Total Pageviews

Showing posts with label সংগ্রামী. Show all posts
Showing posts with label সংগ্রামী. Show all posts

Friday, December 2, 2011

জয়তু সুবর্ণা আপা!

নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আ� নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আক্তার
ছবি: প্রথম আলো
‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছেন তাঁরা। তাঁদের হারতে হয়নি, তাঁরা জিতে চলেছেন। স্বাবলম্বী হয়েছেন, অন্যদের এগিয়ে নিচ্ছেন সেই পথে।
বলা হচ্ছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী গ্রামের নারীদের কথা। ‘গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি’ নামে সমবায় সমিতি গড়ে বদলে ফেলেছেন নিজেদের ভাগ্য। আর এই সমিতি গড়তে গ্রামের নারীদের এক সুতোয় গেঁথেছেন একজন—সুবর্ণা আক্তার। সদস্যদের কাছে তিনি কেবলই ‘সুবর্ণা আপা’।
সুবর্ণার নেতৃত্বে ওই সমিতির সদস্যরা হাতপাখা, লেপ, টুপিতে নকশা তোলা, মাছ, সবজি ও লিচু চাষ করে ইটাকুমারীকে কর্মমুখর এক গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
শুরুর গল্প: পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণের গ্রাম ইটাকুমারী। এক দশক আগেও এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ ছিল দিনমজুর।
এই গ্রামেরই সচ্ছল এক পরিবারের মেয়ে সুবর্ণা। খুব কাছ থেকে দেখা গ্রামের মানুষের এমন কষ্ট তাঁকে নাড়া দিত। কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করতেন। সেই ভাবনা থেকে তাঁর মাথায় আসে সমবায় সমিতি গড়ার কথা। বিষয়টি গ্রামের নারীদের বোঝাতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর ডাকে সাড়া দেন নারীরাও।
সাফল্যের পথে: ২০০২ সালের ১০ জানুয়ারি। সুবর্ণা ১৪০ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে গঠন করেন গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি। সিদ্ধান্ত হয়, সদস্যরা সপ্তাহে পাঁচ টাকা করে সমিতিতে জমা দেবেন। চার বছরে সমিতির সঞ্চয় আর তা বিনিয়োগ করে পাওয়া লাভে তহবিলে জমা হয় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। সদস্যরা তা ভাগ করে নেন।
২০০৫ সালে সমিতির সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ৩৫০ করা হয়। সাপ্তাহিক চাঁদা বাড়িয়ে করা হয় ১০ টাকা। দুই বছরে সদস্যদের জমা এবং তা বিনিয়োগে পাওয়া যায় তিন লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে ২০০৭ সালে তিন একর আয়তনের একটি পুকুর ও দুই একর ফসলি জমি ইজারা নেওয়া হয় সমিতির নামে। পুকুরে মাছ ও জমিতে সবজি চাষ করে এক বছরে খরচ বাদে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়। মূলধন সমিতির তহবিলে রেখে লাভের অংশ সদস্যরা ভাগ করে নেন।
এগিয়ে চলা: সুবর্ণার চাওয়া ছিল, গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী করবেন। তাই সমিতির লাভের অংশ ভাগ করে দিয়ে চুপ থাকেননি। প্রতিবেশীদের কাছে গল্প শুনে ২০০৮ সালের শুরুতে তিনি পাশের কামদেব গ্রামের রওশন আরা বেগমের কাছে যান। তাঁর কাছ থেকে শিখে নেন হাতপাখা তৈরির কৌশল। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সমিতির সদস্যদের হাতপাখা তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। সমিতির তহবিল থেকে পোশাক কারখানার পরিত্যক্ত রঙিন সুতা কিনে শুরু হয় হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির কাজ।
ওই বছরের জুন মাসে সমিতির নারীরা শুরু করেন টুপিতে নকশা তোলার কাজ। এর পর থেকে সমিতির সদস্য ছাড়াও আড়াই শতাধিক নারী হাতপাখা তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজ করছেন। পাশাপাশি অনেকে লেপ-তোষক তৈরির কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।
গৃহবধূ ছালেহা বেগম ও নাজমা আকতার জানালেন, একটি পাখা তৈরিতে ছয় থেকে সাত টাকা খরচ হয়, বিক্রি হয় ১৮ থেকে ২০ টাকায়। তাঁদের নকশা করা টুপি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। একটি লেপ তৈরি করে ২০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়।
সমিতিতে এক দিন: সম্প্রতি এক সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব বাড়িতেই নারীরা কেউ হাতপাখা, কেউ লেপ তৈরি, কেউ বা টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছেন। সুবর্ণার বাড়িতেই একটি ঘর সমিতির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহূত হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সুবর্ণা নারীদের নিয়ে সমিতির বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন।
সুবর্ণা জানালেন, সমিতির অধীনে মাছ-সবজির চাষ চলছে। চলছে হাতপাখা, লেপ তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা। ৫০ শতক আয়তনের একটি লিচুবাগান ইজারা নেওয়া হয়েছে। এসব উ ৎস থেকে আয় হওয়া অর্থ শুধু সমিতির সদস্যরাই ভাগ করে নেন না, আয়ের ৫ শতাংশ গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েদের বিয়েতে ব্যয় করা হয়। অভাবী শিক্ষার্থীদের কিনে দেওয়া হয় বই-খাতা। এ ছাড়া সমিতির উদ্যোগে নিরক্ষর গৃহবধূদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিচর্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌতুক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
সফল যাঁরা: সমিতির সদস্য আরজিনা খাতুন, খালেদা আকতারসহ কয়েকজন তাঁদের দিনবদলের গল্প শোনালেন। তাঁদের টিনের ঘর উঠেছে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। নিজেদের হাঁস, মুরগি, গাভি, ছাগল আছে। সর্বোপরি সংসারে তাঁদের মতামত গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাছনা বেওয়া জানালেন, ১৫ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। এরপর ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন। তবে এখন তাঁর হাঁস-মুরগি ও একটি গাভি আছে। ভিক্ষা ছেড়েছেন অনেক আগেই। এ সবই হয়েছে সমিতির সদস্য হয়ে।
২০০০ সালে এই গ্রামের চায়না বেগমের বিয়ে হয় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী গ্রামে। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তিন বছরের মাথায় এক সন্তানসহ তাঁকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। তিনি এই সমিতির সদস্য হয়ে এখন মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করছেন।
এ ছাড়া গ্রামের লাকী বেগম, সহিদা বেগম, মঞ্জুয়ারা খাতুন, আছমা বেগম, মাজেদা খাতুনসহ অনেকের কাছেই শোনা গেল তাঁদের অভাব জয়ের গল্প।
একজন সুবর্ণা: স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত নারী সদস্য গুলশান আরা বেগমের ছোট মেয়ে সুবর্ণা। বিএ পাস সুবর্ণার বিয়ে হয় একই গ্রামের আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে। তাঁদের সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে আছে। স্ত্রীর উদ্যোগের প্রতি সম্মান আছে স্বামী আশরাফুজ্জামানের। ‘সুবর্ণার কর্মকাণ্ডে আমরা খুশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সব সময় সমিতির কাজে উ ৎসাহ দিই।’ বলছিলেন তিনি।
ইটাকুমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান দছিজল হক বলেন, সুবর্ণার মতো নারীই এই সমাজে প্রয়োজন। ইটাকুমারী গ্রামে বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কমেছে যৌতুকের প্রবণতাও। স্বাস্থ্যসচেতনতা, শিক্ষার প্রতি আগ্রহও বেড়েছে।
যেতে চান অনেক দূর: গ্রামের নারীদের জন্য আর কী করতে চান? সুবর্ণার উত্তর, ‘প্রত্যেক সদস্যকে একটি করে বিদেশি গাভির খামার করে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। হাতপাখা, লেপ তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজে পুরো উপজেলার দরিদ্র নারীদের যুক্ত করার বিষয়টিও মাথায় আছে।’
সুবর্ণা জানালেন, তাঁর স্বপ্ন—উপজেলার প্রতিটি নারী মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। এ জন্য নারীদের সংগঠিত করে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার আওতায় এনে বাল্যবিবাহ, যৌতুকের কুফল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে চান তিনি।
সফল হোক তাঁর এই যাত্রা!

Friday, October 21, 2011

 নিপীড়িত মানুষের প্রেরণা

  • ইলা মিত্র (জন্ম: ১৯২৫—মৃত্যু: ২০০২) ইলা মিত্র 
 কলকাতায় আন্দোলনের সময় বন্দী ইলা মিত্র
কলকাতায় আন্দোলনের সময় বন্দী ইলা মিত্র
মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ইলা মিত্র কিংবদন্তিসম এক নাম। তাঁর যুগে শ্রমের ফসল কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে যা ছিল বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আজ তা হয়েছে জাতিসত্তার পরিচয় কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে অন্তহীন সংগ্রাম। গত ১৮ অক্টোবর ছিল মহীয়সী এই নারীর জন্মদিন।

ইলা মিত্র (১৯২৫-২০০২) নিত্যস্মরণীয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্র। সংগ্রামী মানুষের আন্দোলনের ইতিহাসে দেশ-কাল-ধর্ম-জাতি-শ্রেণী-লিঙ্গ তুচ্ছ করা অনমনীয় মৃত্যুহীন প্রাণ ইলা মিত্র। তাঁর ইতি নেই। অন্তহীন তাঁর ইতিহাস, ইতিবৃত্ত ও ইতিকথা। আজও তাঁর নাম, তাঁর সংগ্রামের প্রেরণা নাচোলের অধিকারহারা সাঁওতাল জনগণের প্রাণে সাড়া জাগায়। আজও বাংলাদেশের সংগ্রামী অধিকারহারা যেকোনো স্তরের এবং শ্রেণীর মানুষ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করার জন্য ইলা মিত্রের সংগ্রাম থেকে পাঠ নেয়।

১৯৪৫ থেকে ১৯৫৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন—মাঠে-প্রান্তরে-সংগ্রামে এবং জেলে বন্দী অবস্থায়। নাচোলের তেভাগা আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা সে সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে হলেও ব্যক্তি ইলা মিত্রের সংগ্রামী চেতনার বিদ্রোহ অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো উদ্দীপ্ত করেছিল সেই আন্দোলনের অধিকারহারা সাঁওতাল কৃষক নারী-পুরুষের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে।
১৯৪৮-এ শুরু হয়ে ১৯৫০ সালের প্রথম কাল পর্যন্ত নাচোলে তেভাগা আন্দোলন বা কৃষক বিদ্রোহ উত্তুঙ্গে উঠেছিল। সাঁওতাল এই কৃষকদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ভারত উপমহাদেশের সাঁওতাল পরগনা জেলার অধিবাসী। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সাঁওতাল আদিবাসীরা মহাবিদ্রোহের হুংকার তুলেছিলেন। সেই বিদ্রোহীরা এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের সাঁওতাল অধিবাসীরা নিজ বাসভূমে শান্তিতে বাস করতে পারেননি—হয়েছিলেন শোষিত, নির্যাতিত, জীবিকাবঞ্চিত দরিদ্র, নিঃশেষিত। এঁরা ছিলেন বর্গাচাষি। বর্গাচাষিদের শ্রমের ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ কেড়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে জোতদারেরা কৃষকের ন্যায্য অধিকারের ওপর আঘাত করলেন। কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক সাঁওতালদের সংগঠিত করে নাচোলের তেভাগা আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের পর সে সময় দেশের অন্যান্য স্থানের তেভাগা আন্দোলনের নতুন জাগরণ ঘটেনি—শেষ হয়ে গিয়েছিল তেভাগা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড। হঠাৎ করেই নতুন পর্যায়ের তেভাগা আন্দোলন শুরু হলো নাচোলে।
নাচোল থানার চণ্ডীপুর গ্রামের সাঁওতাল নেতা মাতলা সরদার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন। সেই এলাকার কমিউনিস্ট রমেন মিত্র, ইলা মিত্র, অনিমেষ লাহিড়ী, শিবু কোড়ামুদি, বৃন্দাবন সাহা, আজহার হোসেন, চিত্ত চক্রবর্তী আত্মগোপনে থেকে সাঁওতালদের সংগঠিত করেছেন, এলাকার অন্যান্য হিন্দু-মুসলিম ধর্মনির্বিশেষে সব কৃষক সংগঠিত হয়েছিলেন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে।
পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণ-কর্তৃত্ব নাচোলের সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুতে কৃষক সমিতির নেতারা আহ্বান জানালেন আমন ধান কেটে তিন ভাগের দুই ভাগ ধান নিজেদের গোলায় তোলার জন্য। সে সময়ে পার্টির নেতা রণদীভের তত্ত্ব এবং নির্দেশিত সিদ্ধান্তে হঠকারীভাবে, অপ্রস্তুত পদ্ধতিতে নাচোলে কৃষক বিপ্লব ও পুলিশ-কৃষক সংঘর্ষ ঘটল এই ধান কাটা ও তিন ভাগের দুই ভাগ কৃষকের গোলায় তুলে নেওয়ার আন্দোলনের ফলে।
এ অবস্থায় পুলিশি আক্রমণের সময় ইলা মিত্র ছদ্মবেশে আত্মগোপনে যাওয়ার পথে ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি পুলিশের হাতে বন্দী হন রহনপুর স্টেশনে। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত জেল-জুলুম আর শারীরিক-মানসিকভাবে পুলিশি সন্ত্রাস ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
১৯৫০-৫৪ পর্যন্ত তাঁর মুক্তির দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাঁকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠায় পাকিস্তান সরকার।

 
ইলা মিত্রের সংগ্রাম সে সময় থেমে যায়নি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তিনি আজীবন রাজনৈতিক আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে নিবেদিত ছিলেন। একসময়ের ক্রীড়াবিদ ইলা সেন, বেথুন কলেজের ছাত্রী ইলা সেন। বিদ্রোহে-বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠেছিলেন ইলা মিত্র। তাঁর জীবন ছিল কর্মময়। অধ্যাপনার পেশায় তিনি যেমন ছিলেন কর্মনিষ্ঠ, তেমনি নিবেদিত ছিলেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। মানুষের কল্যাণ সাধনায় ছিলেন তিনি সক্রিয় মানবতাবাদী।
তাঁর সংগ্রামী জীবনের নানা দিকের আলোকপাতে আমরা জানি তিনি কখনোই অতিমানব হয়ে ওঠার আগ্রহ পোষণ করেননি; বরং সেই ধরনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর সংগ্রাম ছিল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ‘রাষ্ট্র বনাম অধিকারহারা মানুষের সংগ্রাম’। এই সংগ্রামের উত্তরাধিকারীদের কাছে তিনি দিয়ে গেছেন তাঁর এবং আরও সব বিপ্লবী-সংগ্রামীর অসমাপ্ত কাজ। সেই সংগ্রামের সূত্র ধরেই ইলা মিত্র আজও প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক এবং যুদ্ধ-সন্ত্রাসের শিকার করা হয়েছিল ইলা মিত্রকে। ‘নারীর বিদ্রোহ’ বলে ভাবা হয়েছিল তাঁর সংগ্রামকে। তাই তাঁর শরীরের ওপর নির্যাতনের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বীভৎস কদর্যরূপে নিজেদের কলঙ্ক লেপন করতে চেয়েছিল। পারেনি ইলা মিত্রের মনোবল ভেঙে দিতে। তাঁর পাশে এ দেশের অগণিত মানুষ দাঁড়িয়েছিল। নিপীড়িত মানুষ নিজেদের শিকল ছিঁড়েছে তাঁর বন্দিত্বের শিকল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে।
ইলা মিত্র জন্ম নিয়েছিলেন ১৮ অক্টোবর ১৯২৫ সালে। তাঁর জীবনাবসান হয়েছে ১৩ অক্টোবর ২০০২ সালে। ৭৭ বছরের সংগ্রামী, প্রাণস্ফূর্ত ইলা মিত্র দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। তাঁর স্মরণে ইতিহাসের মর্মবাণী গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে নিপীড়িত সাঁওতালসহ প্রান্তিক, দলিত, অধিকারহারা আদিবাসীদের অস্তিত্বের সংগ্রাম। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস রূপান্তরিত হয়েছে সাঁওতাল-প্রান্তিক আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ পরিচয় বাংলাদেশের সংবিধানে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে। এমনকি সম্প্রতি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও তাদের আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি মেলেনি।
ইলা মিত্রের সংগ্রামের যুগে যা ছিল ‘শ্রমের ফসল কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে’ বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আজ তা হয়েছে ‘জাতিসত্তার পরিচয় কেড়ে নেওয়ার’ বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার অন্তহীন সংগ্রাম। এই সংগ্রামের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরম্পরায় ইলা মিত্র সম্পৃক্ত হয়ে আছেন; থাকবেন যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত-অধিকারহারা মানুষের সংগ্রামের প্রেরণারূপে। প্রথম আলো

Sunday, June 12, 2011

স্বপ্নচূড়ায় সালমান


undefined
ছোট্ট একটা ঘর। দেয়ালগুলো ছাওয়া হালকা সবুজ রঙে। বইপত্রে ঠাসা পুরো জায়গাটা। একটা টেবিল, কাঠের গদিওয়ালা চেয়ার, প্রিন্টার আর কম্পিউটার—ঘরের আসবাব বলতে এগুলোই। এখানেই দিনমান কাজ করে যান টগবগে যুবক সালমান খান। অনেক দায়িত্ব তাঁর। বুক ভরা অনেক অনেক স্বপ্ন। প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য নির্ভর করে তাঁর ওপর। সংখ্যাটা কোটিতে নিয়ে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। লাখো অভিভাবকের আশীর্বাদ আছে সঙ্গে। কাজে গাফিলতি করার উপায় নেই তাই একদমই। ভোর হলেই জানালার কাচ ভেদ করে হুড়মুড়িয়ে আলো ঢোকে তাঁর ঘরে। ঘুমে ঢুলুঢুলু। সামান্য কিছু মুখে দিয়েই নিজের চেয়ারটাতে বসে যান তখন সালমান। মনিটরে চোখ রেখে ভাবতে থাকেন শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো নিয়ে। একটানা চলে কাজ। গণিত ও বিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানের জন্য ইউটিউবে এক হাজার ৬৩০টি ভিডিও দিয়েছেন সালমান। প্রতিদিন কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থীরা প্রায় সত্তর হাজারবার সাহায্য নেয় এ ভিডিওগুলো থেকে। আনন্দদায়ক এক পদ্ধতিতে গণিত ও বিজ্ঞানের নিরস বিষয়গুলো আয়ত্ত করে নেয় সবাই। অল্প সময়ের ভেতর এত শিক্ষার্থীকে সহজ পদ্ধতিতে শিক্ষা দিতে পেরে আনন্দে ভরে যায় মন। সালমানের আনন্দে খুশি হন তাঁর স্ত্রী উমাইয়া মারভিও। চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় স্বামীর ওপর যে অভিমানটা ছিল এত দিন, উবে যায় তা নিমেষেই।

মুসা তার স্বপ্ন পূরণ করেছে


undefined
২০০৬ সালের শুরু তখন। মুসা ইব্রাহীম সবেমাত্র নেপালের একটি পর্বতারোহণ করে এসেছে। তখন তার সঙ্গে আমার টুকটাক কথাবার্তা হয়। একদিন পর্বতে ওঠার নানারকম ছবি দেখাল। ছবি দেখতে দেখতে কথা হচ্ছিল। তখনই দেখেছি ওর অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে পাহাড় আর এভারেস্ট।
ওর স্বপ্ন ছিল এভারেস্ট জয় করার। নিজের স্বপ্ন সে পূরণ করবেই। ফেসবুকে ও লিখেছে, ‘আমি যদি লক্ষ্য স্থির করি যে কিছু একটা করব, মনে রেখো, আমি সেটা যেকোনো উপায়েই করে ছাড়ব।’ ফেসবুকে নিজের সম্পর্কে যা বলেছে, ও তো তাই-ই। পাহাড়ের টানেই পেশাজীবনকেও সে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এমন কোনো পেশায় জড়ায়নি, যাতে ওর পাহাড়ে যেতে অসুবিধা হয়।
নর্থ আলপাইন ক্লাব গঠন করল। ঘোষণা দিল ‘ভিশন ২০১০: মিশন এভারেস্ট’। অন্নপূর্ণা-৪ জয়ের পর ওর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রবলভাবে শুরু হলো এভারেস্টে যাওয়ার প্রস্তুতি। মার্চের শেষের দিকে একবার ঢাকায় গিয়ে দেখলাম, মুসার মুখ একেবারে কালো। টাকার সংস্থান হচ্ছে না। যাওয়া হবে কি না, তা অনিশ্চিত। ময়মনসিংহ ফিরে আসার পর ৪ এপ্রিল ও জানাল, ‘চলে আসো। বৃহস্পতিবার যাচ্ছি।’

একটা সাগর কীভাবে হারিয়ে ফেললাম!


undefined
দলপতির আশকারা পেয়েই দলছুট হওয়ার সাহসটা পেয়েছিলাম; বুঝতে পারিনি যে পরিণতি মোটেই সুখকর হবে না। এখন উপকূলটা কোন দিকে, সেটাই আমি ঠাহর করতে পারছি নে। দল ছেড়ে দক্ষিণমুখো হওয়ার সময় মনে হয়েছিল, ম্যাকারনির বাসা দেখে ফিরতি পথে এই ছোট পাহাড়টা ডিঙিয়ে গেলেই উপকূলের নাগাল পাব, তারপর সৈকত ধরে আধাঘণ্টা জোর-কদম হাঁটলে মূল দলকে ধরে ফেলতে পারব। ম্যাকারনির ছবি তুলে বাঁয়ের পাহাড় ছাড়িয়ে আরও দুটো পাহাড় পার হয়েছি; এখন দেখি চারদিকে বরফঢাকা পাহাড় আর পাহাড়, সৈকতের কোনো চিহ্ন নেই। ম্যাকারনির খোঁজে ‘ব্রাউন ব্লাফ’ উপকূল থেকে দক্ষিণে বড়জোর এক কিলোমিটার দূরে গেছি; এখন ফিরতি পথে প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর পানি তো নজরে আসেই নি, ঢেউয়ের শব্দও কানে আসছে না। দলছুট হয়ে দেড় ঘণ্টার মধ্যে একটা আস্ত সাগর আমি কীভাবে হারিয়ে ফেললাম বুঝি নে!
ঘণ্টা দুই আগে আমরা একটা সাদামাটা হিমবাহের শিখরে উঠেছিলাম; সবাই আগ্রহ নিয়ে আজ ট্র্যাকিংয়ে এসেছে হিমবাহ পার হয়ে একটা ফিয়র্ড দেখা আর ১০ হাজার জেন্টু পেঙ্গুইনের বিশাল এক কলোনির ছবি তোলার জন্য। হিমবাহ থেকে নেমে সবাই বাঁয়ে মোড় নিয়ে ফিয়র্ড দেখতে যাবে, তারপর সৈকত ধরে ট্র্যাকিং করবে জাহাজের দেখা না পাওয়া পর্যন্ত। হিমবাহ থেকে নেমে আর সবার মতো উত্তরমুখো না হয়ে দক্ষিণে এগিয়ে গেলে ১৫ মিনিট পর একডজন ম্যাকারনি পেঙ্গুইনের একটা খুদে কলোনি দেখা সম্ভব—এই সংবাদটা গোপনে আমাকে দিয়েছিল ল্যারি হব্স। ল্যারি আমাদের

‘আর এগিয়েছ কি মরেছ’


undefined
‘এই, হ্যালো, পিছে হটো, পিছে হটো, আর এগিয়েছ কি মরেছ।’ সাহেবি ভদ্রতার ধার না ধেরে অভিযাত্রীদের কানে তালা লাগিয়ে চিৎকার করে দলপতি বলল, ‘শিগগির পিছে আসো, পিছে চলে আসো, ওভার-হ্যাং ভেঙে পড়বে।’ আমার উদ্দেশেই এত সব চেঁচামেচি, আমিই ফালমারের ফটো তোলার জন্য দলছুট হয়ে হিমবাহের প্রান্তে চলে এসেছি। আর সব অভিযাত্রী লাঞ্চ-প্যাকেট নিয়ে দলপতির পাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছেন। সকালে লঙ্গিয়ার্বেনের উষ্ণ আস্তানা ছেড়ে অন্তহীন হিমবাহে নেমে টানা চার ঘণ্টা আইস-স্কুটার হাঁকিয়ে সবাই ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, স্তিমিত; ইতিউতি তাকানোর উৎসাহ নেই কারও, শুধু এই রাইফেলধারী হামবড়া দলপতিটা ছাড়া।
আমারও উৎসাহ ছিল না হিমবাহের কার্নিশে ঝুল-বারান্দার মতো লটকে থাকা জমাট বরফের ওভার-হ্যাং কত ভর নিতে পারে, তা পরখ করার। চার ঘণ্টা আইস-স্কুটারের ক্লাচ ধরে রাখার পর লাঞ্চের ঠোঙা ছেঁড়ার জোরটুকুও ছিল না আঙুলে। আমরা বারেন্টস আর গ্রিনল্যান্ড সাগরের উত্তরে চির-শুভ্র দ্বীপপুঞ্জ সভালবার্ডের হিমবাহ পার হচ্ছি। এপ্রিলের ১১ তারিখ, এখন এখানে ২৪ ঘণ্টা দিনের আলো। বরফ-ঢাকা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার জন্য আইস-স্কুটার অসাধারণ এক বাহন; কিন্তু মুশকিল হলো, সারাক্ষণ এর ক্লাচ চেপে ধরে রাখতে হয়, ক্লাচ ছাড়লেই চলা বন্ধ। যাত্রী পড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ স্কুটার নিশ্চল করার জন্যই এ ব্যবস্থা। ক্লাচ ধরার সহজ কাজটুকু এ মহা হিমের জগতে যে কী এক জ্বালাতন, তা দুই হাতের শীতল ও অচল পেশিগুলো প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছিল। তাই একটু শ্যাডো-বক্সিং করে জমাট পেশি সচল করার মতলবে দল থেকে সরে হিমবাহের কার্নিশের দিকে হাঁটা দিয়েছিলাম।

Saturday, June 11, 2011

‘মুসাআআআ! রোপ ধরে ওঠো’


undefined
স্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
‘প্রথম বা দ্বিতীয় বলে কোনো কথা এখানে নেই। এটা এভারেস্ট। এতে আরোহণ করতে হয় ধীরে ধীরে এবং নিজের গতিতে।’ ২৩ জুন দিবাগত রাত ১২টার পর যখন আকাশে চাঁদ ঝলমলিয়ে উঠল, সেই প্রায় সাড়ে আট হাজার মিটার উচ্চতায় তেনজিং নোরগের এ কথা মনে পড়ছিল বারবার। বাংলাদেশ থেকে এভারেস্টে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, দেশের লাল-সবুজ পতাকা এভারেস্টের চূড়ায় ওড়াতে হবে—ক্লাবের সেই অভিযানের সহযোদ্ধাদের কথা ভাবছিলাম। রিমি-রাইদের কথাও ঝিলিক দিয়ে মনে উদয় হচ্ছিল। ক্ষুদ্র পরিসরটা নিজের, কিন্তু এর সার্বিক অর্জন তো দেশের। দেশের জন্যই তো এ অভিযান। আরেকটা নতুন অভ্যুদয়। আরেকটা নতুন সূচনা এবং নিজের ক্ষেত্রে তা পুনর্জন্মের প্রসবপর্ব। সবই ছিল অনুপ্রেরণার বিষয়বস্তু। সুতরাং ২০১০ সালে এভারেস্ট অভিযানে যাত্রাটা সবার জন্য ছিল অবশ্যম্ভাবী। এক ধরনের প্রতিযোগিতাও। তবে তেনজিং নোরগে মননে, আরোহণে সঙ্গেই ছিলেন প্রেরণাদাতা হিসেবে। এভারেস্টের বেস ক্যাম্প ও অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে তার ম্যান অব এভারেস্ট: অটোবায়োগ্রাফি অব তেনজিং নোরগে বইটি পড়ে এভাবেই শিহরিত হয়েছিলাম বারবার। আর ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, ২৩ জুন ছিল সেই অভিযানের ৪৬তম দিন। বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর হিসাবে (১৪ এপ্রিল) তা ছিল ৪০তম দিন এবং প্রতিটি দিন ছিল নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার দিন। ‘আমিও পারি’ কথাটি প্রমাণ করার দিন।

এভারেস্ট জয়ের সেই সকালটি


undefined
স্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ
থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
কৈলাসের কথা শুনে গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে। সেই রক ফেসের ডান দিয়ে সরু একটা খাঁজ। তার ওপর ক্র্যাম্পন ঠেকিয়ে কোনোমতে পার হচ্ছি। এ পর্যায়ে এভারেস্টজয়ী ফিরতি দলের সঙ্গে একের পর এক সাক্ষাৎ হচ্ছে। তাদের যে অভিনন্দন জানাব, মনের সেই অবস্থাও নেই। সেই রাত আটটায় শুরু হয়েছিল ক্লাইম্বিং, এখন প্রায় ভোর। এর মধ্যে কোনো খাওয়া-দাওয়া নেই, পানিও খাওয়া হয়নি। তার পরও শরীরের শক্তির শেষবিন্দু ঠেলে দিচ্ছি পাহাড়ে ওঠার দিকে। মনের তাড়না ও জেদের প্রায় পুরো অংশ ব্যয় করছি। শুধুই ভাবছি—বিশ্বের কোনো একজন মানুষ এ কাজ পারলে তা আমিও পারব। এই ভেবে নিজেকে চাঙা রাখছি।
শেষ দিকে প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাড়া একটা ঢাল পেরোতেই চোখে পড়ল এভারেস্টের চূড়া। আমি আনন্দে আত্মহারা। সেটা মনের মধ্যে চেপে ধরে এগোতে শুরু করলাম।
এবার হেডল্যাম্প পুরোপুরি বেঁকে বসেছে। কোনো আলোই বেরোচ্ছে না হেডল্যাম্প থেকে। ভাবলাম—তাহলে এগোচ্ছি কী করে? পূর্ব দিগন্তে চোখ ফেরাতেই দেখি আকাশ ফরসা হয়ে আসছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সেই আলোতেই যতটুকু পথ দেখা যায়, মনের অজান্তে তাকেই ভরসা ধরে নিচ্ছি। যাক, বাঁচা গেল তাহলে, নামার সময় তাহলে আর সমস্যা হবে না—মনে মনে ভাবছি।
আর মাত্র ৫০ মিটার ঢাল। পুরোটাই বরফ। দেখলাম, চূড়ার কাছে আরোহীদের লম্বা সারি। সামিট লাইন। সেই ঢাল পার হচ্ছি। আর মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছি। পাঁচ মিনিট, ছয়—সাত—আট—নয় মিনিটের মাথায় গিয়ে পৌঁছালাম এভারেস্টের চূড়ায়। লক্ষ্য পূরণ হলো। চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে। চিৎকার করে বলতে মন চাইছে, ‘আআআমিইই পেরেছিইইই। বিশ্বের দম্ভ, সর্বোচ্চ চূড়া এখন বাংলাদেশের পায়ের নিচে। এক বাংলাদেশির কাছে এভারেস্ট হার মেনেছে।’ সাফল্য লাভের পর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে এও প্রার্থনা করছি, যেন নিরাপদে নামতে পারি।

‘এভারেস্টের চূড়া দেখতে পাবে’


undefinedস্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
প্রথম পর্বের পর
কৈলাসের কথা শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। কান গরম হয়ে উঠল। আবারও জেদ চেপে গেল। দাঁতে দাঁত কামড়ে আগুন চোখে কৈলাসের দিকে তাকালাম। এরপর ঘাড় ফেরালাম আরও ডানে। এবার চার-পাঁচটা পুরোনো রোপ দৃষ্টিসীমায় এল। সেটা কিছুটা ডানে সরে গিয়ে পাকড়ালাম এবং আগের মতো বাঁ হাতে জুমার ঠেলে এবং ডান হাতে রোপ আঁকড়ে ধরে সেই ওভারহ্যাং ট্র্যাভার্স করতে শুরু করলাম।
বিধি বাম। ২০ সেকেন্ডের চেষ্টায় সেই ওভারহ্যাং পাশ কাটালাম ঠিকই। পিঠে ব্যাগপ্যাকের ভেতর অক্সিজেন বোতল রেখে রেগুলেটরটা বাইরে রেখেছিলাম, যাতে সহজেই বোতলে অক্সিজেনের পরিমাণ এবং অক্সিজেন প্রবাহ পরীক্ষা করা যায়। সেই রেগুলেটরের সঙ্গে যুক্ত রাবার পাইপ, যা বোতল থেকে অক্সিজেন মাস্কে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যায়—ঠিক ওপরের দিকে ফুটো হয়ে গেল ওভারহ্যাং রক ফেসে ঘষা খেয়ে। শশশশশশ। একটানা শব্দ হচ্ছে। অক্সিজেন বের হয়ে যাচ্ছে ফুটো পাইপ দিয়ে, ফুসফুসে যাচ্ছে শুধু সাধারণ বাতাস। যাতে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ৩৩ শতাংশ।
এতক্ষণ জীবন বাজি রেখে সেই ওভারহ্যাং পার হয়ে এলাম ঠিকই। কিন্তু বুক দ্বিগুণ বেগে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আর পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ায় সেই হাপর মনে হলো এখনি ফেটে যাবে—ভেতরে বাতাস নেই ঠিকই, কিন্তু বাইরের বাতাসের চাপে। বাতাস নাক-মুখ দিয়ে ফুসফুসে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকায় মনে হলো মরে যাচ্ছি। সেই রক ফেসের ওপর দুই হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাস্কের ভেতর মুখ হাঁ করে অক্সিজেন পাওয়ার চেষ্টা করছি। পারছি না, পারছি না। মরে যাচ্ছি, আর মনে হয় হলো না।

রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে স্লেজে ফিরে গেলাম


undefined
‘হাসকিদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ো, এর মুখ থেকে ওকে ছাড়িয়ে নাও, রক্ত দেখে ভয় পেয়ো না, হাত লাগাও, হার্নেস ধরে টান মারো, একে সরাও, ধরো ওটাকে।’ দলনেতা রবার্ট উন্মত্ত কুকুরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে পাগলের মতো চিৎকার করে আমার উদ্দেশে এসব কথা বলল। আমাদের দুই স্লেজের কুকুর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ১২টি হাসকির গর্জনে কানে তালা লাগছে, মুলার মতো দাঁত ঢুকে যাচ্ছে কারও পেটে-পিঠে। পায়ের তলায় হিমবাহের সাদা জমি কুকুরের রক্তে লাল। রবার্ট যতই চেঁচাক, এক ডজন সংগ্রামী হাসকির মাঝে সশরীরে দাঁড়ানো কি সোজা কথা! কিন্তু আমারই ‘পদস্খলনে’ শুরু হয়েছে এ হাসকি-লড়াই, এখন খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে তো থাকতে পারি না। বিকশিত দাঁতের বীভৎস সারি অগ্রাহ্য করে ভূলুণ্ঠিত একটা হাসকিকে টেনে সরালাম। অমনি তার ক্ষিপ্ত প্রতিপক্ষ ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। তার ভারে আমি ধরাশায়ী হলাম। চরকির মতো চার হাত-পা চালিয়ে রবার্ট দুই দল হাসকির মধ্যে কোনোমতে এক যুদ্ধবিরতি রেখা কায়েম করল। সেই নো-ডগ্স-ল্যান্ডে আমি রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে বসে রইলাম।

আমার মাথায় চাটি মেরে দৈত্যটা উড়ে গেল….ইনাম আল হক


‘দৈত্য, দৈত্য—পেট্রেল আসছে, মাথায় ঘা মারবে, বসে পড়ো বোকারাম, বসে পড়ো।’ চিৎকার করে এসব নির্দেশ দিতে দিতে ব্রেন্ট হিউস্টন হঠাৎ বসে পড়ে উত্তর দিকে সেজদা দিল। নির্দেশগুলো আমার উদ্দেশেই ছিল, কিন্তু আমার মাথায় তখন কি আর কিছু ঢোকে! দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে সদ্য অ্যান্টার্কটিকায় পা ফেলেছি, তারপর ‘প্যারাডাইস বে’ বা স্বর্গোপকূলের পাথুরে দেয়ালে আরোহণ করে একেবারে ঘোরের মধ্যে আছি। সমুদ্রের গর্জন কমে এসেছে, সৈকতে আমাদের সহযাত্রীদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শত শত ‘অ্যাডেলি পেঙ্গুইন’। আজ শীতের তীব্রতা কমেছে, তাপমাত্রা বেড়ে শূন্য ডিগ্রিতে এসেছে, সারাক্ষণ ঝুরঝুর করে তুষার ঝরছে। পাহাড়ের ওপর ওড়াউড়ি করছে দক্ষিণ মহাসাগরের বিরল পাখি, দৈত্য-পেট্রেল ও খয়রা-স্কুয়া। কাছে গিয়ে এদের দেখার জন্য আমরা দুই পাখিপ্রেমী পাহাড়ে উঠেছি। আরোহণের শ্রমে শরীর গরম, মন আরও উষ্ণ। গায়ের প্রকাণ্ড লাল জ্যাকেট খুলে ফুরফুরে মনে আমি ব্রেন্টকে বললাম, ‘এ স্বর্গোপকূলে আমার একটা ছবি তুলে দাও।’

আশা পূর্ণ হলো প্রতারণা দ্বীপে


undefined
‘সুপ্রভাত, ঘণ্টাতিনেক পর আমরা ডিসেপশন আইল্যান্ডে পৌঁছে যাব। এ দ্বীপ দুনিয়ার মেলা নাবিককে ধোঁকা দিয়েছে, কিন্তু আজ তোমার প্রত্যাশাটা ঠিকই পূরণ করবে।’ এক বাটি গরম স্যুপ নিয়ে দোদুল্যমান টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতেই এ কথা বলে আমাকে স্বাগত জানাল ব্রেন্ট হিউস্টন। আমাদের জাহাজ তখন দক্ষিণ মহাসাগরে ভাসমান বরফের অন্তহীন জঙ্গলে গুটি গুটি এগিয়ে চলছে। গতকালও জাহাজটি খণ্ড বরফের এই কণ্টকশয্যা পার হয়েছে অক্ষত দেহে। তবে অভিযাত্রী সবাই অক্ষত থাকেননি। অনেকেই সমুদ্রপীড়ায় কুপোকাত হয়ে আজ ব্রেকফাস্টে গরহাজির। বাইরে ঝকঝকে রোদ। পানিতে ছোঁ মেরে মাছ শিকার করছে একটি অ্যালব্যাট্রস। আমি বললাম, ‘কথাটা মনে রেখো ব্রেন্ট, আমার আশা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু জাহাজে ফিরব না। তখন ক্যাপ্টেন ডেমেল যদি মাইকের আওয়াজ বাড়িয়ে জাহাজ কাঁপিয়ে অনুপস্থিত যাত্রীর মুণ্ডুপাত করে তো সব শেষ তোমার।’
ব্রেন্ট হিউস্টন আমেরিকার পাখিবিদ, গবেষণার কাজে তৃতীয়বারের মতো অ্যান্টার্কটিকা সফরে এসেছে। আমার প্রথম সফর। প্রতারণা দ্বীপে নাকের ডগায় স্কুয়া আর পিন্টাডো পেট্রেল বসে থাকে বলে গল্প শুনিয়ে সে আমার প্রত্যাশা তুঙ্গে তুলেছে। বইয়ে পড়েছি, শত বছর আগে দক্ষিণ মহাসাগরে পিন্টাডো পেট্রেল দেখে অভিযাত্রী দল বুঝতে পারত, তারা অ্যান্টার্কটিক উপকূলের কাছে এসে গেছে। পেট্রেল পাখির দল অ্যালব্যাট্রস, স্কুয়া আর পেঙ্গুইনের মতো মাসের পর মাস সমুদ্রে ভেসে থাকতে পারে না। রাতে তাদের মাটিতে ফিরতে হয়। সমুদ্রে তাদের উড়তে দেখলে বোঝা যায় ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোথাও মাটি আছে। ব্রেন্ট বলেছে, প্রতারণা দ্বীপে পেট্রেল আর স্কুয়া পাখির দল বাসা বাঁধে। আমি আশা করে আছি, কাছে গিয়ে সেসব দেখতে পাব।
প্রতারণা দ্বীপটি আসলে অ্যান্টার্কটিক উপকূলের এক অগ্নিগিরি। লাভা জমে সাগরের পানির ওপর মাথা তুলেছে বলেই একে দ্বীপ বলা হয়। অগ্নিগিরির জ্বালামুখের মধ্যেও আছে সমুদ্রের পানি। বাইরে থেকে শুধু লাভার পাহাড় মনে হলেও ভেতরে এর বিশাল নিস্তরঙ্গ হ্রদ—দুর্গম দক্ষিণ সাগরে এক বিরল পোতাশ্রয়। তবে জ্বালামুখের যে ফাটল দিয়ে এ হ্রদে জাহাজ ঢুকতে পারে বহুকাল সেটা অনাবিষ্কৃত ছিল। আবিষ্কারের পর মানুষ এর নাম দিয়েছে ‘প্রতারণা দ্বীপ’—যেন এ দ্বীপ আগে ইচ্ছে করে আশ্রয়সন্ধানী নাবিকদের প্রতারিত করেছে।
আমরা সবাই এখন প্রতারণা দ্বীপের দিকে চেয়ে আছি। ব্রেন্ট ও আমি পাখি দেখার জন্য, আর অন্য যাত্রীরা অগ্নিগিরির উত্তপ্ত হ্রদে নামতে উন্মুখ। উত্তেজনার শেষ নেই। দ্বীপের পাথুরে দেয়াল জাহাজের কাছে এসে গেলে সমুদ্রপীড়ায় কাবু অভিযাত্রীরাও মাথা খাড়া করল। ক্যাপ্টেন ডেমেল নিপুণ হাতে জাহাজ চালিয়ে দেয়ালের সুড়ঙ্গ দিয়ে আমাদের নিয়ে গেল অগ্নিগিরির ভেতরে। জাহাজ নোঙর ফেললে আমরা রবারের ডিঙিতে চড়ে ডাঙার দিকে রওনা হলাম। এক দশক আগে অগ্নিগিরির একটা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এখন সে ঘুমন্ত, চারদিক সুনসান, পানিতে বুদবুদ উঠছে, বাতাসে গন্ধকের গন্ধ।
ডাঙায় পা রেখে উত্ফুল্ল সহযাত্রীরা সমুদ্রস্নানে নেমে গেল। আমাদের প্রত্যাশা তখনো পূরণ হয়নি। চারদিকে স্কুয়া আর পিন্টাডো পেট্রেলের ওড়াউড়ি চলছে। লাভার ফাঁকে ফাঁকে তারা বাসা বেঁধেছে। আমরা পাহাড়ের দেয়াল বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। কাছ থেকে সাধ মিটিয়ে সব দেখতে চাই। অ্যান্টার্কটিকার প্রাণী নির্ভয়ে মানুষের কাছে আসে। তাদের উদ্বেগের কারণ না হয়েই অনেক কাছে যাওয়া গেল। তারপর তৃপ্তমনে আমরা অবতরণ শুরু করলাম।

সফল জীবনের জন্য…….মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ্


মানবজাতির জীবন বলতেই তার একটি উদ্দেশ্য থাকা চাই।
for a successful life
উদ্দেশ্যহীন জীবনের নেই কোনো মূল্য, নেই কোনো প্রাপ্য। জীবনের যেমন উদ্দেশ্য আছে, তেমনি উদ্দেশ্যেরও রয়েছে জীবন তথা জীবনময়তা। অর্থাৎ উদ্দেশ্যের সততা ও মহত্ত্ব। তাই উদ্দেশ্য হতে হবে সৎ ও মহৎ, যার ছত্রে-ছত্রে থাকে আদর্শের দীপ্তি। জীবনের উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্যের জীবন তথা আদর্শ ও উদ্দেশ্যের শুদ্ধতা ও সততাই হলো সফল জীবনের মূলমন্ত্র। উদ্দেশ্যময়তা ও অলসতা পরস্পরবিরোধী আচরণ। কখনো উভয়ের সম্মিলন হতে পারে না। যে ব্যক্তি জীবনের কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তার পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে সে লক্ষ্যের দিকে। সে এদিক-সেদিক মনোযোগ দিয়ে নিজের স্বর্ণের মতো মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারে না। লক্ষ্য নির্ধারণ করে যে জীবন পরিচালনা করে, সে তীব্র বেগে ছুটে ঐ মুসাফিরের মতো যে প্রতিটি মুহূর্ত নিবিষ্ট থাকে আখেরি মনজিলের দিকে অগ্রসর হতে। পৃথিবীর দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য তাকে মুগ্ধ ও প্রলুদ্ধ করতে সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু সে দু’চোখ বন্ধ করে পথ চলতে থাকে লক্ষ্যে পৌঁছার প্রত্যাশায়। ছায়াশীতল বিশ্রামস্থান তাকে আরাম ও বিরামের জন্য উদ্বুদ্ধ করে, কিন্তু সে পথ চলতে থাকে মোহ-মুগ্ধতার স্বাদ ছেড়ে। বিচিত্র চাহিদা তার পথকে অবরোধ করে, কিন্তু সে সচল পদবিক্ষেপে এগুতে থাকে সকল বাঁধ-বাধার প্রতিরোধ করে। জীবনের বিভিন্ন উত্থান-পতন, স্খলন ও পদস্খলন তাকে ঠেকিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু তাতেও কোনো ছেদ পড়ে না তার ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞায়, তার দৃপ্ত পদচারণায়। লক্ষ্য স্থিরকারী ব্যক্তি কখনো দিকভ্রান্ত হতে পারে না। কারণ, রাস্তা ও আখেরি মনজিল সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা থাকে। সামনে থাকে তার একটি সুনির্ধারিত লক্ষ্য। কখনো সে পথ থেকে ফসকে পড়ে না। অসঙ্গত প্রসঙ্গ নিয়ে সময় নষ্ট করে, নি®প্রাণ আনন্দে মেতে ওঠে না। সবদিক থেকে মনোযোগ হঠিয়ে শুধু একদিকেই সে মনোযোগ নিবদ্ধ করে। লক্ষ্য অর্জন হওয়া ও আখেরি মানজিলে পৌঁছা পর্যন্ত তাকে থাকতে হয় কর্মচঞ্চল ও ব্যস্তসচল। তাই জীবনকে সচল ও সফল করার জন্য প্রত্যেকেরই একটি সুচিন্তিত ও সুচিহ্নিত লক্ষ্য থাকা অনিবার্য, অপরিহার্য। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন হওয়া চাই, যার সততা ও সত্যতার ওপর অন্তর পূর্ণ আস্থা রাখে, হৃদয় যাকে পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং যা রক্তের মতো প্রতিটি রন্ধ্রে বিচরণ করে। এই লক্ষ্য নির্ধারণই মানুষকে অন্যান্য জীব থেকে বিশিষ্টতা দান করে। মনুষ্যত্ব ও পশুত্বের মাঝে বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্যের দেয়াল তোলে। উদ্দেশ্যের সঙ্গে আদর্শের এবং চিন্তার সঙ্গে কর্মের সংযোগ ঘটাতে হবে। চিন্তা হতে হবে আদর্শিক, বাস্তবভিত্তিক ও কর্মমুখী। আর কাজ হতে হবে চিন্তানির্ভর, ফলপ্রসূ ও বাস্তবমুখী। চিন্তাহীন কর্ম ও কর্মহীন চিন্তা দুটোই অúূর্ণ ও অকার্যকর। যে ব্যক্তির জীবনে লক্ষ্যের প্রতি একাগ্রতা ও একাত্মতা সৃষ্টি হবে, তার জীবন অবশ্যি অন্য এক জীবন হয়ে উঠবে, জীবন-সূর্য তার হৃদয়-আকাশে আলোর উদ্ভাস ঘটাবে।

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons