মানবজাতির জীবন বলতেই তার একটি উদ্দেশ্য থাকা চাই।

উদ্দেশ্যহীন জীবনের নেই কোনো মূল্য, নেই কোনো প্রাপ্য। জীবনের যেমন উদ্দেশ্য আছে, তেমনি উদ্দেশ্যেরও রয়েছে জীবন তথা জীবনময়তা। অর্থাৎ উদ্দেশ্যের সততা ও মহত্ত্ব। তাই উদ্দেশ্য হতে হবে সৎ ও মহৎ, যার ছত্রে-ছত্রে থাকে আদর্শের দীপ্তি। জীবনের উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্যের জীবন তথা আদর্শ ও উদ্দেশ্যের শুদ্ধতা ও সততাই হলো সফল জীবনের মূলমন্ত্র। উদ্দেশ্যময়তা ও অলসতা পরস্পরবিরোধী আচরণ। কখনো উভয়ের সম্মিলন হতে পারে না। যে ব্যক্তি জীবনের কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তার পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে সে লক্ষ্যের দিকে। সে এদিক-সেদিক মনোযোগ দিয়ে নিজের স্বর্ণের মতো মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারে না। লক্ষ্য নির্ধারণ করে যে জীবন পরিচালনা করে, সে তীব্র বেগে ছুটে ঐ মুসাফিরের মতো যে প্রতিটি মুহূর্ত নিবিষ্ট থাকে আখেরি মনজিলের দিকে অগ্রসর হতে। পৃথিবীর দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য তাকে মুগ্ধ ও প্রলুদ্ধ করতে সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু সে দু’চোখ বন্ধ করে পথ চলতে থাকে লক্ষ্যে পৌঁছার প্রত্যাশায়। ছায়াশীতল বিশ্রামস্থান তাকে আরাম ও বিরামের জন্য উদ্বুদ্ধ করে, কিন্তু সে পথ চলতে থাকে মোহ-মুগ্ধতার স্বাদ ছেড়ে। বিচিত্র চাহিদা তার পথকে অবরোধ করে, কিন্তু সে সচল পদবিক্ষেপে এগুতে থাকে সকল বাঁধ-বাধার প্রতিরোধ করে। জীবনের বিভিন্ন উত্থান-পতন, স্খলন ও পদস্খলন তাকে ঠেকিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু তাতেও কোনো ছেদ পড়ে না তার ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞায়, তার দৃপ্ত পদচারণায়। লক্ষ্য স্থিরকারী ব্যক্তি কখনো দিকভ্রান্ত হতে পারে না। কারণ, রাস্তা ও আখেরি মনজিল সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা থাকে। সামনে থাকে তার একটি সুনির্ধারিত লক্ষ্য। কখনো সে পথ থেকে ফসকে পড়ে না। অসঙ্গত প্রসঙ্গ নিয়ে সময় নষ্ট করে, নি®প্রাণ আনন্দে মেতে ওঠে না। সবদিক থেকে মনোযোগ হঠিয়ে শুধু একদিকেই সে মনোযোগ নিবদ্ধ করে। লক্ষ্য অর্জন হওয়া ও আখেরি মানজিলে পৌঁছা পর্যন্ত তাকে থাকতে হয় কর্মচঞ্চল ও ব্যস্তসচল। তাই জীবনকে সচল ও সফল করার জন্য প্রত্যেকেরই একটি সুচিন্তিত ও সুচিহ্নিত লক্ষ্য থাকা অনিবার্য, অপরিহার্য। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন হওয়া চাই, যার সততা ও সত্যতার ওপর অন্তর পূর্ণ আস্থা রাখে, হৃদয় যাকে পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং যা রক্তের মতো প্রতিটি রন্ধ্রে বিচরণ করে। এই লক্ষ্য নির্ধারণই মানুষকে অন্যান্য জীব থেকে বিশিষ্টতা দান করে। মনুষ্যত্ব ও পশুত্বের মাঝে বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্যের দেয়াল তোলে। উদ্দেশ্যের সঙ্গে আদর্শের এবং চিন্তার সঙ্গে কর্মের সংযোগ ঘটাতে হবে। চিন্তা হতে হবে আদর্শিক, বাস্তবভিত্তিক ও কর্মমুখী। আর কাজ হতে হবে চিন্তানির্ভর, ফলপ্রসূ ও বাস্তবমুখী। চিন্তাহীন কর্ম ও কর্মহীন চিন্তা দুটোই অúূর্ণ ও অকার্যকর। যে ব্যক্তির জীবনে লক্ষ্যের প্রতি একাগ্রতা ও একাত্মতা সৃষ্টি হবে, তার জীবন অবশ্যি অন্য এক জীবন হয়ে উঠবে, জীবন-সূর্য তার হৃদয়-আকাশে আলোর উদ্ভাস ঘটাবে।