Total Pageviews

Showing posts with label বিজয়ী. Show all posts
Showing posts with label বিজয়ী. Show all posts

Wednesday, September 14, 2011

 কিলিমানজারো জয় করলেন মুসা ইব্রাহীম ও নিয়াজ

কিলিমানজারোর উহুরু পিক-এ বাংলাদেশের পতাকা হাতে (বাঁ থেকে) নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও মুসা ইব্রাহীম: কিলিমানজারোর উহুরু পিক-এ বাংলাদেশের পতাকা হাতে (বাঁ থেকে) নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও মুসা ইব্রাহীম: ছবিটি ই-মেইলে পাঠিয়েছেন মুসা ইব্রাহীম
বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী পর্বতারোহী মুসা ইব্রাহীম এবার জয় করলেন আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট কিলিমানজারো। নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশের (এনএসিবি) এই অভিযানে মুসার সঙ্গে এ পর্বতচূড়া জয় করেছেন নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী। কিলিমানজারো জয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ চূড়া জয়ের (সেভেন সামিট) দ্বিতীয় ধাপ অতিক্রম করল এনএসিবি।
মুসা ইব্রাহীম ই-মেইল বার্তায় জানান, ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সকাল সাতটা ৪৮ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১০টা ৪৮ মিনিট) কিলিমানজারো জয় করেন দুই বাংলাদেশি পর্বতারোহী। তানজানিয়ায় অবস্থিত ১৯ হাজার ৩৪০ ফুট উঁচু আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতে এদিন এনএসিবির সাধারণ সম্পাদক মুসা ইব্রাহীম ও সদস্য এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। এনএসিবির পক্ষ থেকে এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
জানা যায়, এই অভিযানে কিলিমানজারো পর্বতের মাচামি রুট অনুসরণ করা হয়। তবে এই অভিযানের অপর সদস্য ৫৭ বছর বয়সী এম এ সাত্তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১১ সেপ্টেম্বর ১৩ হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বারানকো ক্যাম্প থেকে মোশি শহরে ফিরে আসেন।
এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর এনএসিবির সদস্যরা ছয় হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মাচামি গেট থেকে কিলিমানজারো পর্বতাভিযান শুরু করেছিলেন। এরপর মাচামি ক্যাম্প, শিরা ক্যাম্প ও বারানকো ক্যাম্প হয়ে তাঁরা ১১ সেপ্টেম্বর ১৫ হাজার ৮৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সর্বশেষ ক্যাম্প বারাফুতে পৌঁছান। এখান থেকে অভিযাত্রীরা ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত সোয়া একটায় পর্বতচূড়া জয়ের জন্য যাত্রা (সামিট পুশ) শুরু করেন। ছয় ঘণ্টা ৩৩ মিনিট আরোহণ শেষে তাঁরা কিলিমানজারোর সর্বোচ্চ পয়েন্ট ১৯ হাজার ৩৪০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট উহুরু পিকে পৌঁছে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। একই দিন তাঁরা ১০ হাজার ১৬৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মেওকা ক্যাম্পে নেমে আসেন।
এনএসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গতকাল মেওকা গেটে কিলিমানজারো ন্যাশনাল পার্ক ও তানজানিয়া ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষ তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে উহুরু পিক আরোহণ করার সনদ দেন। ২০ সেপ্টেম্বর তাঁরা দেশে ফিরবেন।
সামিট গ্রুপ, এমিরেটস এয়ারলাইনস, শাহ্ সিমেন্ট, জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড ও ডেইলি স্টার এনএসিবির সেভেন সামিট অভিযানের কিলিমানজারো পর্বতাভিযান পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
কিলিমানজারো অভিযানের প্রাক্কালে মুসা ইব্রাহীমকে বাংলাদেশের পর্যটন দূত হিসেবে ঘোষণা দেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদের। মুসা ইব্রাহীম ২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করে সেভেন সামিটের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেন।

Friday, July 1, 2011

রিকশা চালিয়ে হাসপাতাল


ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালাচ্ছেন জয়নাল আবেদিন
ঢাকায় রিকশা চালান তিনি। রোদে পোড়েন। বৃষ্টিতে ভেজেন। কাঁপেন কনকনে শীতে। তবু থামে না রিকশার চাকা। এ যে তাঁর স্বপ্নেরও চাকা।
তিনি মো. জয়নাল আবেদিন। বয়স কত হবে? ৬০ কিংবা ৬১। চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেছে। কালো হয়ে গেছে দাঁত। দাড়ি শ্বেতশুভ্র। শরীর দুর্বল। রিকশার প্যাডেল চাপতে এখন পা ধরে আসে। পেশি টনটন করে। মাথা ঝিমঝিম করে। কিন্তু স্বপ্ন তাঁকে টেনে নিয়ে যায়।
ঢাকায় জয়নাল যখন কষ্টে কাতর, ময়মনসিংহে তখন তাঁর গড়া হাসপাতালে গরিব রোগীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ঢাকার বালি-ধূলি-ভেঁপুর শোরগোল চাপা পড়ে যায় জয়নালের অন্তরে বাজা তাঁর গড়া বিদ্যালয়ের শিশুদের হিল্লোলের নিচে।
একজন জয়নাল শুধু রিকশা চালিয়ে নিজ গ্রামে একটি হাসপাতাল করেছেন। গড়েছেন একটি বিদ্যালয়। চালাচ্ছেন মক্তব। ছোট তাঁর সেই হাসপাতালে ছয়টি শয্যা আছে। আছেন একজন পল্লি চিকিৎসক, সার্বক্ষণিক। সপ্তাহে এক দিন সরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক এসে রোগী দেখেন।
শুধু রিকশা চালিয়ে একজন অক্ষরজ্ঞানহীন জয়নাল একটি বিদ্যালয় গড়েছেন। হোক সেখানে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা। তাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন ১২০। বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে সকালে মক্তব বসে। গ্রামের শিশুরা সকালে সেখানে আরবি পড়ে। সাধ্য নয়, স্বপ্ন একজন রিকশাচালককে দিয়ে কী না গড়িয়ে নেয়! 
আঘাত থেকে অঙ্গীকার: ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নের টানহাসাদিয়া গ্রামে জয়নাল আবেদিনের বাড়ি। বাবা মো. আবদুল গনি ছিলেন ভূমিহীন কৃষক। আবদুল গনির চার ছেলে ও ছয় মেয়ের মধ্যে জয়নাল সবার বড়। অভাব-অনটনের সংসারে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি কারও। 
প্রায় ৩০ বছর আগের কথা। দিনক্ষণ ঠিক মনে নেই জয়নালের। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। সন্ধ্যার দিকে বাবা আবদুল বুক চেপে ধরে কাতরাতে লাগলেন। বাবার কষ্টকাতর মুখ দেখে দিশেহারা হয়ে পড়লেন সন্তানেরা। জয়নাল ও তাঁর ভাইয়েরা বের হলেন চিকিৎসকের খোঁজে। সে যুগে কাছেপিঠে কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র বা ভালো চিকিৎসকও ছিল না। গুটিকয়েক নাম ভাঙানো চিকিৎসক ও ওষুধের দোকান ছিল ভরসা। 
জয়নাল বললেন, ‘একপর্যায়ে রাত আটটার দিকে বাবাকে নিয়ে দুই কিলোমিটার দূরে মীরকান্দাপাড়ায় যাই। সেখানে মেহছেন বেপারীর ওষুধের দোকান ছিল। মেহছেনের বাবা জসিমউদ্দিন ছিলেন এলাকার কুখ্যাত রাজাকার। অসুস্থ বাবাকে নিয়ে দোকানে পৌঁছালে মেহছেন তাচ্ছিল্য করে বলে, রাজাকারের দোকানে ওষুধ নিতে আইছো ক্যান? তোমরার কাছে ওষুধ বেচুম না।’
বিমুখ হয়ে মুমূর্ষু বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন ছেলেরা। রাত ১০টার দিকে বাবা মারা যান। এই মৃত্যু স্তব্ধ করে দেয় জয়নালকে। কষ্টের আগুনে পুড়তে থাকেন তিনি। 
পেছনে চোখ ফেলেন জয়নাল। তাঁর এক মামা ময়মনসিংহের ব্যাংকে চাকরি করতেন। তাঁর সূত্রে ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একদল মুক্তিযোদ্ধা আসেন তাঁদের বাড়িতে। তাঁর বাবা সেই মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েক দিন বাড়িতে রেখে খাইয়েছেন। সে ইতিহাস জয়নালরা ভুলে গেলেও স্থানীয় রাজাকার জসিমউদ্দিন বা তাঁর ছেলে তা ভোলেননি। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন জয়নাল। 
মনের আগুন থেকে অঙ্গীকার। একটি হাসপাতাল গড়ার পণ করেন জয়নাল। সেই হাসপাতালে বিনা মূল্যে গরিব মানুষের চিকিৎসা হবে। ঠিক করেন, ঢাকায় চলে যাবেন। গতর খেটেই হাসপাতাল গড়ার টাকা জোগাবেন।
বাবার কুলখানির পর গাঁয়ের কয়েকজন মুরব্বি নিয়ে বসলেন জয়নাল। তাঁদের বলেন, ‘এই রইল আমার মা আর ভাইবোনরা। ওগো সমস্যা হইলে আপনেরা দেইখেন। আমি চললাম।’ স্ত্রী লাল বানু ও দেড় বছরের মেয়ে মমতাজকে নিয়ে ট্রেনে ঢাকার পথে ছোটেন জয়নাল। 
সাহসী যাত্রা: ঢাকায় পৌঁছে যেন গোলকধাঁধায় পড়ে যান জয়নাল। নতুন শহর। আপনজনহীন। নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। ট্রেন থেকে নেমে স্ত্রী ও শিশুকন্যা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি বড় মাঠে গিয়ে পৌঁছেন তিনি। পরে জেনেছেন, এটি শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মাঠ। ওই মাঠে পানির ট্যাংকের নিচে সপরিবারে আশ্রয় নেন জয়নাল। সেখানে কাটে দেড় দিন। কত সালে জানতে চাইলে বলেন, ‘তখন এরশাদের আমল।’
পরিবারটির ব্যাপারে কৌতূহলী হন স্থানীয় মোশাররফ (৪৫)। তাঁর বাড়ি বিক্রমপুরে। কয়েকটি রিকশা ভাড়া খাটাতেন তিনি। জয়নালের সব জেনে মায়া হয় তাঁর। খাওয়ার জন্য ৫০ টাকা দেন। মোশাররফ এক দিনেই রিকশা চালানো শিখিয়ে একটি রিকশাও দেন জয়নালকে। সঙ্গে কলোনির একটি বাসার বারান্দায় ১৫০ টাকা ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থাও করে দেন।
জয়নাল স্মৃতিচারণা করেন, ‘প্রথম খেপে বাদামতলীতে গিয়ে ৩০ টাকা পাই। এভাবে এক দুপুর রিকশা চালিয়ে পাই ৯৫ টাকা। বাকি বেলায় জোটে ৫৫ টাকা। মোশাররফকে রিকশার জমা দেই ২০ টাকা। সপ্তাহ খানেক এভাবে চলে।’ 
অঙ্গীকার পালনের তাড়া আর স্বপ্নের হাতছানি জয়নালকে পরিকল্পনা শেখায়। হাসপাতাল গড়তে হলে তিল তিল করে করতে হবে বড় সঞ্চয়।
এক মনে সঞ্চয়: তত দিনে আপনজন হয়ে ওঠা মোশাররফকে অকপটে হাসপাতাল গড়ার স্বপ্নের কথা জানান জয়নাল। মোশাররফের পরামর্শে স্থানীয় এক মুদি দোকানির কাছে কিছু টাকা জমান জয়নাল। ওই টাকা নিয়ে ব্যাংকে হিসাব খুলতে গেলে শুরুতে কর্মকর্তারা পাত্তাই দেননি। অবজ্ঞাভরে বলেছেন, ‘রিকশাওয়ালা! কিছু টাকা জমিয়ে কয় দিন পর ঋণ চাইতে আসবে।’
কিন্তু দমেননি জয়নাল। বিভিন্ন ব্যাংকে গিয়ে হিসাব খুলতে ধরনা দেন। শেষে সোনালী ব্যাংক মতিঝিল শাখার ব্যবস্থাপক সালেহা আক্তার তাঁর আবেগের মূল্য দিলেন। তাঁর সহযোগিতায় ডিপিএস হিসাব খুলে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে জমাতে লাগলেন জয়নাল। একই ব্যাংকের দিলকুশা শাখায়ও একটি হিসাব খুললেন তিনি। সেখানে ডিপিএস করেন ৫০০ টাকার।
‘নিয়মিত টাকা জমাতে গিয়ে জান দিয়ে খাটতে হয়েছে। কখনো রাতদিন রিকশা চালিয়েছি। টাকা জমানোর কথা স্ত্রীকে জানাইনি। সংসারে যত কষ্টই হতো, কখনো জমানো টাকায় হাত দেইনি।’ বললেন জয়নাল।
এর মধ্যে সংসারে ছেলে জাহিদ হাসানের আগমন ঘটেছে। মগবাজারের উদয়ন ক্লিনিকে আয়ার কাজ নিয়েছেন স্ত্রী লাল বানু। চিকিৎসক জাহাঙ্গীর কবির একদিন জয়নালের রিকশায় করে যাচ্ছিলেন। কথায় কথায় জয়নাল চিকিৎসককে তাঁর সংকল্পের কথা জানান। ওই চিকিৎসকই জয়নালের স্ত্রীকে কাজটি পাইয়ে দেন। দীর্ঘদিনের চর্চায় প্রসূতি নারীর আনুষঙ্গিক সহযোগিতার কাজে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন লাল বানু।
কায়ক্লেশে প্রায় ২০ বছর রাজধানীতে কেটে যায় জয়নাল পরিবারের। এতগুলো বছর গোপনে জমা হয়েছে জয়নালের রক্তমাংস নিংড়ানো টাকা।
ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। মেয়ে মমতাজের বিয়ে হয়েছে ময়মনসিংহে। ছেলে জাহিদ হাসান এইচএসচি পাস করে এখন মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে মোবাইল ফোনসেট মেরামতের দোকান দিয়েছেন। তিনিও দুই সন্তানের জনক। 
স্বপ্নের খুঁটি গাড়া: ২০০১ সালে স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন জয়নাল। সব সঞ্চয় এক করে পান এক লাখ ৮৪ হাজার টাকা। তা নিয়ে গ্রামে ফেরেন তিনি। বাড়ির কাছে ৪০ হাজার টাকায় ২৪ শতাংশ জমি কেনেন। এক শুক্রবারে গাঁয়ের মানুষ ডেকে হাসপাতাল গড়ার ঘোষণা দেন জয়নাল—‘এইহানে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হইব।’
লাল বানু বললেন, ‘লোকজন খুশি হবে কি, হেসেই উড়িয়ে দিল। হাসপাতাল গড়বে রিকশাচালক জয়নাল আবেদিন!’ আরও যোগ করলেন, ‘মাইনসের কতা কি কমু, আমার নিজেরই তহন তাঁরে পাগল মনে অইত। এহন হেই কথা ভাবলে কষ্ট লাগে।’
আপনজনরা টাকা অপচয় হবে বলে জয়নালকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কিন্তু জয়নাল স্বপ্ন জয় না করে ছাড়বেন না। নতুন কেনা জমিতে দোতলার ভিত্তি দিয়ে একটি বড় আধাপাকা ঘর তৈরি করেন। এই নির্মাণকাজে সঞ্চয়ের প্রায় পুরো টাকা চলে যায়। মেয়ের নামে হাসপাতালের নাম দিলেন তিনি ‘মমতাজ হাসপাতাল’। 
হাসপাতালে একদিন: সম্প্রতি ময়মনসিংহ শহর থেকে নৌকায় ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে মোটরসাইকেলে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছি সিরতা বাজার। মনিহারি দোকানে কয়েকজন লোক বসা। উদ্দেশ্য জানালে এক যুবক নিয়ে গেলেন জয়নালের বাড়ি। বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে।
বাড়ির সামনে বাঁশের খুঁটিতে একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা মমতাজ হাসপাতাল। পেছনে প্রায় ২৫ ফুট দীর্ঘ একটি টিনশেড ঘর। এটাই জয়নালের হাসপাতাল ভবন। 
উঠানে গাভির পরিচর্যা করছিলেন জয়নাল। আগন্তুক দেখে কাছে এসে দাঁড়ালেন দীর্ঘদেহী সৌম্যকান্ত জয়নাল। মৃদু হেসে পরিচয় জানতে চাইলেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সোৎসাহে দেখাতে লাগলেন তাঁর হাসপাতাল। 
হাসপাতাল বলতে প্রচলিত অর্থে যা বোঝায়, জয়নালের আয়োজন তা নয়। তবে জয়নাল তাঁর ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে যেভাবে তিন দশক ধরে লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন, তার মাহাত্ম্য অনেক বড়। এ মাহাত্ম্য একটি হাসপাতাল গড়ার চেয়েও বিশাল।
ঘরটি দুটি কক্ষে বিভক্ত। একটি কক্ষে রোগীদের জন্য ছয়টি শয্যা। অন্য ঘরে একপাশে চিকিৎসক ও রোগীর বসার ব্যবস্থা। অন্য পাশে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষায় নানা বয়সী ১০-১২ জন নারী-পুরুষ। বেশভুষায় দারিদ্র্য। সময় গড়াচ্ছে, রোগীও বাড়ছে। সকাল নয়টার দিকে মোটরসাইকেলে চেপে হাসপাতালে এলেন পল্লি চিকিৎসক মো. আলী হোসেন। বারান্দায় টেবিল পেতে শুরু করলেন রোগী দেখা। পাশে বসে খাতায় রোগীর নাম-পরিচয় লিখছে জয়নালের নাতনি মমতাজের মেয়ে দশম শ্রেণীর ছাত্রী আল্পনা। জয়নালের পুত্রবধূ এসএসসি পাস তামান্না ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বিনা মূল্যে ওষুধ দিচ্ছিলেন রোগীদের। ভেতরে একটি শয্যায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত একজনকে স্যালাইন নেওয়ায় সহযোগিতা করছেন লাল বানু, জয়নালের স্ত্রী। জয়নাল ঘুরে ঘুরে রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। 
নয়াপাড়ার কৃষিশ্রমিক মজিবর (৩৫) বলেন, ‘মাইনসের খেতে কাম কইরা খাই। জ্বরে পইড়া কাইল আইছিলাম। আইজ একটু ভালা। এহানে ডাক্তার দেহাইতে টেহা লাগে না। ওষুধও মাগনা।’
পাশের হইল্লাবাড়ি গ্রামের আমেনা খাতুন (৬০) বলেন, ‘আগে অসুখ অইলে চাইর-পাঁচ মাইল হাইট্টা পরানগঞ্জ যাইতে হইত। এহন কাছেই চিকিৎসা। এইহানে চিকিৎসা করাইতে টেহা লাগে না। ডাক্তারও ভালা।’ উপস্থিত অন্য রোগীরা তাঁর কথায় সায় দিলেন। 
পল্লি চিকিৎসক আলী হোসেন শুক্রবার বাদে প্রতিদিনই আসেন। সকাল নয়টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত রোগী দেখেন। প্রতিমাসে তিনি দেড় হাজার টাকা বেতন পান। 
আলী হোসেন বলেন, ‘শুরুতে এই চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে গাঁয়ের লোকজন হাসাহাসি করত। এখন আর তা নেই। প্রতিদিন এখানে ২৫-৩০ জন রোগী আসে। জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, কাটাছেঁড়ার রোগী আর গর্ভবতী মারা আসেন এখানে। তাদের আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসা ও ওষুধ দেই। হাসপাতালের যাবতীয় খয়খরচা জয়নাল কাকা চালান। কাকি (লাল বানু) ধাত্রীবিদ্যার কৌশল জানেন বলে এখানে অন্তঃসত্ত্বা নারীর স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের ব্যবস্থাও আছে।’
প্রতি বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালের বক্ষব্যাধির চিকিৎসক হেফজুল বারী আসেন মমতাজ হাসপাতালে রোগী দেখতে। ওই দিন রোগী হয় সবচেয়ে বেশি।
যেভাবে ব্যয় নির্বাহ: জয়নাল জানান, বর্তমানে ঢাকায় প্রতিদিন দুই বেলা রিকশা চালিয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পান। সপ্তাহে তিন-চার দিন রিকশা চালিয়ে যা আয় হয় তার সিংহভাহ দিয়ে ওষুধ কিনেন হাসপাতালের জন্য। বাকি টাকায় বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাড়ি ফেরেন। দিন দুয়েক বাড়িতে থেকে আবার ছোটেন ঢাকায়। এভাবে চলে এখন জয়নালের দিনকাল।
জয়নাল জানান, গ্রামে কিছু জমি বর্গা নিয়ে ধান, মরিচ ও সবজি চাষ করছেন। বাড়িতে একটি দুধেল গাই বর্গায় পালন করছেন। একটি ছোট পুকুরে মাছ চাষও করছেন। এসবের আয় দিয়ে এখন কোনো মতে চলে যায় তাঁর।
জয়নাল জানেন, তাঁর শারীরিক শক্তি যত দিন আছে তত দিন চলবে এই হাসপাতাল। কিন্তু তারপর কী হবে? সহায়তার জন্য অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ধরনা দিতে শুরু করেছেন জয়নাল। বিমুখ হয়েছেন, হয়েছেন প্রতারিতও।
২০০৫ সালে তাঁর হাসপাতালের কথা জানতে পেরে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শাহনাজ পারভীন এক হাজার ডলার পাঠান। যার কাছে সেই টাকা পাঠানো হয়েছিল তিনি তাঁর বড় অংশই মেরে দেন। কিছু টাকা অনেক কষ্টে উদ্ধার করে হাসপাতালের জন্য কিছু আসবাব কেনেন জয়নাল। কাটান একটি ছোট পুকুর। 
এই প্রতিবেদকের কাছে জয়নালের হাসপাতাল সম্পর্কে জেনে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ময়মনসিংহের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান বললেন, ‘আমি সংগঠনের মাধ্যমে সেখানে সপ্তাহে অন্তত একজন চিকিৎসক পাঠানোর ব্যবস্থা করব।’
ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) এ বি এম মোজাহারুল ইসলাম বললেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এখন আমি আমার সাধ্যমতো সহযোগিতা করব।’
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, ‘ওই হাসপাতালের জন্য ওরস্যালাইনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় যেসব ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব, তার ব্যবস্থা আমি নেব।’ 
বিদ্যালয়: হাসপাতালের পাশে একটি ছোট দোচালা ঘর। এখানেই বিদ্যালয় ও মক্তব চালু করেছেন জয়নাল। সকালে মক্তবে শিশুরা এসে আরবি শেখে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত চলে প্রথম শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান।
বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের একজন ফলিয়ামারীর এসএসসি পাস যুবক মো. আইয়ুব আলী জানান, বিদ্যালয়ে এখন ১২০ জন শিক্ষার্থী আছে। এর মধ্যে ৭০ জনের মতো ছাত্রী। তাদের বিনা মূল্যে বই-খাতা দেওয়া হয়। কোনো ফি নেওয়া হয় না।
সরকারি বই পান কি না জানতে চাইলে জয়নাল বলেন, ‘না। আমি বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে পুরোনো বই চেয়ে আনি। সামান্য কিছু লাগলে কিনে নিই। খাতা-কলম-চক-পেনসিল কিনে দেই।’
তৃতীয় শ্রেণী পাস করে শিক্ষার্থীরা কোথায় যায়—জানতে চাইলে শিক্ষক আইয়ুব আলী জানান, সিরতা-নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং এক মাইল দূরের ফলিয়ামারী রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।
যা কিছু প্রাপ্তি: জয়নাল গরিব, কিন্তু তাঁর হাসিটা কোটি টাকা দামের! হাসিতে থাকে তৃপ্তির আলোকছটা। স্বপ্নের হাসপাতাল তাঁকে এই তৃপ্তি দিয়েছে। এই মানুষটি মনের দিক থেকে কেমন? ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২৮ জুন ‘এসো বাংলাদেশ গড়ি’ শীর্ষক রোড শো চলাকালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে সনদ ও পদক দেওয়া হয়। 
জয়নাল বলেন, ‘শেষ বয়সে আমি আর কী চাইব? এলাকার মানুষ যে আমার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন, এটাই আমার বড় পাওয়া।’
অসম্ভবকে জয় করা জয়নাল পড়ন্ত বয়সেও কারও আশায় বসে থাকতে রাজি নন। জীবিকার পথে এখনো সচল তিনি। রিকশা চালিয়ে যে টাকা পান, তা দিয়েই চালান হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও মক্তব। এতেই তাঁর সুখ।

Tuesday, June 21, 2011

পলিথিন মিশে যাবে মাটিতে!



এক্সটোডার যন্ত্রে বিকল্প পলিথিন তৈরির কাঁচামাল ঢালছেন এস এম ওয়াহিদুজ্জামান
এমন পলিথিন, যা মিশে যায় মাটির সঙ্গে। পরে এটি পরিবেশবান্ধব ও ধীরগতির সার হিসেবে ব্যবহূত হবে। আর এ পলিথিন তৈরিতে ব্যবহূত হয়েছে পরিচিত সব জিনিস। ক্ষতিকর পলিথিনের মাটিতে মিশ্রণীয় পরিবেশবান্ধব এমনই এক বিকল্প উদ্ভাবন করেছেন অধ্যাপক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান। মাটিতে মিশে যায় এমন পলিথিন তৈরির খবর শোনা যায়। তবে মাটিতে মিশ্রণীয় পলিথিন তৈরিতে ওয়াহিদুজ্জামানের পদ্ধতিটি নতুন।ভাতের মাড়, চালের গুঁড়া, আলু, অ্যারারুট প্রভৃতি শ্বেতসার-জাতীয় পদার্থের সঙ্গে পলিভিনাইল অ্যালকোহল (পিভিএ), জিগাগাছের আঠা, ইউরিয়া, চিনি, সয়াবিন তেল মিশিয়ে বিকল্প পলিথিন উদ্ভাবন করেছেন তিনি।
বিকল্প এই পলিথিন ছিল এস এম ওয়াহিদুজ্জামানের পিএইচডি গবেষণার বিষয়। গত ৯ এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের এক বিশেষ সভায় রসায়ন বিভাগের গবেষক এস এম ওয়াহিদুজ্জামানকে তাঁর ‘প্রিপারেশন অ্যান্ড ক্যারেক্টারাইজেশন অব বায়োব্লেন্ড অব ন্যাচারালি অকারিং পলিমারস অ্যান্ড ওয়াটার সুলিউবল পলিমারস টেকনিক’ শিরোনামের অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হয়। রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোবারক আহমদ খানের যুগ্ম তত্ত্বাবধানে তিনি এ গবেষণা সম্পন্ন করেন।
ওয়াহিদুজ্জামান জানালেন, রাসায়নিক পদার্থ ইথিলিনের পলিমার হচ্ছে পলিথিন। এই পলিথিন মাটি ও পানিতে মিশ্রণীয় না হওয়ায় পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তা ছাড়া সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্ব ক্ষতিকর পলিথিনে মোড়কজাত দ্রব্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে। আমাদের দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্যাকেজিংয়ের কাজে ক্ষতিকর পলিথিন ব্যবহার করা হয়। সুবিধাজনক কোনো বিকল্প না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে এ পলিথিন ব্যবহার করছে। তাই সব দিক মিলিয়ে এই ক্ষতিকর পলিথিনের বিকল্প উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
ঠিক এমন সময়ই অধ্যাপক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান ভাতের মাড়, চালের গুঁড়া, আলু, অ্যারারুট প্রভৃতি শ্বেতসার-জাতীয় পদার্থের সঙ্গে পলিভিনাইল অ্যালকোহল (পিভিএ), জিগাগাছের আঠা, ইউরিয়া, চিনি, সয়াবিন তেল মিশিয়ে পলিথিনের মতোই এর বিকল্প উদ্ভাবন করেন। গামা রশ্মি বিকিরণের সাহায্যে উৎপন্ন পলিমারকে ক্রস লিংক বা আড়াআড়ি সংযোগ ঘটিয়ে এর গুণগত মান এবং উৎকর্ষ সাধন করা হয়েছে। বাজারে প্রচলিত পলিথিনের মতো এমন একটি পণ্য বানাতে ২০ শতাংশ চালের গুঁড়া, ১০ শতাংশ ইউরিয়া ও ৭০ শতাংশ পিভিএ ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের বিকল্প পলিথিন মাটির মধ্যে ৪২ দিনে ৩০ শতাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ধীরে ধীরে এটি পুরোপুরি ক্ষয় হয়ে যায়। এটি পানির মধ্যে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পর ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। তবে পিভিএর পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর স্থায়িত্ব ও টেকসইয়ের মানও বাড়ানো যায়। এটি সাশ্রয়ী এবং মাটিতে মিশ্রণীয় বলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়।
ওয়াহিদুজ্জামান জানান, বাজারে প্রচলিত পলিথিন পরিবেশের জন্য হুমকি হওয়ায় এর বিকল্প উদ্ভাবনের চেষ্টা চালানোর পর তাঁরা সাফল্য অর্জন করেন। এটি বানাতে প্রাকৃতিক এবং শ্বেতসার বা স্টার্চ-জাতীয় পদার্থের সঙ্গে পলিভিনাইল অ্যালকোহল (পিভিএ) মিশিয়ে পলিথিনের বিকল্প পলিমার-জাতীয় পদার্থ উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই পলিমারকে এক্সটোডার যন্ত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পরিপূর্ণভাবে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়। এ ছাড়া এর মধ্যে ইউরিয়া থাকায় মাটিতে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এটি ধীরগতির সার হিসেবেও ব্যবহূত হবে। প্রচলিত পলিথিনের চেয়ে এর দাম একটু বেশি হলেও বাণিজ্যিকভাবে এটি উৎপাদন করা হলে দাম প্রচলিত পলিথিনের সমপর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি জানান।
এস এম ওয়াহিদুজ্জামান বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আটটি পাঠ্যপুস্তকের রচয়িতা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে তাঁর চারটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হন। ২০০৮ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ফেলোশিপ অর্জন করেন।

Wednesday, June 15, 2011

১৪ বছরেই পেশাদার সনদ!


undefined
পিএইচপির পেশাদার প্রোগ্রামার হিসেবে সনদ পেয়েছে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র শাহজাদ নূর
ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েবের জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম তৈরি করে ওয়েব জগতে নানা কাজের জন্য বর্তমান সময়ে পিএইচপি অন্যতম জনপ্রিয় একটি প্রোগ্রামিং ভাষা। কেতাবি ভাষায় যাকে বলা হয় সার্ভার সাইড স্ক্রিপ্টিং ল্যাঙ্গুয়েজ। নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য সংযোজনের মাধ্যমে এই ভাষার উন্নয়ন করা হচ্ছে। জেন্ড হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেটি দক্ষ পিএইচপি ডেভেলপার বা প্রোগ্রামার তৈরির ক্ষেত্রে সহায়তা করে। পিএইচপি ভাষায় যাঁরা দক্ষ প্রকৌশলী তাঁদের সনদপত্র দিয়ে থাকে জেন্ড।

Sunday, June 12, 2011

তুহিন বড়ুয়াঃ বিজ্ঞাপন ফার্ম ও প্রডিউসিংয়ে সফল মানুষ


undefined
ক্যারিয়ার হিসেবে মিডিয়া ব্যবসা কেন বেছে নিলেন?
তুহিন বড়ুয়াঃ আসলে আমার মিডিয়া ব্যবসা শুরু হয় আমার এক বন্ধু কহিনূরের উৎসাহে। সে গ্রম্নপ থিয়েটার করতো। একদিন কহিনূর আমাকে বললো, চল নাটকে বিনিয়োগ করি। মোটামুটি ভালো লাভ হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে কাজে নেমে পড়ি। তখন একুশে টিভি নাটকগুলো কিনে নিতো। প্রথম নাটকের নাম ছিল ‘নষ্টে কষ্টে জীবন’। নাটকটি একুশে টিভিতে প্রচার করা হলো। যদিও নাটকটিতে লাভ না হয়ে ক্ষতি হয়েছিল। তারপরও প্রচার হয়েছিল, এতেই খুশি ছিলাম। এরপরই ‘ঘাটের মানুষ’ নামে আরেকটি খন্ড নাটক করি। তারপর ধারাবাহিক নাটকে বিনিয়োগ করলাম। প্রথম ধারাবাহিক নাটকটির নাম ছিল ‘এবং বিয়ে’। এরপর যখন দেখলাম সবাই আমাকে চিনছে, সবার কাছে পরিচিতি বাড়ছে, তখন ভালোই লাগতো। এভাবেই মিডিয়া ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি।

শ্রম, মেধা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে যে কোন কাজ করলে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।

undefined 
শ্রম, মেধা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে যে কোন কাজ করলে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করার দৃষ্টান্তও আছে অনেক। সম্প্রতি আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ থেকে গ্র্যান্ট এ্যাওয়ার্ডসহ চার-চারটি এ্যাওয়ার্ড পেয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করলেন নর্থ ওয়েস্ট মিসৌরি ইউনিভার্সিটির কেমিস্ট্রি/ ফিজিক্স ফ্যাকাল্টির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. রফিক ইসলাম।
তিনি অধ্যাপনার পাশাপাশি নতুন কিছু উদ্ভাবন করার লক্ষ্যে নিজের মেধা ও শ্রমকে গবেষণা কাজে নিয়োজিত করেন। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যান পলিসিসটিক কিডনি ডিজিস জ্বীন নিয়ন্ত্রণের ওপর। যেহেতু মানব দেহের কিডনি সেলে পলিসটিন নামক এক ধরনের প্রোটিন তৈরি হয়, যা কোন কারণে তৈরি নাহলে কিডনিতে ছোট ছোট টিউমার দেখা দেয় কিংবা কিডনি সেলে খুব বেশি পরিমাণে পলিসটিন তৈরি হলে কিডনি বিকল হয়ে মানুষের মৃত্যু পর্য্যন্ত ঘটতে পারে। সেজন্য এই জ্বীনটিকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়ে। ড. রফিক ইসলামের কিডনি ডিজিস জ্বীনের নিয়ন্ত্রণের ওপর এ সাফল্য ভবিষ্যতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখবে বলা যায় নিঃসন্দেহে।

বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর বিস্ময়কার আবিষ্কার



undefined
এক বাংলাদেশী বিজ্ঞানীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলছে তোলপাড়। মূল ধারার বিভিন্ন মিডিয়াতে এখন তাকে নিয়েই আলোচনা-পর্যালোচনা। এ সময়ের প্রত্যাশিত সর্বশেষ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন তিনি। এই বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর নাম ড. আনিসুর রহমান। তিনি বর্তমানে পেনসিলভানিয়ার হেরিসবার্গের বাসিন্দা।
বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারপোর্টসহ নিরাপত্তা এলাকাগুলোতে যখন দেহ তল্লাশি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক, তখন তিনি আবিষ্কার করেছেন একটি বিস্ময়কার প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো মানুষের শরীরে বিস্ফোরকের যেকোনো উপাদান থাকলে সেটি এমনিতেই ধরা পড়বে। এ জন্য বর্তমানের এক্সরে মেশিনের প্রয়োজন হবে না।

আউটসোর্সিং এ আলফা ডিজিটাল টিমের সফলতা


বর্তমানে ওডেস্ক (www.oDesk.com) মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সররদের অবস্থান বেশ সন্তোষজনক। ওডেস্কে যে কয়জন ফ্রিল্যান্সার সফলতার সাথে কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে “আলফা ডিজিটাল” নামক একটি টিম। বর্তমানে এই টিমের সদস্য সংখ্যা ৫০ এর কাছাকাছি। কয়েকমাস আগেও এই গ্রুপটি ওডেস্কের শীর্ষ দশের মধ্যে সপ্তম স্থানে অবস্থান করছিল। গত বছরের এপ্রিলে গঠিত হয়ে মাত্র এক বছরে তারা এ পর্যন্ত ৩১৮ টি প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছে এবং মোট ১৩ হাজার ঘন্টার উপর কাজ করেছে। এই মূহুর্তে তারা একসাথে ৭৫ টি প্রজেক্টে কাজ করছে। এই টিমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হচ্ছেন মামুনুর রশিদ নামক একজন ফ্রিল্যান্সার। ওডেস্কে এই সফলতা নিয়ে কথা বলেছিলাম তার সাথে। জানিয়েছেন এই সফলতার পেছনের সকল প্রচেষ্টার কথা।

সময়ের ব্যবস্থাপনা


সময়ের ব্যবস্থাপনার  কৌশলগুলোর  বিকাশ হলো গে’ একটা যাত্রা। এই যাত্রা আমাদের এই  নির্দেশিকার সঙ্গে  আরম্ভ হতে পারে । কিন্তু যাত্রাপথে দরকার পড়বে  অনুশীলন এবং আরো  কিছু পথ নির্দেশিকার ।
এই আলোচনার একটা লক্ষ্য হলো—কী করে সময়ের  ব্যবহার করতে হয়  সে সম্পর্কে তোমাকে আত্মসচেতন হতে সাহায্য করা । তোমারবন্ধুবান্ধব, পরিবার এবং কাজকর্মের প্রেক্ষাপটে  এই লক্ষ্য তোমার  লেখাপড়ার কাজটিকে অনেক  সংহত, অগ্রাধিকার প্রদান এবং সফল হবার জন্যে একটা সহায়ক হিসেবে কাজ করে ।
প্রথমত ঃ তুমি  আমাদের  সময় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত  অনুশীলনীটি দিয়ে  আরম্ভ করো।
প্রতিদিন তুমি তোমার   সময় কীকরে ব্যয় করো ?

সফল নারী হয়ে ওঠার গল্প


undefined
পিছিয়ে থাকার সময় অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তাইতো আমাদের নারীরা আজ সাফল্যের পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে অনেক শ্রমের গল্প। বিশ্ব নারী দিবসকে সামনে রেখে আমাদের শোবিজ জগতের খ্যাতিমান কয়েকজন নারীর সফল হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে এবারের মূল ফিচার লিখেছেন রকিব হোসেন।
নারী শব্দটি উচ্চারণ করতেই আমরা সবাই নাড়ির টান অনুভব করি। নারী মানে একজন মা, কন্যা, বোন আরো অনেক সম্পর্কের বন্ধন। আর এই সম্পর্কের মাঝে আছে অনেক মধুরতা, আবেগের মাখামাখি আরো আছে আনন্দ, সুখের অনেক কাব্য। এক সময় নারী অভিধানে অবহেলিত, অসহায়ত্ব এই শব্দগুলো খুব মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেও এখন আর সেখানে এই শব্দগুলো খুব দুর্বল চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশের নারীরাও নিজেদের সাফল্যের গল্প রচনা করেছেন অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে। তেমনি আমাদের শোবিজ জগতের নারীদের সাফল্য গাঁথাও চোখে পড়ে বড় করে। এই জগতের বাসিন্দাদের অনেকেই আজ নিজের কর্ম দিয়ে নতুন প্রজন্মের মাঝে আদর্শ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের মিডিয়ায় আলোচিত নারীদের মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় খ্যাতিমান চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও পরিচালক কবরী’র কথা। বরেণ্য পরিচালক সুভাষ দত্তের হাত ধরে ১৯৬৪ সালে চলচ্চিত্রে আসেন মিষ্টি মেয়ে কবরী। প্রথম ছবি ‘সুতরাংম্বএ তার অভিনয় দর্শক মনে আলোড়ন তোলে। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু সাফল্যের সঙ্গে সামনে এগিয়েছেন তিনি। এক সময় নায়ক রাজ-রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি হয়ে কাজ করে তিনি তৈরি করেছেন সাফল্যের নতুন এক ইতিহাস। শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তার উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে- ময়নামতি, বধূ বিদায়, কখগঘঙ, অধিকার, সারেং বৌ, দ্বীপ নেভে নাই, আবির্ভাব, দুই জীবন, অনির্বাণ, স্মৃতিটুকু থাক, সুজন সখি। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র আয়না একটি বিশেষ শ্রেণীর দর্শকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। চলচ্চিত্র এবং টিভি নাটক দুই মাধ্যমেই তিনি কাজ করছেন সাফল্যের সাথে। অবশেষে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাফল্যকে মুঠোবন্দী করেছেন তিনি।

আমরা সত্যিই মানবকল্যাণে এমন একটি কাজ করছি, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী


undefined
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালমানের ‘খান একাডেমি’ পেয়েছে ‘গুগুল’-এর ২০ লাখ ডলার মূল্যমানের পুরস্কার। এক লাখ চুয়ান্ন হাজার প্রকল্পের মধ্য থেকে শিক্ষা বিভাগে সেরা নির্বাচিত হয়েছে খান একাডেমির বিনা মূল্যে শিক্ষামূলক অনলাইন ভিডিও টিউটরিয়াল। এই অর্জনের খবর পেয়ে আমরা ‘স্বপ্ন নিয়ে’র পক্ষ থেকে সালমানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ৩ অক্টোবর সালমান ই-মেইলে জানান তাঁর স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা।
২০ লাখ ডলারের পুরস্কার পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। খান একাডেমি এত দিন স্বল্প পুঁজি নিয়ে কাজ করছিল, এই পুরস্কার আমাদের সামনের ধাপে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। এত এত যোগ্য ও ভালো প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে খান একাডেমিকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, আমরা সত্যিই মানবকল্যাণে এমন একটি কাজ করছি, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এক মাসে আমাদের পোর্টালে পাঁচ লাখ ব্যবহারকারী নিবন্ধন করেছে এবং এখানে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ বার ভিডিও দেখা হয়েছে, যার পেছনে মোটামুটি আমার নিজের শ্রম ছাড়া তেমন কোনো ব্যয়ও হয়নি। এখন আমরা কিছু পেশাদার প্রকৌশলী নিয়োগ দিতে পারব, তখন বিশ্বের শীর্ষ ভাষাগুলোয় এ তথ্য অনুবাদ করা সম্ভব হবে।

স্বপ্নচূড়ায় সালমান


undefined
ছোট্ট একটা ঘর। দেয়ালগুলো ছাওয়া হালকা সবুজ রঙে। বইপত্রে ঠাসা পুরো জায়গাটা। একটা টেবিল, কাঠের গদিওয়ালা চেয়ার, প্রিন্টার আর কম্পিউটার—ঘরের আসবাব বলতে এগুলোই। এখানেই দিনমান কাজ করে যান টগবগে যুবক সালমান খান। অনেক দায়িত্ব তাঁর। বুক ভরা অনেক অনেক স্বপ্ন। প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য নির্ভর করে তাঁর ওপর। সংখ্যাটা কোটিতে নিয়ে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। লাখো অভিভাবকের আশীর্বাদ আছে সঙ্গে। কাজে গাফিলতি করার উপায় নেই তাই একদমই। ভোর হলেই জানালার কাচ ভেদ করে হুড়মুড়িয়ে আলো ঢোকে তাঁর ঘরে। ঘুমে ঢুলুঢুলু। সামান্য কিছু মুখে দিয়েই নিজের চেয়ারটাতে বসে যান তখন সালমান। মনিটরে চোখ রেখে ভাবতে থাকেন শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো নিয়ে। একটানা চলে কাজ। গণিত ও বিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানের জন্য ইউটিউবে এক হাজার ৬৩০টি ভিডিও দিয়েছেন সালমান। প্রতিদিন কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থীরা প্রায় সত্তর হাজারবার সাহায্য নেয় এ ভিডিওগুলো থেকে। আনন্দদায়ক এক পদ্ধতিতে গণিত ও বিজ্ঞানের নিরস বিষয়গুলো আয়ত্ত করে নেয় সবাই। অল্প সময়ের ভেতর এত শিক্ষার্থীকে সহজ পদ্ধতিতে শিক্ষা দিতে পেরে আনন্দে ভরে যায় মন। সালমানের আনন্দে খুশি হন তাঁর স্ত্রী উমাইয়া মারভিও। চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় স্বামীর ওপর যে অভিমানটা ছিল এত দিন, উবে যায় তা নিমেষেই।

সময়টা আনন্দে কাটাও


undefined
তোমরা তো অনেক দিন খুব কঠিনভাবে পড়াশোনা করেছ। পরীক্ষার শেষে ফল বেরিয়েছে। এখন মুক্তির নিঃশ্বাস। এখন মনের আনন্দ নিয়ে তোমরা করে যাও, যা তোমাদের খুশি। আজকাল পড়াশোনা সত্যি সত্যি খুব কঠিন হয়ে গেছে। শিশুদের ওপর পড়াশোনার অমানবিক চাপ যেটা দেওয়া হয়, সেটার সঙ্গে আমি একেবারেই একমত নই। কোনো উন্নত দেশে শিশুদের ওপর পড়ালেখার এত চাপ দেওয়া হয় না। তাদের ওপর স্কুলের চাপ, পরিবারের চাপ এত বেশি যে আজকাল কিশোর-কিশোরীরা তাদের শৈশবটাকে প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। আনন্দের, স্বপ্নের, অবকাশের মুহূর্তগুলো তাদের হাত এড়িয়ে পালিয়ে যায়।
আমরা তো এই সময়টা দারুণভাবে উপভোগ করতাম। তোমরাও করো। এই সময়ে তোমরা ঘুরবে। খেলবে। প্রাণভরে জীবনের আনন্দ লুটে নেবে। অভিভাবকদের বলব, তাঁরা যেন সন্তানদের বেড়ানোর সুযোগ করে দেন। ঘরের বাইরে বেরোলে, অবকাশ পেলে সবার মধ্যে নতুন নতুন আইডিয়া আসে। সেই অবকাশ তোমাদের চাই। এখন তোমরা সময় পেয়েছ। এই সময়টাকে যতটা বেশি পারো, অবকাশ ও আনন্দের জিনিস দিয়ে ভরে ফেলো। তোমাদের যা নিয়ে আনন্দ করার ইচ্ছে করে, তাই করো। তবে তা যেন ভালো আনন্দ হয়, স্বাস্থ্যকর আনন্দ হয়, মনের বিকাশের অনুকূল হয়।

মুসা তার স্বপ্ন পূরণ করেছে


undefined
২০০৬ সালের শুরু তখন। মুসা ইব্রাহীম সবেমাত্র নেপালের একটি পর্বতারোহণ করে এসেছে। তখন তার সঙ্গে আমার টুকটাক কথাবার্তা হয়। একদিন পর্বতে ওঠার নানারকম ছবি দেখাল। ছবি দেখতে দেখতে কথা হচ্ছিল। তখনই দেখেছি ওর অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে পাহাড় আর এভারেস্ট।
ওর স্বপ্ন ছিল এভারেস্ট জয় করার। নিজের স্বপ্ন সে পূরণ করবেই। ফেসবুকে ও লিখেছে, ‘আমি যদি লক্ষ্য স্থির করি যে কিছু একটা করব, মনে রেখো, আমি সেটা যেকোনো উপায়েই করে ছাড়ব।’ ফেসবুকে নিজের সম্পর্কে যা বলেছে, ও তো তাই-ই। পাহাড়ের টানেই পেশাজীবনকেও সে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এমন কোনো পেশায় জড়ায়নি, যাতে ওর পাহাড়ে যেতে অসুবিধা হয়।
নর্থ আলপাইন ক্লাব গঠন করল। ঘোষণা দিল ‘ভিশন ২০১০: মিশন এভারেস্ট’। অন্নপূর্ণা-৪ জয়ের পর ওর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রবলভাবে শুরু হলো এভারেস্টে যাওয়ার প্রস্তুতি। মার্চের শেষের দিকে একবার ঢাকায় গিয়ে দেখলাম, মুসার মুখ একেবারে কালো। টাকার সংস্থান হচ্ছে না। যাওয়া হবে কি না, তা অনিশ্চিত। ময়মনসিংহ ফিরে আসার পর ৪ এপ্রিল ও জানাল, ‘চলে আসো। বৃহস্পতিবার যাচ্ছি।’

একটা সাগর কীভাবে হারিয়ে ফেললাম!


undefined
দলপতির আশকারা পেয়েই দলছুট হওয়ার সাহসটা পেয়েছিলাম; বুঝতে পারিনি যে পরিণতি মোটেই সুখকর হবে না। এখন উপকূলটা কোন দিকে, সেটাই আমি ঠাহর করতে পারছি নে। দল ছেড়ে দক্ষিণমুখো হওয়ার সময় মনে হয়েছিল, ম্যাকারনির বাসা দেখে ফিরতি পথে এই ছোট পাহাড়টা ডিঙিয়ে গেলেই উপকূলের নাগাল পাব, তারপর সৈকত ধরে আধাঘণ্টা জোর-কদম হাঁটলে মূল দলকে ধরে ফেলতে পারব। ম্যাকারনির ছবি তুলে বাঁয়ের পাহাড় ছাড়িয়ে আরও দুটো পাহাড় পার হয়েছি; এখন দেখি চারদিকে বরফঢাকা পাহাড় আর পাহাড়, সৈকতের কোনো চিহ্ন নেই। ম্যাকারনির খোঁজে ‘ব্রাউন ব্লাফ’ উপকূল থেকে দক্ষিণে বড়জোর এক কিলোমিটার দূরে গেছি; এখন ফিরতি পথে প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর পানি তো নজরে আসেই নি, ঢেউয়ের শব্দও কানে আসছে না। দলছুট হয়ে দেড় ঘণ্টার মধ্যে একটা আস্ত সাগর আমি কীভাবে হারিয়ে ফেললাম বুঝি নে!
ঘণ্টা দুই আগে আমরা একটা সাদামাটা হিমবাহের শিখরে উঠেছিলাম; সবাই আগ্রহ নিয়ে আজ ট্র্যাকিংয়ে এসেছে হিমবাহ পার হয়ে একটা ফিয়র্ড দেখা আর ১০ হাজার জেন্টু পেঙ্গুইনের বিশাল এক কলোনির ছবি তোলার জন্য। হিমবাহ থেকে নেমে সবাই বাঁয়ে মোড় নিয়ে ফিয়র্ড দেখতে যাবে, তারপর সৈকত ধরে ট্র্যাকিং করবে জাহাজের দেখা না পাওয়া পর্যন্ত। হিমবাহ থেকে নেমে আর সবার মতো উত্তরমুখো না হয়ে দক্ষিণে এগিয়ে গেলে ১৫ মিনিট পর একডজন ম্যাকারনি পেঙ্গুইনের একটা খুদে কলোনি দেখা সম্ভব—এই সংবাদটা গোপনে আমাকে দিয়েছিল ল্যারি হব্স। ল্যারি আমাদের

‘আর এগিয়েছ কি মরেছ’


undefined
‘এই, হ্যালো, পিছে হটো, পিছে হটো, আর এগিয়েছ কি মরেছ।’ সাহেবি ভদ্রতার ধার না ধেরে অভিযাত্রীদের কানে তালা লাগিয়ে চিৎকার করে দলপতি বলল, ‘শিগগির পিছে আসো, পিছে চলে আসো, ওভার-হ্যাং ভেঙে পড়বে।’ আমার উদ্দেশেই এত সব চেঁচামেচি, আমিই ফালমারের ফটো তোলার জন্য দলছুট হয়ে হিমবাহের প্রান্তে চলে এসেছি। আর সব অভিযাত্রী লাঞ্চ-প্যাকেট নিয়ে দলপতির পাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছেন। সকালে লঙ্গিয়ার্বেনের উষ্ণ আস্তানা ছেড়ে অন্তহীন হিমবাহে নেমে টানা চার ঘণ্টা আইস-স্কুটার হাঁকিয়ে সবাই ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, স্তিমিত; ইতিউতি তাকানোর উৎসাহ নেই কারও, শুধু এই রাইফেলধারী হামবড়া দলপতিটা ছাড়া।
আমারও উৎসাহ ছিল না হিমবাহের কার্নিশে ঝুল-বারান্দার মতো লটকে থাকা জমাট বরফের ওভার-হ্যাং কত ভর নিতে পারে, তা পরখ করার। চার ঘণ্টা আইস-স্কুটারের ক্লাচ ধরে রাখার পর লাঞ্চের ঠোঙা ছেঁড়ার জোরটুকুও ছিল না আঙুলে। আমরা বারেন্টস আর গ্রিনল্যান্ড সাগরের উত্তরে চির-শুভ্র দ্বীপপুঞ্জ সভালবার্ডের হিমবাহ পার হচ্ছি। এপ্রিলের ১১ তারিখ, এখন এখানে ২৪ ঘণ্টা দিনের আলো। বরফ-ঢাকা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার জন্য আইস-স্কুটার অসাধারণ এক বাহন; কিন্তু মুশকিল হলো, সারাক্ষণ এর ক্লাচ চেপে ধরে রাখতে হয়, ক্লাচ ছাড়লেই চলা বন্ধ। যাত্রী পড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ স্কুটার নিশ্চল করার জন্যই এ ব্যবস্থা। ক্লাচ ধরার সহজ কাজটুকু এ মহা হিমের জগতে যে কী এক জ্বালাতন, তা দুই হাতের শীতল ও অচল পেশিগুলো প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছিল। তাই একটু শ্যাডো-বক্সিং করে জমাট পেশি সচল করার মতলবে দল থেকে সরে হিমবাহের কার্নিশের দিকে হাঁটা দিয়েছিলাম।

Saturday, June 11, 2011

‘মুসাআআআ! রোপ ধরে ওঠো’


undefined
স্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
‘প্রথম বা দ্বিতীয় বলে কোনো কথা এখানে নেই। এটা এভারেস্ট। এতে আরোহণ করতে হয় ধীরে ধীরে এবং নিজের গতিতে।’ ২৩ জুন দিবাগত রাত ১২টার পর যখন আকাশে চাঁদ ঝলমলিয়ে উঠল, সেই প্রায় সাড়ে আট হাজার মিটার উচ্চতায় তেনজিং নোরগের এ কথা মনে পড়ছিল বারবার। বাংলাদেশ থেকে এভারেস্টে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, দেশের লাল-সবুজ পতাকা এভারেস্টের চূড়ায় ওড়াতে হবে—ক্লাবের সেই অভিযানের সহযোদ্ধাদের কথা ভাবছিলাম। রিমি-রাইদের কথাও ঝিলিক দিয়ে মনে উদয় হচ্ছিল। ক্ষুদ্র পরিসরটা নিজের, কিন্তু এর সার্বিক অর্জন তো দেশের। দেশের জন্যই তো এ অভিযান। আরেকটা নতুন অভ্যুদয়। আরেকটা নতুন সূচনা এবং নিজের ক্ষেত্রে তা পুনর্জন্মের প্রসবপর্ব। সবই ছিল অনুপ্রেরণার বিষয়বস্তু। সুতরাং ২০১০ সালে এভারেস্ট অভিযানে যাত্রাটা সবার জন্য ছিল অবশ্যম্ভাবী। এক ধরনের প্রতিযোগিতাও। তবে তেনজিং নোরগে মননে, আরোহণে সঙ্গেই ছিলেন প্রেরণাদাতা হিসেবে। এভারেস্টের বেস ক্যাম্প ও অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে তার ম্যান অব এভারেস্ট: অটোবায়োগ্রাফি অব তেনজিং নোরগে বইটি পড়ে এভাবেই শিহরিত হয়েছিলাম বারবার। আর ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, ২৩ জুন ছিল সেই অভিযানের ৪৬তম দিন। বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর হিসাবে (১৪ এপ্রিল) তা ছিল ৪০তম দিন এবং প্রতিটি দিন ছিল নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার দিন। ‘আমিও পারি’ কথাটি প্রমাণ করার দিন।

এভারেস্ট জয়ের সেই সকালটি


undefined
স্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ
থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
কৈলাসের কথা শুনে গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে। সেই রক ফেসের ডান দিয়ে সরু একটা খাঁজ। তার ওপর ক্র্যাম্পন ঠেকিয়ে কোনোমতে পার হচ্ছি। এ পর্যায়ে এভারেস্টজয়ী ফিরতি দলের সঙ্গে একের পর এক সাক্ষাৎ হচ্ছে। তাদের যে অভিনন্দন জানাব, মনের সেই অবস্থাও নেই। সেই রাত আটটায় শুরু হয়েছিল ক্লাইম্বিং, এখন প্রায় ভোর। এর মধ্যে কোনো খাওয়া-দাওয়া নেই, পানিও খাওয়া হয়নি। তার পরও শরীরের শক্তির শেষবিন্দু ঠেলে দিচ্ছি পাহাড়ে ওঠার দিকে। মনের তাড়না ও জেদের প্রায় পুরো অংশ ব্যয় করছি। শুধুই ভাবছি—বিশ্বের কোনো একজন মানুষ এ কাজ পারলে তা আমিও পারব। এই ভেবে নিজেকে চাঙা রাখছি।
শেষ দিকে প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাড়া একটা ঢাল পেরোতেই চোখে পড়ল এভারেস্টের চূড়া। আমি আনন্দে আত্মহারা। সেটা মনের মধ্যে চেপে ধরে এগোতে শুরু করলাম।
এবার হেডল্যাম্প পুরোপুরি বেঁকে বসেছে। কোনো আলোই বেরোচ্ছে না হেডল্যাম্প থেকে। ভাবলাম—তাহলে এগোচ্ছি কী করে? পূর্ব দিগন্তে চোখ ফেরাতেই দেখি আকাশ ফরসা হয়ে আসছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সেই আলোতেই যতটুকু পথ দেখা যায়, মনের অজান্তে তাকেই ভরসা ধরে নিচ্ছি। যাক, বাঁচা গেল তাহলে, নামার সময় তাহলে আর সমস্যা হবে না—মনে মনে ভাবছি।
আর মাত্র ৫০ মিটার ঢাল। পুরোটাই বরফ। দেখলাম, চূড়ার কাছে আরোহীদের লম্বা সারি। সামিট লাইন। সেই ঢাল পার হচ্ছি। আর মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছি। পাঁচ মিনিট, ছয়—সাত—আট—নয় মিনিটের মাথায় গিয়ে পৌঁছালাম এভারেস্টের চূড়ায়। লক্ষ্য পূরণ হলো। চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে। চিৎকার করে বলতে মন চাইছে, ‘আআআমিইই পেরেছিইইই। বিশ্বের দম্ভ, সর্বোচ্চ চূড়া এখন বাংলাদেশের পায়ের নিচে। এক বাংলাদেশির কাছে এভারেস্ট হার মেনেছে।’ সাফল্য লাভের পর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে এও প্রার্থনা করছি, যেন নিরাপদে নামতে পারি।

‘এভারেস্টের চূড়া দেখতে পাবে’


undefinedস্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
প্রথম পর্বের পর
কৈলাসের কথা শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। কান গরম হয়ে উঠল। আবারও জেদ চেপে গেল। দাঁতে দাঁত কামড়ে আগুন চোখে কৈলাসের দিকে তাকালাম। এরপর ঘাড় ফেরালাম আরও ডানে। এবার চার-পাঁচটা পুরোনো রোপ দৃষ্টিসীমায় এল। সেটা কিছুটা ডানে সরে গিয়ে পাকড়ালাম এবং আগের মতো বাঁ হাতে জুমার ঠেলে এবং ডান হাতে রোপ আঁকড়ে ধরে সেই ওভারহ্যাং ট্র্যাভার্স করতে শুরু করলাম।
বিধি বাম। ২০ সেকেন্ডের চেষ্টায় সেই ওভারহ্যাং পাশ কাটালাম ঠিকই। পিঠে ব্যাগপ্যাকের ভেতর অক্সিজেন বোতল রেখে রেগুলেটরটা বাইরে রেখেছিলাম, যাতে সহজেই বোতলে অক্সিজেনের পরিমাণ এবং অক্সিজেন প্রবাহ পরীক্ষা করা যায়। সেই রেগুলেটরের সঙ্গে যুক্ত রাবার পাইপ, যা বোতল থেকে অক্সিজেন মাস্কে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যায়—ঠিক ওপরের দিকে ফুটো হয়ে গেল ওভারহ্যাং রক ফেসে ঘষা খেয়ে। শশশশশশ। একটানা শব্দ হচ্ছে। অক্সিজেন বের হয়ে যাচ্ছে ফুটো পাইপ দিয়ে, ফুসফুসে যাচ্ছে শুধু সাধারণ বাতাস। যাতে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ৩৩ শতাংশ।
এতক্ষণ জীবন বাজি রেখে সেই ওভারহ্যাং পার হয়ে এলাম ঠিকই। কিন্তু বুক দ্বিগুণ বেগে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আর পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ায় সেই হাপর মনে হলো এখনি ফেটে যাবে—ভেতরে বাতাস নেই ঠিকই, কিন্তু বাইরের বাতাসের চাপে। বাতাস নাক-মুখ দিয়ে ফুসফুসে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকায় মনে হলো মরে যাচ্ছি। সেই রক ফেসের ওপর দুই হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাস্কের ভেতর মুখ হাঁ করে অক্সিজেন পাওয়ার চেষ্টা করছি। পারছি না, পারছি না। মরে যাচ্ছি, আর মনে হয় হলো না।

রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে স্লেজে ফিরে গেলাম


undefined
‘হাসকিদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ো, এর মুখ থেকে ওকে ছাড়িয়ে নাও, রক্ত দেখে ভয় পেয়ো না, হাত লাগাও, হার্নেস ধরে টান মারো, একে সরাও, ধরো ওটাকে।’ দলনেতা রবার্ট উন্মত্ত কুকুরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে পাগলের মতো চিৎকার করে আমার উদ্দেশে এসব কথা বলল। আমাদের দুই স্লেজের কুকুর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ১২টি হাসকির গর্জনে কানে তালা লাগছে, মুলার মতো দাঁত ঢুকে যাচ্ছে কারও পেটে-পিঠে। পায়ের তলায় হিমবাহের সাদা জমি কুকুরের রক্তে লাল। রবার্ট যতই চেঁচাক, এক ডজন সংগ্রামী হাসকির মাঝে সশরীরে দাঁড়ানো কি সোজা কথা! কিন্তু আমারই ‘পদস্খলনে’ শুরু হয়েছে এ হাসকি-লড়াই, এখন খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে তো থাকতে পারি না। বিকশিত দাঁতের বীভৎস সারি অগ্রাহ্য করে ভূলুণ্ঠিত একটা হাসকিকে টেনে সরালাম। অমনি তার ক্ষিপ্ত প্রতিপক্ষ ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। তার ভারে আমি ধরাশায়ী হলাম। চরকির মতো চার হাত-পা চালিয়ে রবার্ট দুই দল হাসকির মধ্যে কোনোমতে এক যুদ্ধবিরতি রেখা কায়েম করল। সেই নো-ডগ্স-ল্যান্ডে আমি রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে বসে রইলাম।

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons