Total Pageviews

Showing posts with label Fighter. Show all posts
Showing posts with label Fighter. Show all posts

Sunday, June 12, 2011

মুসা তার স্বপ্ন পূরণ করেছে


undefined
২০০৬ সালের শুরু তখন। মুসা ইব্রাহীম সবেমাত্র নেপালের একটি পর্বতারোহণ করে এসেছে। তখন তার সঙ্গে আমার টুকটাক কথাবার্তা হয়। একদিন পর্বতে ওঠার নানারকম ছবি দেখাল। ছবি দেখতে দেখতে কথা হচ্ছিল। তখনই দেখেছি ওর অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে পাহাড় আর এভারেস্ট।
ওর স্বপ্ন ছিল এভারেস্ট জয় করার। নিজের স্বপ্ন সে পূরণ করবেই। ফেসবুকে ও লিখেছে, ‘আমি যদি লক্ষ্য স্থির করি যে কিছু একটা করব, মনে রেখো, আমি সেটা যেকোনো উপায়েই করে ছাড়ব।’ ফেসবুকে নিজের সম্পর্কে যা বলেছে, ও তো তাই-ই। পাহাড়ের টানেই পেশাজীবনকেও সে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এমন কোনো পেশায় জড়ায়নি, যাতে ওর পাহাড়ে যেতে অসুবিধা হয়।
নর্থ আলপাইন ক্লাব গঠন করল। ঘোষণা দিল ‘ভিশন ২০১০: মিশন এভারেস্ট’। অন্নপূর্ণা-৪ জয়ের পর ওর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রবলভাবে শুরু হলো এভারেস্টে যাওয়ার প্রস্তুতি। মার্চের শেষের দিকে একবার ঢাকায় গিয়ে দেখলাম, মুসার মুখ একেবারে কালো। টাকার সংস্থান হচ্ছে না। যাওয়া হবে কি না, তা অনিশ্চিত। ময়মনসিংহ ফিরে আসার পর ৪ এপ্রিল ও জানাল, ‘চলে আসো। বৃহস্পতিবার যাচ্ছি।’

একটা সাগর কীভাবে হারিয়ে ফেললাম!


undefined
দলপতির আশকারা পেয়েই দলছুট হওয়ার সাহসটা পেয়েছিলাম; বুঝতে পারিনি যে পরিণতি মোটেই সুখকর হবে না। এখন উপকূলটা কোন দিকে, সেটাই আমি ঠাহর করতে পারছি নে। দল ছেড়ে দক্ষিণমুখো হওয়ার সময় মনে হয়েছিল, ম্যাকারনির বাসা দেখে ফিরতি পথে এই ছোট পাহাড়টা ডিঙিয়ে গেলেই উপকূলের নাগাল পাব, তারপর সৈকত ধরে আধাঘণ্টা জোর-কদম হাঁটলে মূল দলকে ধরে ফেলতে পারব। ম্যাকারনির ছবি তুলে বাঁয়ের পাহাড় ছাড়িয়ে আরও দুটো পাহাড় পার হয়েছি; এখন দেখি চারদিকে বরফঢাকা পাহাড় আর পাহাড়, সৈকতের কোনো চিহ্ন নেই। ম্যাকারনির খোঁজে ‘ব্রাউন ব্লাফ’ উপকূল থেকে দক্ষিণে বড়জোর এক কিলোমিটার দূরে গেছি; এখন ফিরতি পথে প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর পানি তো নজরে আসেই নি, ঢেউয়ের শব্দও কানে আসছে না। দলছুট হয়ে দেড় ঘণ্টার মধ্যে একটা আস্ত সাগর আমি কীভাবে হারিয়ে ফেললাম বুঝি নে!
ঘণ্টা দুই আগে আমরা একটা সাদামাটা হিমবাহের শিখরে উঠেছিলাম; সবাই আগ্রহ নিয়ে আজ ট্র্যাকিংয়ে এসেছে হিমবাহ পার হয়ে একটা ফিয়র্ড দেখা আর ১০ হাজার জেন্টু পেঙ্গুইনের বিশাল এক কলোনির ছবি তোলার জন্য। হিমবাহ থেকে নেমে সবাই বাঁয়ে মোড় নিয়ে ফিয়র্ড দেখতে যাবে, তারপর সৈকত ধরে ট্র্যাকিং করবে জাহাজের দেখা না পাওয়া পর্যন্ত। হিমবাহ থেকে নেমে আর সবার মতো উত্তরমুখো না হয়ে দক্ষিণে এগিয়ে গেলে ১৫ মিনিট পর একডজন ম্যাকারনি পেঙ্গুইনের একটা খুদে কলোনি দেখা সম্ভব—এই সংবাদটা গোপনে আমাকে দিয়েছিল ল্যারি হব্স। ল্যারি আমাদের

‘আর এগিয়েছ কি মরেছ’


undefined
‘এই, হ্যালো, পিছে হটো, পিছে হটো, আর এগিয়েছ কি মরেছ।’ সাহেবি ভদ্রতার ধার না ধেরে অভিযাত্রীদের কানে তালা লাগিয়ে চিৎকার করে দলপতি বলল, ‘শিগগির পিছে আসো, পিছে চলে আসো, ওভার-হ্যাং ভেঙে পড়বে।’ আমার উদ্দেশেই এত সব চেঁচামেচি, আমিই ফালমারের ফটো তোলার জন্য দলছুট হয়ে হিমবাহের প্রান্তে চলে এসেছি। আর সব অভিযাত্রী লাঞ্চ-প্যাকেট নিয়ে দলপতির পাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছেন। সকালে লঙ্গিয়ার্বেনের উষ্ণ আস্তানা ছেড়ে অন্তহীন হিমবাহে নেমে টানা চার ঘণ্টা আইস-স্কুটার হাঁকিয়ে সবাই ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, স্তিমিত; ইতিউতি তাকানোর উৎসাহ নেই কারও, শুধু এই রাইফেলধারী হামবড়া দলপতিটা ছাড়া।
আমারও উৎসাহ ছিল না হিমবাহের কার্নিশে ঝুল-বারান্দার মতো লটকে থাকা জমাট বরফের ওভার-হ্যাং কত ভর নিতে পারে, তা পরখ করার। চার ঘণ্টা আইস-স্কুটারের ক্লাচ ধরে রাখার পর লাঞ্চের ঠোঙা ছেঁড়ার জোরটুকুও ছিল না আঙুলে। আমরা বারেন্টস আর গ্রিনল্যান্ড সাগরের উত্তরে চির-শুভ্র দ্বীপপুঞ্জ সভালবার্ডের হিমবাহ পার হচ্ছি। এপ্রিলের ১১ তারিখ, এখন এখানে ২৪ ঘণ্টা দিনের আলো। বরফ-ঢাকা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার জন্য আইস-স্কুটার অসাধারণ এক বাহন; কিন্তু মুশকিল হলো, সারাক্ষণ এর ক্লাচ চেপে ধরে রাখতে হয়, ক্লাচ ছাড়লেই চলা বন্ধ। যাত্রী পড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ স্কুটার নিশ্চল করার জন্যই এ ব্যবস্থা। ক্লাচ ধরার সহজ কাজটুকু এ মহা হিমের জগতে যে কী এক জ্বালাতন, তা দুই হাতের শীতল ও অচল পেশিগুলো প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছিল। তাই একটু শ্যাডো-বক্সিং করে জমাট পেশি সচল করার মতলবে দল থেকে সরে হিমবাহের কার্নিশের দিকে হাঁটা দিয়েছিলাম।

Saturday, June 11, 2011

এভারেস্ট জয়ের সেই সকালটি


undefined
স্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ
থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
কৈলাসের কথা শুনে গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে। সেই রক ফেসের ডান দিয়ে সরু একটা খাঁজ। তার ওপর ক্র্যাম্পন ঠেকিয়ে কোনোমতে পার হচ্ছি। এ পর্যায়ে এভারেস্টজয়ী ফিরতি দলের সঙ্গে একের পর এক সাক্ষাৎ হচ্ছে। তাদের যে অভিনন্দন জানাব, মনের সেই অবস্থাও নেই। সেই রাত আটটায় শুরু হয়েছিল ক্লাইম্বিং, এখন প্রায় ভোর। এর মধ্যে কোনো খাওয়া-দাওয়া নেই, পানিও খাওয়া হয়নি। তার পরও শরীরের শক্তির শেষবিন্দু ঠেলে দিচ্ছি পাহাড়ে ওঠার দিকে। মনের তাড়না ও জেদের প্রায় পুরো অংশ ব্যয় করছি। শুধুই ভাবছি—বিশ্বের কোনো একজন মানুষ এ কাজ পারলে তা আমিও পারব। এই ভেবে নিজেকে চাঙা রাখছি।
শেষ দিকে প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাড়া একটা ঢাল পেরোতেই চোখে পড়ল এভারেস্টের চূড়া। আমি আনন্দে আত্মহারা। সেটা মনের মধ্যে চেপে ধরে এগোতে শুরু করলাম।
এবার হেডল্যাম্প পুরোপুরি বেঁকে বসেছে। কোনো আলোই বেরোচ্ছে না হেডল্যাম্প থেকে। ভাবলাম—তাহলে এগোচ্ছি কী করে? পূর্ব দিগন্তে চোখ ফেরাতেই দেখি আকাশ ফরসা হয়ে আসছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সেই আলোতেই যতটুকু পথ দেখা যায়, মনের অজান্তে তাকেই ভরসা ধরে নিচ্ছি। যাক, বাঁচা গেল তাহলে, নামার সময় তাহলে আর সমস্যা হবে না—মনে মনে ভাবছি।
আর মাত্র ৫০ মিটার ঢাল। পুরোটাই বরফ। দেখলাম, চূড়ার কাছে আরোহীদের লম্বা সারি। সামিট লাইন। সেই ঢাল পার হচ্ছি। আর মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছি। পাঁচ মিনিট, ছয়—সাত—আট—নয় মিনিটের মাথায় গিয়ে পৌঁছালাম এভারেস্টের চূড়ায়। লক্ষ্য পূরণ হলো। চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে। চিৎকার করে বলতে মন চাইছে, ‘আআআমিইই পেরেছিইইই। বিশ্বের দম্ভ, সর্বোচ্চ চূড়া এখন বাংলাদেশের পায়ের নিচে। এক বাংলাদেশির কাছে এভারেস্ট হার মেনেছে।’ সাফল্য লাভের পর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে এও প্রার্থনা করছি, যেন নিরাপদে নামতে পারি।

‘এভারেস্টের চূড়া দেখতে পাবে’


undefinedস্বপ্ন নিয়ে পাতায় এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে লিখছেন মুসা ইব্রাহীম। আসুন, তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই দুঃসাহসিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
প্রথম পর্বের পর
কৈলাসের কথা শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। কান গরম হয়ে উঠল। আবারও জেদ চেপে গেল। দাঁতে দাঁত কামড়ে আগুন চোখে কৈলাসের দিকে তাকালাম। এরপর ঘাড় ফেরালাম আরও ডানে। এবার চার-পাঁচটা পুরোনো রোপ দৃষ্টিসীমায় এল। সেটা কিছুটা ডানে সরে গিয়ে পাকড়ালাম এবং আগের মতো বাঁ হাতে জুমার ঠেলে এবং ডান হাতে রোপ আঁকড়ে ধরে সেই ওভারহ্যাং ট্র্যাভার্স করতে শুরু করলাম।
বিধি বাম। ২০ সেকেন্ডের চেষ্টায় সেই ওভারহ্যাং পাশ কাটালাম ঠিকই। পিঠে ব্যাগপ্যাকের ভেতর অক্সিজেন বোতল রেখে রেগুলেটরটা বাইরে রেখেছিলাম, যাতে সহজেই বোতলে অক্সিজেনের পরিমাণ এবং অক্সিজেন প্রবাহ পরীক্ষা করা যায়। সেই রেগুলেটরের সঙ্গে যুক্ত রাবার পাইপ, যা বোতল থেকে অক্সিজেন মাস্কে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যায়—ঠিক ওপরের দিকে ফুটো হয়ে গেল ওভারহ্যাং রক ফেসে ঘষা খেয়ে। শশশশশশ। একটানা শব্দ হচ্ছে। অক্সিজেন বের হয়ে যাচ্ছে ফুটো পাইপ দিয়ে, ফুসফুসে যাচ্ছে শুধু সাধারণ বাতাস। যাতে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ৩৩ শতাংশ।
এতক্ষণ জীবন বাজি রেখে সেই ওভারহ্যাং পার হয়ে এলাম ঠিকই। কিন্তু বুক দ্বিগুণ বেগে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আর পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ায় সেই হাপর মনে হলো এখনি ফেটে যাবে—ভেতরে বাতাস নেই ঠিকই, কিন্তু বাইরের বাতাসের চাপে। বাতাস নাক-মুখ দিয়ে ফুসফুসে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকায় মনে হলো মরে যাচ্ছি। সেই রক ফেসের ওপর দুই হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাস্কের ভেতর মুখ হাঁ করে অক্সিজেন পাওয়ার চেষ্টা করছি। পারছি না, পারছি না। মরে যাচ্ছি, আর মনে হয় হলো না।

রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে স্লেজে ফিরে গেলাম


undefined
‘হাসকিদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ো, এর মুখ থেকে ওকে ছাড়িয়ে নাও, রক্ত দেখে ভয় পেয়ো না, হাত লাগাও, হার্নেস ধরে টান মারো, একে সরাও, ধরো ওটাকে।’ দলনেতা রবার্ট উন্মত্ত কুকুরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে পাগলের মতো চিৎকার করে আমার উদ্দেশে এসব কথা বলল। আমাদের দুই স্লেজের কুকুর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ১২টি হাসকির গর্জনে কানে তালা লাগছে, মুলার মতো দাঁত ঢুকে যাচ্ছে কারও পেটে-পিঠে। পায়ের তলায় হিমবাহের সাদা জমি কুকুরের রক্তে লাল। রবার্ট যতই চেঁচাক, এক ডজন সংগ্রামী হাসকির মাঝে সশরীরে দাঁড়ানো কি সোজা কথা! কিন্তু আমারই ‘পদস্খলনে’ শুরু হয়েছে এ হাসকি-লড়াই, এখন খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে তো থাকতে পারি না। বিকশিত দাঁতের বীভৎস সারি অগ্রাহ্য করে ভূলুণ্ঠিত একটা হাসকিকে টেনে সরালাম। অমনি তার ক্ষিপ্ত প্রতিপক্ষ ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। তার ভারে আমি ধরাশায়ী হলাম। চরকির মতো চার হাত-পা চালিয়ে রবার্ট দুই দল হাসকির মধ্যে কোনোমতে এক যুদ্ধবিরতি রেখা কায়েম করল। সেই নো-ডগ্স-ল্যান্ডে আমি রক্তাক্ত হাসকি কোলে নিয়ে বসে রইলাম।

আমার মাথায় চাটি মেরে দৈত্যটা উড়ে গেল….ইনাম আল হক


‘দৈত্য, দৈত্য—পেট্রেল আসছে, মাথায় ঘা মারবে, বসে পড়ো বোকারাম, বসে পড়ো।’ চিৎকার করে এসব নির্দেশ দিতে দিতে ব্রেন্ট হিউস্টন হঠাৎ বসে পড়ে উত্তর দিকে সেজদা দিল। নির্দেশগুলো আমার উদ্দেশেই ছিল, কিন্তু আমার মাথায় তখন কি আর কিছু ঢোকে! দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে সদ্য অ্যান্টার্কটিকায় পা ফেলেছি, তারপর ‘প্যারাডাইস বে’ বা স্বর্গোপকূলের পাথুরে দেয়ালে আরোহণ করে একেবারে ঘোরের মধ্যে আছি। সমুদ্রের গর্জন কমে এসেছে, সৈকতে আমাদের সহযাত্রীদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শত শত ‘অ্যাডেলি পেঙ্গুইন’। আজ শীতের তীব্রতা কমেছে, তাপমাত্রা বেড়ে শূন্য ডিগ্রিতে এসেছে, সারাক্ষণ ঝুরঝুর করে তুষার ঝরছে। পাহাড়ের ওপর ওড়াউড়ি করছে দক্ষিণ মহাসাগরের বিরল পাখি, দৈত্য-পেট্রেল ও খয়রা-স্কুয়া। কাছে গিয়ে এদের দেখার জন্য আমরা দুই পাখিপ্রেমী পাহাড়ে উঠেছি। আরোহণের শ্রমে শরীর গরম, মন আরও উষ্ণ। গায়ের প্রকাণ্ড লাল জ্যাকেট খুলে ফুরফুরে মনে আমি ব্রেন্টকে বললাম, ‘এ স্বর্গোপকূলে আমার একটা ছবি তুলে দাও।’

আশা পূর্ণ হলো প্রতারণা দ্বীপে


undefined
‘সুপ্রভাত, ঘণ্টাতিনেক পর আমরা ডিসেপশন আইল্যান্ডে পৌঁছে যাব। এ দ্বীপ দুনিয়ার মেলা নাবিককে ধোঁকা দিয়েছে, কিন্তু আজ তোমার প্রত্যাশাটা ঠিকই পূরণ করবে।’ এক বাটি গরম স্যুপ নিয়ে দোদুল্যমান টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতেই এ কথা বলে আমাকে স্বাগত জানাল ব্রেন্ট হিউস্টন। আমাদের জাহাজ তখন দক্ষিণ মহাসাগরে ভাসমান বরফের অন্তহীন জঙ্গলে গুটি গুটি এগিয়ে চলছে। গতকালও জাহাজটি খণ্ড বরফের এই কণ্টকশয্যা পার হয়েছে অক্ষত দেহে। তবে অভিযাত্রী সবাই অক্ষত থাকেননি। অনেকেই সমুদ্রপীড়ায় কুপোকাত হয়ে আজ ব্রেকফাস্টে গরহাজির। বাইরে ঝকঝকে রোদ। পানিতে ছোঁ মেরে মাছ শিকার করছে একটি অ্যালব্যাট্রস। আমি বললাম, ‘কথাটা মনে রেখো ব্রেন্ট, আমার আশা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু জাহাজে ফিরব না। তখন ক্যাপ্টেন ডেমেল যদি মাইকের আওয়াজ বাড়িয়ে জাহাজ কাঁপিয়ে অনুপস্থিত যাত্রীর মুণ্ডুপাত করে তো সব শেষ তোমার।’
ব্রেন্ট হিউস্টন আমেরিকার পাখিবিদ, গবেষণার কাজে তৃতীয়বারের মতো অ্যান্টার্কটিকা সফরে এসেছে। আমার প্রথম সফর। প্রতারণা দ্বীপে নাকের ডগায় স্কুয়া আর পিন্টাডো পেট্রেল বসে থাকে বলে গল্প শুনিয়ে সে আমার প্রত্যাশা তুঙ্গে তুলেছে। বইয়ে পড়েছি, শত বছর আগে দক্ষিণ মহাসাগরে পিন্টাডো পেট্রেল দেখে অভিযাত্রী দল বুঝতে পারত, তারা অ্যান্টার্কটিক উপকূলের কাছে এসে গেছে। পেট্রেল পাখির দল অ্যালব্যাট্রস, স্কুয়া আর পেঙ্গুইনের মতো মাসের পর মাস সমুদ্রে ভেসে থাকতে পারে না। রাতে তাদের মাটিতে ফিরতে হয়। সমুদ্রে তাদের উড়তে দেখলে বোঝা যায় ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোথাও মাটি আছে। ব্রেন্ট বলেছে, প্রতারণা দ্বীপে পেট্রেল আর স্কুয়া পাখির দল বাসা বাঁধে। আমি আশা করে আছি, কাছে গিয়ে সেসব দেখতে পাব।
প্রতারণা দ্বীপটি আসলে অ্যান্টার্কটিক উপকূলের এক অগ্নিগিরি। লাভা জমে সাগরের পানির ওপর মাথা তুলেছে বলেই একে দ্বীপ বলা হয়। অগ্নিগিরির জ্বালামুখের মধ্যেও আছে সমুদ্রের পানি। বাইরে থেকে শুধু লাভার পাহাড় মনে হলেও ভেতরে এর বিশাল নিস্তরঙ্গ হ্রদ—দুর্গম দক্ষিণ সাগরে এক বিরল পোতাশ্রয়। তবে জ্বালামুখের যে ফাটল দিয়ে এ হ্রদে জাহাজ ঢুকতে পারে বহুকাল সেটা অনাবিষ্কৃত ছিল। আবিষ্কারের পর মানুষ এর নাম দিয়েছে ‘প্রতারণা দ্বীপ’—যেন এ দ্বীপ আগে ইচ্ছে করে আশ্রয়সন্ধানী নাবিকদের প্রতারিত করেছে।
আমরা সবাই এখন প্রতারণা দ্বীপের দিকে চেয়ে আছি। ব্রেন্ট ও আমি পাখি দেখার জন্য, আর অন্য যাত্রীরা অগ্নিগিরির উত্তপ্ত হ্রদে নামতে উন্মুখ। উত্তেজনার শেষ নেই। দ্বীপের পাথুরে দেয়াল জাহাজের কাছে এসে গেলে সমুদ্রপীড়ায় কাবু অভিযাত্রীরাও মাথা খাড়া করল। ক্যাপ্টেন ডেমেল নিপুণ হাতে জাহাজ চালিয়ে দেয়ালের সুড়ঙ্গ দিয়ে আমাদের নিয়ে গেল অগ্নিগিরির ভেতরে। জাহাজ নোঙর ফেললে আমরা রবারের ডিঙিতে চড়ে ডাঙার দিকে রওনা হলাম। এক দশক আগে অগ্নিগিরির একটা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এখন সে ঘুমন্ত, চারদিক সুনসান, পানিতে বুদবুদ উঠছে, বাতাসে গন্ধকের গন্ধ।
ডাঙায় পা রেখে উত্ফুল্ল সহযাত্রীরা সমুদ্রস্নানে নেমে গেল। আমাদের প্রত্যাশা তখনো পূরণ হয়নি। চারদিকে স্কুয়া আর পিন্টাডো পেট্রেলের ওড়াউড়ি চলছে। লাভার ফাঁকে ফাঁকে তারা বাসা বেঁধেছে। আমরা পাহাড়ের দেয়াল বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। কাছ থেকে সাধ মিটিয়ে সব দেখতে চাই। অ্যান্টার্কটিকার প্রাণী নির্ভয়ে মানুষের কাছে আসে। তাদের উদ্বেগের কারণ না হয়েই অনেক কাছে যাওয়া গেল। তারপর তৃপ্তমনে আমরা অবতরণ শুরু করলাম।

‘তুষার-কবর’ থেকে বেরিয়ে এলাম


undefined
মাথা ঝাঁকিয়ে বরফ ঝেড়ে কুছ পরোয়া নেই ভঙিতে আমার গাইড বলল, ‘তুষার পড়লেই কি শেরপা থেমে যায়!’ কিছুক্ষণ ধরে তুষার ঝরছিল; এবার জোর বাতাস ছেড়েছে। তীরের মতো তুষারকণা এসে মুখে বিঁধছে। মাথার ওপর ছাতা ধরেও মুখ রক্ষা করা যাচ্ছে না, পালক-পোরা জ্যাকেটটি শুধু দেহ রক্ষা করে চলেছে। শেরপা গাইড ‘আঙ-কামি’ ছাতা আনেনি; ইমজােস ট্রেইলে অকাল তুষারপাতের কথাটা প্রস্তুতিপর্বে তার মনে ছিল না। ‘ছাতা ছাড়া তুমি এখন চলবে কী করে!’—এ কথা বলায় ঘাউড়ামি করে সে আরও জোরে পা চালাচ্ছে।
সাত দিন আগে লুকলা থেকে ইমজােস বেস-ক্যাম্পের উদ্দেশে আমাদের ট্রেকিং শুরু হয়েছে। মে মাসে অক্ষত দেহে এভারেস্ট বেস-ক্যাম্প ট্রেকিং শেষ করে স্ফীত আত্মবিশ্বাসে আমি ইমজােস অভিযান হাতে নিয়েছি। দুই বন্ধু আমার সঙ্গী হয়েছে; তাদের জীবনের প্রথম ট্রেকিং। এক-ট্রেকিং সিনিয়রিটি নিয়ে আমি তাদের ‘ওস্তাদ’ বনে গেছি। শুরু থেকেই অভিযানটির অবস্থা লেজেগোবরে; একটা না একটা অঘটন লেগেই আছে। প্রথম দিন পাঁচ কিলোমিটার পথ চলতে না চলতে এক বন্ধুর নতুন বুটজোড়ার সেলাই খুলে হা হয়ে গেল। মুখ ব্যাদান করা বুট দড়ি-দাড়া দিয়ে বেঁধে সে গুটি গুটি পায়ে ট্রেকিং করছে। তার সঙ্গে আমাদেরও শম্বুকগতি। দিন শেষ হলো, গন্তব্য এল না। বাধ্য হয়ে ‘ফাকডিং’-এর শেরপা-সরাইখানায় রাত কাটালাম; ‘জোরসালে’ যাওয়া হলো না। ভাগ্যক্রমে দুই দিন চলার মতো এক জোড়া পুরোনো জুতা মিলল সেখানে। জুতা আবিষ্কার করে বন্ধুবর চাঙা হলো; কিন্তু আমার দুশ্চিন্তা রয়েই গেল। যথাস্থানে যাত্রাবিরতি হয়নি বলে পরদিনের গন্তব্য ‘নামচে-বাজার’ পৌঁছাতে সকাল-সন্ধ্যা টানা হাঁটতে হবে; মাঝে রাত্রিবাসের স্থান নেই।

সফল জীবনের জন্য…….মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ্


মানবজাতির জীবন বলতেই তার একটি উদ্দেশ্য থাকা চাই।
for a successful life
উদ্দেশ্যহীন জীবনের নেই কোনো মূল্য, নেই কোনো প্রাপ্য। জীবনের যেমন উদ্দেশ্য আছে, তেমনি উদ্দেশ্যেরও রয়েছে জীবন তথা জীবনময়তা। অর্থাৎ উদ্দেশ্যের সততা ও মহত্ত্ব। তাই উদ্দেশ্য হতে হবে সৎ ও মহৎ, যার ছত্রে-ছত্রে থাকে আদর্শের দীপ্তি। জীবনের উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্যের জীবন তথা আদর্শ ও উদ্দেশ্যের শুদ্ধতা ও সততাই হলো সফল জীবনের মূলমন্ত্র। উদ্দেশ্যময়তা ও অলসতা পরস্পরবিরোধী আচরণ। কখনো উভয়ের সম্মিলন হতে পারে না। যে ব্যক্তি জীবনের কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তার পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে সে লক্ষ্যের দিকে। সে এদিক-সেদিক মনোযোগ দিয়ে নিজের স্বর্ণের মতো মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারে না। লক্ষ্য নির্ধারণ করে যে জীবন পরিচালনা করে, সে তীব্র বেগে ছুটে ঐ মুসাফিরের মতো যে প্রতিটি মুহূর্ত নিবিষ্ট থাকে আখেরি মনজিলের দিকে অগ্রসর হতে। পৃথিবীর দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য তাকে মুগ্ধ ও প্রলুদ্ধ করতে সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু সে দু’চোখ বন্ধ করে পথ চলতে থাকে লক্ষ্যে পৌঁছার প্রত্যাশায়। ছায়াশীতল বিশ্রামস্থান তাকে আরাম ও বিরামের জন্য উদ্বুদ্ধ করে, কিন্তু সে পথ চলতে থাকে মোহ-মুগ্ধতার স্বাদ ছেড়ে। বিচিত্র চাহিদা তার পথকে অবরোধ করে, কিন্তু সে সচল পদবিক্ষেপে এগুতে থাকে সকল বাঁধ-বাধার প্রতিরোধ করে। জীবনের বিভিন্ন উত্থান-পতন, স্খলন ও পদস্খলন তাকে ঠেকিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু তাতেও কোনো ছেদ পড়ে না তার ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞায়, তার দৃপ্ত পদচারণায়। লক্ষ্য স্থিরকারী ব্যক্তি কখনো দিকভ্রান্ত হতে পারে না। কারণ, রাস্তা ও আখেরি মনজিল সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা থাকে। সামনে থাকে তার একটি সুনির্ধারিত লক্ষ্য। কখনো সে পথ থেকে ফসকে পড়ে না। অসঙ্গত প্রসঙ্গ নিয়ে সময় নষ্ট করে, নি®প্রাণ আনন্দে মেতে ওঠে না। সবদিক থেকে মনোযোগ হঠিয়ে শুধু একদিকেই সে মনোযোগ নিবদ্ধ করে। লক্ষ্য অর্জন হওয়া ও আখেরি মানজিলে পৌঁছা পর্যন্ত তাকে থাকতে হয় কর্মচঞ্চল ও ব্যস্তসচল। তাই জীবনকে সচল ও সফল করার জন্য প্রত্যেকেরই একটি সুচিন্তিত ও সুচিহ্নিত লক্ষ্য থাকা অনিবার্য, অপরিহার্য। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন হওয়া চাই, যার সততা ও সত্যতার ওপর অন্তর পূর্ণ আস্থা রাখে, হৃদয় যাকে পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং যা রক্তের মতো প্রতিটি রন্ধ্রে বিচরণ করে। এই লক্ষ্য নির্ধারণই মানুষকে অন্যান্য জীব থেকে বিশিষ্টতা দান করে। মনুষ্যত্ব ও পশুত্বের মাঝে বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্যের দেয়াল তোলে। উদ্দেশ্যের সঙ্গে আদর্শের এবং চিন্তার সঙ্গে কর্মের সংযোগ ঘটাতে হবে। চিন্তা হতে হবে আদর্শিক, বাস্তবভিত্তিক ও কর্মমুখী। আর কাজ হতে হবে চিন্তানির্ভর, ফলপ্রসূ ও বাস্তবমুখী। চিন্তাহীন কর্ম ও কর্মহীন চিন্তা দুটোই অúূর্ণ ও অকার্যকর। যে ব্যক্তির জীবনে লক্ষ্যের প্রতি একাগ্রতা ও একাত্মতা সৃষ্টি হবে, তার জীবন অবশ্যি অন্য এক জীবন হয়ে উঠবে, জীবন-সূর্য তার হৃদয়-আকাশে আলোর উদ্ভাস ঘটাবে।

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons