিবেশীদের। তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রচলিত পদ্ধতি ছেড়ে নতুন পদ্ধতিতে হাঁসের ছানা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন একই গ্রামের নূরুল গনি, আবদুল গনি ও সোহাগ মিয়া।
উৎপাদন-পদ্ধতি: ডিম ফোটানোর জন্য ব্যবহূত হয় স্থানীয়ভাবে ‘সিলিন্ডার’ নামে পরিচিত বিশেষ পাত্র, ডিম রাখার মাচা এবং উৎপাদিত হাঁসের ছানা রাখার জায়গা। কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে ওই বিশেষ পাত্র ও মাচা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া প্রয়োজন হয় তুষ, হারিকেন, লেপ, রঙিন কাপড়সহ আনুষঙ্গিক কিছু উপকরণ। ডিম সংগ্রহের পর জীবাণুনাশক দিয়ে সেগুলো ধুয়ে বাছাই করে রোদে শুকানো হয়। এরপর ডিমগুলো রঙিন কাপড়ের থলেতে নির্দিষ্ট পরিমাণে ভরে সিলিন্ডারের ভেতরে রাখতে হয়। এক সিলিন্ডারে ডিম ও অন্য সিলিন্ডারে হারিকেন রেখে প্রতি তিন ঘণ্টা পর পর তাপ এবং তাপবিহীন অবস্থায় লেপ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পর্যায়ক্রমে এই প্রক্রিয়া ১৭ দিন ধরে চলে। এরপর ডিমগুলো মাচার ওপর সাজিয়ে হালকা কাপড়ে ঢেকে ১১ দিন রাখা হয়। ১২ দিনের মাথায় একের পর এক ডিম ফুটে হাঁসের ছানা বেরোতে থাকে। এভাবে ডিম ফোটাতে ২৮ দিন লাগে।
দামিহাসহ তিন গ্রামে তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে বাচ্চা ফোটানোর মোট ৩০টি হ্যাচারি গড়ে উঠেছে। প্রতিটি হ্যাচারিতে এই পদ্ধতিতে প্রতি মাসে পর্যায়ক্রমে চারবার ডিম ফোটানো যায়। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত প্রায় সোয়া দুই মাস ছানা উৎপাদন বন্ধ থাকে। এ ছাড়া বছরের বাকি সময় ডিম ফোটানোর কাজ অব্যাহত থাকে এখানে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাস ডিম ফোটানোর জন্য উৎকৃষ্ট সময়। ৩০টি হ্যাচারি থেকে প্রতি সপ্তাহে গড়ে সোয়া দুই লাখ বাচ্চা উৎপাদন করা হয়।
বাচ্চা ফোটানোর জন্য হাঁসের ডিম সংগ্রহ করা হয় খালিয়াজুরি, ইটনা, মিঠামইন, মদন, করিমগঞ্জ উপজেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। এ জন্য ডিম উৎপাদনকারী খামারিদের অগ্রিম দাদন দিয়ে চুক্তি করে নিতে হয়।
খরচ ও লাভ: এই প্রক্রিয়ায় প্রতি ১০০ ছানা উৎপাদনে এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। প্রতি ১০০ ছানা বিক্রি হয় এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায়। এভাবে প্রতিটি বাচ্চা উৎপাদনে গড়ে লাভ হয় তিন-চার টাকা। সময়ভেদে এ লাভের পরিমাণ কমবেশি হয়।
এক দিন বয়সী হাঁসের ছানাগুলো পাইকারেরা কিনে নেন। এরপর সেগুলো সিলেট, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা, যশোর, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়।
তাপমাত্রার ওঠানামা হলে মাঝেমধ্যে সব ডিম নষ্ট হয়ে যায়। তাই এই ঝুঁকি এড়াতে সব সময় সতর্ক থাকতে হয় হ্যাচারির শ্রমিকদের।
স্থানীয়দের কথা: তুষ-হারিকেন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন দামিহা গ্রামের সোহাগ মিয়া, রাহেলা গ্রামের নজরুল ইসলাম, একই গ্রামের অসিম মিয়া ও কাছিলাহাটি গ্রামের কাজল মিয়া। এলাকায় এই পদ্ধতির প্রচলন করায় তাঁরা আবুল হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দামিহা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত দুই শিক্ষক হিতাংশু চৌধুরী ও মো. আবুল হাসেম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে বাচ্চা ফোটানোর ফলে এলাকার পরিচিতি যেমন বেড়েছে, বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে। তাঁরা বলেন, তুষ-হারিকেন পদ্ধতি চালু হওয়ার আগে দামিহা এলাকায় কোনো হ্যাচারিশিল্প ছিল না। বর্তমানে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই আগে বেকার ছিলেন।
একই গ্রামের বাসিন্দা ভাস্কর্যশিল্পী সুষেন আচার্য বলেন, তুষ-হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের ছানা উৎপাদন একটি শিল্প। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা দেওয়া হলে ক্ষুদ্র এই শিল্পের পরিসর আরও বাড়বে।
সুদৃষ্টি কামনা: স্থানীয় হ্যাচারিগুলোর প্রতি প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদাসীনতার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি ঋণসুবিধা না থাকায় তাঁরা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) ঋণ নিয়ে হ্যাচারি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। এরই মধ্যে ২০১০ সালে গঠিত হয়েছে ‘দামিহা ইউনিয়ন হ্যাচারি মালিক সমিতি’। আবুল হোসেন এই সমিতির সভাপতি। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে আবুল হোসেন বললেন, সহজ শর্তে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হলে এ শিল্প আরও এগিয়ে যাবে। আর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ছাইফুল ইসলাম বললেন, সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে এখানকার হ্যাচারিশিল্প আরও সমৃদ্ধ হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

Friday, December 2, 2011

জয়তু সুবর্ণা আপা!

নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আ� নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আক্তার
ছবি: প্রথম আলো
‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছেন তাঁরা। তাঁদের হারতে হয়নি, তাঁরা জিতে চলেছেন। স্বাবলম্বী হয়েছেন, অন্যদের এগিয়ে নিচ্ছেন সেই পথে।
বলা হচ্ছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী গ্রামের নারীদের কথা। ‘গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি’ নামে সমবায় সমিতি গড়ে বদলে ফেলেছেন নিজেদের ভাগ্য। আর এই সমিতি গড়তে গ্রামের নারীদের এক সুতোয় গেঁথেছেন একজন—সুবর্ণা আক্তার। সদস্যদের কাছে তিনি কেবলই ‘সুবর্ণা আপা’।
সুবর্ণার নেতৃত্বে ওই সমিতির সদস্যরা হাতপাখা, লেপ, টুপিতে নকশা তোলা, মাছ, সবজি ও লিচু চাষ করে ইটাকুমারীকে কর্মমুখর এক গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
শুরুর গল্প: পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণের গ্রাম ইটাকুমারী। এক দশক আগেও এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ ছিল দিনমজুর।
এই গ্রামেরই সচ্ছল এক পরিবারের মেয়ে সুবর্ণা। খুব কাছ থেকে দেখা গ্রামের মানুষের এমন কষ্ট তাঁকে নাড়া দিত। কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করতেন। সেই ভাবনা থেকে তাঁর মাথায় আসে সমবায় সমিতি গড়ার কথা। বিষয়টি গ্রামের নারীদের বোঝাতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর ডাকে সাড়া দেন নারীরাও।
সাফল্যের পথে: ২০০২ সালের ১০ জানুয়ারি। সুবর্ণা ১৪০ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে গঠন করেন গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি। সিদ্ধান্ত হয়, সদস্যরা সপ্তাহে পাঁচ টাকা করে সমিতিতে জমা দেবেন। চার বছরে সমিতির সঞ্চয় আর তা বিনিয়োগ করে পাওয়া লাভে তহবিলে জমা হয় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। সদস্যরা তা ভাগ করে নেন।
২০০৫ সালে সমিতির সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ৩৫০ করা হয়। সাপ্তাহিক চাঁদা বাড়িয়ে করা হয় ১০ টাকা। দুই বছরে সদস্যদের জমা এবং তা বিনিয়োগে পাওয়া যায় তিন লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে ২০০৭ সালে তিন একর আয়তনের একটি পুকুর ও দুই একর ফসলি জমি ইজারা নেওয়া হয় সমিতির নামে। পুকুরে মাছ ও জমিতে সবজি চাষ করে এক বছরে খরচ বাদে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়। মূলধন সমিতির তহবিলে রেখে লাভের অংশ সদস্যরা ভাগ করে নেন।
এগিয়ে চলা: সুবর্ণার চাওয়া ছিল, গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী করবেন। তাই সমিতির লাভের অংশ ভাগ করে দিয়ে চুপ থাকেননি। প্রতিবেশীদের কাছে গল্প শুনে ২০০৮ সালের শুরুতে তিনি পাশের কামদেব গ্রামের রওশন আরা বেগমের কাছে যান। তাঁর কাছ থেকে শিখে নেন হাতপাখা তৈরির কৌশল। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সমিতির সদস্যদের হাতপাখা তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। সমিতির তহবিল থেকে পোশাক কারখানার পরিত্যক্ত রঙিন সুতা কিনে শুরু হয় হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির কাজ।
ওই বছরের জুন মাসে সমিতির নারীরা শুরু করেন টুপিতে নকশা তোলার কাজ। এর পর থেকে সমিতির সদস্য ছাড়াও আড়াই শতাধিক নারী হাতপাখা তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজ করছেন। পাশাপাশি অনেকে লেপ-তোষক তৈরির কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।
গৃহবধূ ছালেহা বেগম ও নাজমা আকতার জানালেন, একটি পাখা তৈরিতে ছয় থেকে সাত টাকা খরচ হয়, বিক্রি হয় ১৮ থেকে ২০ টাকায়। তাঁদের নকশা করা টুপি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। একটি লেপ তৈরি করে ২০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়।
সমিতিতে এক দিন: সম্প্রতি এক সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব বাড়িতেই নারীরা কেউ হাতপাখা, কেউ লেপ তৈরি, কেউ বা টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছেন। সুবর্ণার বাড়িতেই একটি ঘর সমিতির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহূত হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সুবর্ণা নারীদের নিয়ে সমিতির বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন।
সুবর্ণা জানালেন, সমিতির অধীনে মাছ-সবজির চাষ চলছে। চলছে হাতপাখা, লেপ তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা। ৫০ শতক আয়তনের একটি লিচুবাগান ইজারা নেওয়া হয়েছে। এসব উ ৎস থেকে আয় হওয়া অর্থ শুধু সমিতির সদস্যরাই ভাগ করে নেন না, আয়ের ৫ শতাংশ গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েদের বিয়েতে ব্যয় করা হয়। অভাবী শিক্ষার্থীদের কিনে দেওয়া হয় বই-খাতা। এ ছাড়া সমিতির উদ্যোগে নিরক্ষর গৃহবধূদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিচর্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌতুক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
সফল যাঁরা: সমিতির সদস্য আরজিনা খাতুন, খালেদা আকতারসহ কয়েকজন তাঁদের দিনবদলের গল্প শোনালেন। তাঁদের টিনের ঘর উঠেছে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। নিজেদের হাঁস, মুরগি, গাভি, ছাগল আছে। সর্বোপরি সংসারে তাঁদের মতামত গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাছনা বেওয়া জানালেন, ১৫ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। এরপর ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন। তবে এখন তাঁর হাঁস-মুরগি ও একটি গাভি আছে। ভিক্ষা ছেড়েছেন অনেক আগেই। এ সবই হয়েছে সমিতির সদস্য হয়ে।
২০০০ সালে এই গ্রামের চায়না বেগমের বিয়ে হয় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী গ্রামে। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তিন বছরের মাথায় এক সন্তানসহ তাঁকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। তিনি এই সমিতির সদস্য হয়ে এখন মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করছেন।
এ ছাড়া গ্রামের লাকী বেগম, সহিদা বেগম, মঞ্জুয়ারা খাতুন, আছমা বেগম, মাজেদা খাতুনসহ অনেকের কাছেই শোনা গেল তাঁদের অভাব জয়ের গল্প।
একজন সুবর্ণা: স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত নারী সদস্য গুলশান আরা বেগমের ছোট মেয়ে সুবর্ণা। বিএ পাস সুবর্ণার বিয়ে হয় একই গ্রামের আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে। তাঁদের সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে আছে। স্ত্রীর উদ্যোগের প্রতি সম্মান আছে স্বামী আশরাফুজ্জামানের। ‘সুবর্ণার কর্মকাণ্ডে আমরা খুশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সব সময় সমিতির কাজে উ ৎসাহ দিই।’ বলছিলেন তিনি।
ইটাকুমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান দছিজল হক বলেন, সুবর্ণার মতো নারীই এই সমাজে প্রয়োজন। ইটাকুমারী গ্রামে বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কমেছে যৌতুকের প্রবণতাও। স্বাস্থ্যসচেতনতা, শিক্ষার প্রতি আগ্রহও বেড়েছে।
যেতে চান অনেক দূর: গ্রামের নারীদের জন্য আর কী করতে চান? সুবর্ণার উত্তর, ‘প্রত্যেক সদস্যকে একটি করে বিদেশি গাভির খামার করে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। হাতপাখা, লেপ তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজে পুরো উপজেলার দরিদ্র নারীদের যুক্ত করার বিষয়টিও মাথায় আছে।’
সুবর্ণা জানালেন, তাঁর স্বপ্ন—উপজেলার প্রতিটি নারী মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। এ জন্য নারীদের সংগঠিত করে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার আওতায় এনে বাল্যবিবাহ, যৌতুকের কুফল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে চান তিনি।
সফল হোক তাঁর এই যাত্রা!

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons