Total Pageviews

Friday, March 9, 2012

আশিতেও দীপ্ত আত্মানুসন্ধান

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, আপন শিল্পকর্মের পাশে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, আপন শিল্পকর্মের পাশে
ছবি: প্রথম আলো
আজ ৮০ বছর পূর্ণ হচ্ছে তাঁর। তবে ‘আসি’ বলে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন না। বরং ৮০-তেও নানান রঙের বিভায় উদ্ভাসিত তাঁর অন্তর। সৃজনশীলতা ও কর্মোদ্দীপনায় এখনো তারুণ্যের দীপ্তি। মনেই হয় না, ৮০ বছর হয়ে গেল দেশের বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর।
শিল্পী নিজেও গতকাল বৃহস্পতিবার সে কথাই বলছিলেন, ‘বেঁচে থাকলে স্বাভাবিক নিয়মেই বয়স হবে। ৮০ হলো। হয়তো ৮৫ হবে, ৯০ও হতে পারে। তবে বয়স যা-ই হোক, যত দিন বাঁচি, কাজ করে যেতে চাই। জীবনের কাছে এটাই প্রত্যাশা।’
সেই কাজ নিয়েই শিল্পীর জন্মদিনের উৎসব হবে আজ। তাঁর ৮০টি সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে এই প্রদর্শনীর নাম ‘আত্মানুসন্ধান’।
দীর্ঘ ৬০ বছরের শিল্পচর্চায় কাইয়ুম চৌধুরী আমাদের চারুকলার ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন নিরলস সৃজনশীল কর্মপ্রবাহে। বিচিত্র তাঁর কাজের সম্ভার। সুকুমার শিল্পকলার সঙ্গে আছে ব্যবহারিক শিল্পকর্ম। চিত্রকলায় বাংলার নিসর্গ, ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির উপকরণ তাঁর নিজস্ব নান্দনিক বোধে জারিত হয়ে উপস্থাপিত হয়েছে আধুনিক আঙ্গিকে। বিদগ্ধজনেরা অনেকে বলেছেন, কবিতায় যেমন জীবনানন্দ দাশ বাংলার নিসর্গ ও ঐতিহ্যকে আধুনিক কলাকৃতির অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করেছিলেন, শিল্পকলার ক্ষেত্রে কাইয়ুম চৌধুরীও সেই কাজটিই করেছেন। অধিকন্তু তিনি তাঁর কর্মপ্রবাহকে ব্যবহারিক শিল্পকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করে এই জনপদে শিল্পরুচি সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বইয়ের প্রচ্ছদ, বিজ্ঞাপন, নানা প্রতিষ্ঠানের লোগো এবং বিশেষত বাংলা অক্ষরকে তিনি এক অনন্য সুষমায় উপস্থাপন করেছেন।
কাইয়ুম চৌধুরী এই ছয় দশকের শিল্পসাধনায় নিজের কাজকে নিরন্তর নিরীক্ষা ও নতুনত্বের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, ‘আমি কখনোই একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চাইনি। সংস্কৃতির উপাদান, প্রকৃতির সৌন্দর্য, আমার ভাবনা—এসব সংমিশ্রণ করে নানা আঙ্গিকে তুলে ধরার চেষ্টা করে গেছি। জীবনের যা কিছু ভালো ও সুন্দর, যা দেখে বাঁচতে ইচ্ছে করে, তাকেই আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি। যেন আমার ছবি যাঁরা দেখবেন, তাঁরাও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য অনুপ্রাণিত বোধ করেন।’
সেই সুন্দর ভুবনের দ্বার উন্মোচিত হবে আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টায়। ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে ‘আত্মানুসন্ধান’ নামের এই প্রদর্শনীর দ্বারোদ্ঘাটন করবেন শিল্পীর বন্ধু শিল্পী মুর্তজা বশীর, লেখক সৈয়দ শামসুল হক, শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। শিল্পীর স্বজন, সুহূদ, অনুরাগীরা তাঁকে জন্মদিনের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাবেন।
‘আত্মানুসন্ধান’ প্রদর্শনী চলবে ২২ মার্চ অবধি। খোলা থাকবে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত।
এবারের প্রদর্শনীতে দর্শকেরা নতুন আঙ্গিকে পাবেন তাঁদের প্রিয় শিল্পীকে। অ্যাক্রিলিক, ছাপচিত্র, প্যাস্টেল, মিশ্রমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমের কাজ রয়েছে এতে। চিত্রপটে অনেক স্পেস ছেড়ে কাজ করেছেন, আকার-আকৃতির বিন্যাসেও আছে নিরীক্ষা। পাখি, নৌকা, মাছ, ফুল-পাতায় ভরা শাখা, নদীর রেখা, তার সঙ্গে মানব-মানবীর আদল, জ্যামিতিক ও লোকজ অঙ্কনরীতির নকশা—এসবের মধ্য দিয়েই অতিচেনা কাইয়ুম চৌধুরীকে পাওয়া যাবে নবব্যঞ্জনায়। সেই সঙ্গে মাঠের সবুজ, আকাশের নীল, শিমুল-পলাশের রক্তিম উচ্ছ্বাস, সূর্যের দীপ্তি, হাওয়ার চঞ্চলতা, নদীস্রোতের গতিধারা তিনি রেখায়-আঁচড়ে, তুলির টানে মিলিয়ে দিয়েছেন চিরন্তন মানবিক অনুভূতির সঙ্গে। এর মধ্য দিয়েই অনুসন্ধান করেছেন মানবমুক্তির সংগ্রাম, সমাজ-প্রগতির স্বরূপ।
প্রদর্শনী উপলক্ষে গতকাল দুপুরে বেঙ্গল গ্যালারিতে সংবাদ সম্মেলন ও প্রেস প্রিভিউয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। এতে শিল্পীর কাজ নিয়ে তাঁর ছাত্র ও সহকর্মী শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, ‘এই বয়সেও তিনি যেমন সতেজ, উদ্দীপনাময় এবং সৃজনশীল রয়েছেন, তা তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা দেয়। এমন এক স্বকীয়তা তিনি অর্জন করেছেন, যে মাধ্যমেই কাজ করেন, যত নিরীক্ষাই করেন, কাজ দেখেই তাঁকে চেনা যায়। যেমন: পিকাসো নানা মাধ্যমে, নানা ধরনের কাজ করলেও কাজ দেখেই তাঁকে চেনা যায়। এই স্বকীয়তা অর্জন করা বড় মাপের শিল্পীর বৈশিষ্ট্য। কাইয়ুম চৌধুরী তা অর্জন করেছেন।’
প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ব্যক্তিগতভাবে নেপথ্যচারী মানুষ। তা সত্ত্বেও তিনি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালির সব আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর শিল্পীচেতনার ছাপ রেখে গেছেন। পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট, পুস্তিকার অলংকরণসহ বৈচিত্র্যময় তাঁর কাজ। এই বহুমাত্রিক শিল্পচর্চার ভেতর দিয়ে তিনি জাতির অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করেছেন। তাঁর জন্মদিনের এই প্রদর্শনীটি এ কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক স্বাধিকারের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে শিল্পের যোগসূত্র সৃষ্টি, বিশেষত মুদ্রণশিল্পের আধুনিকায়নে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছেন। এই বয়সেও যেভাবে তিনি সৃজনশীল রয়েছেন, তা শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।’ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক সারোয়ার জাহান; সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল গ্যালারির পরিচালক সুবীর চৌধুরী।
আর শিল্পীর কী অনুভূতি? গ্যালারির চার দেয়ালে আপন সৃজনসম্ভার। রঙে-রেখায়, আকৃতি-অবয়বে, স্বদেশ-স্বজাতির অন্তরাত্মার উদ্ভাসন। সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যা করেছি, প্রাপ্তি তার থেকে অনেক বেশি। এই প্রাপ্তি মানুষের ভালোবাসা। যাবার বেলায় এটা নিয়েই যেতে চাই।’
এই তো, এর চেয়ে আর কী লাগে মানুষের! এ প্রত্যাশা পূরণ হোক—জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘ পরমায়ু কামনার সঙ্গে এই প্রার্থনাই থাকবে প্রিয় শিল্পীর জন্য। prothom-alo

Friday, January 27, 2012

একজন ময়েন স্যার

গোপালগঞ্জ শহরের নজরুল পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়ছেন সদস্যরা। বসে আছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মঈন উদ�গোপালগঞ্জ শহরের নজরুল পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়ছেন সদস্যরা। বসে আছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মঈন উদ্দিন (ডানে)
ছবি: প্রথম আলো
বই মানুষকে আলোকিত করে। পাঠাগারকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ে জ্ঞানের সেই আলো। এমনই এক পাঠাগার প্রায় ছয় দশক ধরে আগলে রেখেছেন গোপালগঞ্জের ‘ময়েন স্যার’। অবৈতনিক গ্রন্থাগারিক হিসেবে আলোকিত মানুষ গড়ার কাজ করছেন অক্লান্তভাবে।
অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষকের পুরো নাম মঈন উদ্দিন। শহরের নজরুল পাবলিক লাইব্রেরির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সেই ১৯৫৬ সাল থেকে। তাঁর হাত ধরেই বেড়েছে এই পাঠাগারের কলেবর। শহরে গড়ে উঠেছে একটি পাঠক সমাজ। আলোর পরশ পেয়েছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সবার চোখেই নজরুল পাবলিক লাইব্রেরি আর ‘ময়েন স্যার’ অভিন্ন সত্তা। গোপালগঞ্জের এস এম মডেল স্কুল থেকে ১৯৯০ সালে অবসর নেন মঈন উদ্দিন। কিন্তু পাঠাগারের প্রতি দায়িত্ব শেষ করেননি এই ৭৮ বছর বয়সেও।
দিনলিপি: প্রতিদিন সকালে পাঠাগারের তালা খোলেন মঈন উদ্দিন। সদস্যদের বই দেওয়া থেকে শুরু করে পাঠাগার ঝাড়ু দেওয়ার কাজও করেন। এই পাঠাগারকে ধ্যানজ্ঞান করেই তরুণ বয়স থেকে শুরু করে জীবনের অধিকাংশ সময় পার হয়ে গেছে তাঁর। পরিবারের চেয়েও বেশি সময় তিনি দিয়েছেন এই পাঠাগারে। বই পড়ার অভ্যাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান তিনি। পাঠাগারটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে।
পাঠাগারে যত বই: নজরুল পাবলিক লাইব্রেরিতে রয়েছে ১৩ হাজার ৯০০ বই ও সাময়িকী। ধ্রুপদি সাহিত্যের বইয়ের মধ্যে রয়েছে হোমারের ইলিয়াড, ওডিসি এবং দান্তে রচনাবলির বাংলা অনুবাদ। আছে পারস্যের কবি ফেরদৌসি রচিত শাহনামা। আছে প্রতীচ্য পুরাণ, রবীন্দ্র রচনাবলি ও নজরুল রচনাবলি। পুরোনো বইয়ের মধ্যে আছে ১৯৫৮ সালের সংস্করণসহ স্ট্যান্ডার্ড জেনারেল নলেজ-এর বিভিন্ন সংস্করণ। রয়েছে রবীন্দ্র রচনাবলির ইংরেজি সংকলন দি গোল্ডেন বুক অব টেগোর (১৯৩১), ফান্ডামেন্টাল রুলস অ্যান্ড সিভিল সার্ভিস রেগুলেশন (১৯৫৭) ও কাজী মোতাহার হোসেনের গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস। পুরোনো সাময়িকীর মধ্যে রয়েছে দি মডার্ন রিভিউ (১৯৩৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত), বিচিত্রা, ভারতবর্ষ, দেশসহ সাপ্তাহিক ও মাসিক বিভিন্ন পত্রিকার ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত সংখ্যার বাঁধাই সংস্করণ।
যেভাবে হলো: নজরুল পাবলিক লাইব্রেরির আদি নাম ছিল করোনেশন লাইব্রেরি। ১৯২০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে রাজা পঞ্চম জর্জের অভিষেক উপলক্ষে ভারতজুড়ে উৎসব উদ্যাপনের আয়োজন করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। এ জন্য ভারতের সব জেলা এমনকি মহকুমা শহরে অর্থ পাঠানো হয়। গোপালগঞ্জের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তখন স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করেন। নাট্যামোদী ১২ সদস্যের আগ্রহে সিদ্ধান্ত হয় একটি থিয়েটার ক্লাব গড়ে তোলার। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় করোনেশন থিয়েটার ক্লাব। সেখানে শহরের সুশীল সমাজের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ একটি পাঠাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ক্লাব পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় করোনেশন পাবলিক লাইব্রেরি। শুরু থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পাঠাগারটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন প্রতাপ বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তি। এরপর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
মঈন উদ্দিনের দায়িত্ব গ্রহণ: মা-বাবার অসুস্থতার কারণে সে সময় কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরেছিলেন মঈন উদ্দিন। বই পড়া ও সংগ্রহে অসীম আগ্রহ দেখে তাঁকে সবাই পাঠাগারের দায়িত্ব নিতে বলেন। এভাবেই করোনেশন থিয়েটার ক্লাব ও পাঠাগারের সঙ্গে জড়িয়ে যান মঈন উদ্দিন। সেই থিয়েটার ক্লাবে তখন টিকিটের বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনী হতো। এই ক্লাবকে কেন্দ্র করে তখন শহরে গড়ে উঠেছিল ১৮টি ড্রামা ক্লাব ও অনেক পাঠাগার।
পাঠাগারের জন্য ত্যাগ: কলকাতা থেকে এসেছিল বাহারি চাকরির আহ্বান। ‘দ্য ক্যাভেন্ডার্স’ নামে একটি ব্রিটিশ বিপণন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সচ্ছল ভবিষ্যৎ ও বিলাসী জীবনের হাতছানি। কিন্তু পাঠাগারের জন্য তত দিনে বিশেষ মায়া জন্মে গেছে মনে। তাই কলকাতার ডাক উপেক্ষা করলেন মঈন উদ্দিন। কিন্তু জীবন-বাস্তবতা তাঁকে ঠেলে দেয় অর্থনৈতিক সংকটের মুখে। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তখন এগিয়ে আসেন। মঈন উদ্দিনের চাকরির ব্যবস্থা করেন এসএম মডেল স্কুলে। মাত্র ১০০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। বাকি সময় কাটান পাঠাগারে।
নতুন নামকরণ: পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগ। শহরে তখন মুসলিম লীগ নেতাদের দাপট। তাঁরা করোনেশন পাবলিক লাইব্রেরির নাম বদলে পাকিস্তানের বিশিষ্ট কবি ইকবালের নামে নামকরণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হতে দেননি মঈন উদ্দিন। তিনি বাংলা ভাষার কোনো কবির নামে পাঠাগারের নামকরণের দাবি তোলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করা হয়। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে পাঠাগারের নতুন নাম হয় নজরুল পাবলিক লাইব্রেরি।
পাঠাগারের টিকে থাকা: পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে এক ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় করোনেশন থিয়েটার ক্লাব ও পাঠাগার। তখন পাঠাগারটি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করা হয় মডেল স্কুল সড়কের একটি টিনের ঘরে। এটি ছিল মঈন উদ্দিনের তৎকালীন বাসস্থানের একটি অংশ। বই ও আসবাবের স্থান সংকুলানের অভাবে পাঠাগারটি সরানো হয় ভাষাসৈনিক পরেশ বিশ্বাসের মধ্যপাড়ার বাড়িতে। কয়েক বছর এভাবেই চলে পাঠাগারের কার্যক্রম। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? স্বপ্নের পাঠাগারের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মঈন উদ্দিন। এ ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক শহীদ হামিদ খান। স্থায়ী পাঠাগার স্থাপনের জন্য মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ জমির ব্যবস্থা করেন তিনি। মঈন উদ্দিনের সম্বল তখন মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা। ওই টাকায় তিনি একটি টিনের ঘর তৈরির পরিকল্পনা নেন। কিন্তু বাধা দেন মহকুমা প্রশাসক। তিনি সেখানে একতলা ভবন তৈরির পরিকল্পনা করেন। বাজেট ৬০ হাজার টাকা। মঈন উদ্দিনের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এত টাকা কোথায় পাবেন? তখন তাঁকে অভয় দেন হামিদ খান। সরকারি কোষাগার থেকে কিছু টাকার সংস্থান হয়। তৎকালীন ঠিকাদার ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সাইদ আলী খানকে এই ভবন নির্মাণকাজের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন হামিদ খান। সাইদ আলী খান রাজি হয়ে যান। এভাবেই নির্মিত হয় নজরুল পাবলিক লাইব্রেরির বর্তমান ভবন।
একজন ময়েন স্যার: গোপালগঞ্জের খ্যাতনামা এস এম মডেল স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন মঈন উদ্দিন। ফলে এলাকায় তাঁর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রচুর। সবার কাছেই তিনি ‘ময়েন স্যার’। আর পাঠাগারের প্রতি আজীবন শ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে তিনি অর্জন করেছেন সবার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। ধৈর্যশীল, নীতিবান, অসাম্প্রদায়িক, সদালাপী ও স্বল্পভাষী এই মানুষটি বছরের পর বছর পড়াশোনা করেছেন বহুমুখী বিষয়ে। তাঁর সঙ্গে আলাপ করলেই সেটা বোঝা যায়। সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত এই মানুষটি কথা বলেন প্রাণ খুলে। রিকশায় চড়ার বিলাসিতা তাঁর নেই। হেঁটেই চলাফেরা করেন এখনো।
শিক্ষক হিসেবেও ‘ময়েন স্যার’ অতুলনীয়। ছাত্রছাত্রীদের কখনো সাজেশন দেননি। কোনো দিন প্রাইভেট পড়াননি। কোনো দিন ছাত্রছাত্রীদের মুখস্থ করার জন্য চাপ দেননি।
পরিবারের চোখে: স্ত্রীর নাম জাহান জেব বানু। স্বামীকে নিয়ে গর্বিত তিনি। তাঁদের চার ছেলের প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বাবাকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই তাঁদের। শহরের মধ্যপাড়ার একটি বাড়িতে এই পরিবারটির বাস।
প্রত্যাশা: মঈন উদ্দিন এখন খুঁজে ফিরছেন এমন একজন মানুষকে, যিনি এই পাঠাগারটিকে মনে-প্রাণে ভালোবাসবেন। যাঁর হাত ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি সামনের দিকে এগোবে। সে রকম একজনের হাতেই তিনি তুলে দিতে চান পাঠাগারের দায়িত্ব। মঈন উদ্দিন বেঁচে থাকতে চান এই পাঠাগারের মধ্যে, মানুষের পাঠাভ্যাসের মধ্যে। prothom-alo

Friday, December 30, 2011

ধনেপাতায় ধনদৌলত

নিজের ধনেপাতা খেতে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার ভেতরকুঠি গ্রামের তৈয়ব আলী
ছবি: প্রথম আলো
শীত মৌসুমে ধনেপাতার কদর বাঙালির ঘরে ঘরে। তরিতরকারিতে স্বাদ আনতে ধনেপাতার জুড়ি নেই। মচমচে মুড়ি, তেল-মরিচ-পেঁয়াজের সঙ্গে ধনেপাতা কুচি কুচি করে কেটে মেখে খেতে খুবই মজা। অনেকেই আছেন, পাতে একটু ধনেপাতার ভর্তা হলেই তাঁদের ভরপেট ভাত খাওয়া হয়ে যায়।
গ্রামবাংলার অনেক বাড়িতে ধনেপাতার চাষ করে মূলত পরিবারের চাহিদা মেটানো হয়। তবে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সাড়াই ইউনিয়নের ভেতরকুটি গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় ধনেপাতার। ১৬ বছর আগে তৈয়ব আলীর (৬০) হাত ধরে সূচনা হয় এ চাষের। তাঁর সাফল্য দেখে গ্রামের অন্যরাও চাষে লেগে পড়েন। এখন গ্রামের মাঠের পর মাঠ ধনেপাতার চাষ হয়। যাঁদের জমি নেই, তাঁরা বর্গা নিয়ে চাষ করেন।
অথচ একসময় এ গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিলেন অভাবী। উঁচু এলাকা বলে ধানসহ অন্যান্য ফসল এখানে ভালো হতো না। খাবারও জুটত না অনেকের। তবে এখন দিন বদলেছে। ভেতরকুটির মানুষ ধনেপাতা চাষ করে ভালো করেছেন আর্থিক অবস্থা। এই গ্রামের সবাই বেশ সচ্ছল, সুখী জীবন।
এক দিন সেই গ্রামে: কাউনিয়া উপজেলার সদর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে ভেতরকুটি গ্রাম। লোকসংখ্যা হাজার দেড়েক।
কাঁচা-পাকা পথ ধরে গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে মাঠজুড়ে অসংখ্য ধনেপাতার খেত। বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চাল। আধাপাকা বাড়িও আছে কয়েকটি। কোথাও শণ বা খড়ের কুঁড়েঘর দেখা গেল না। তৈয়ব আলীর বাড়ি খোঁজ করতেই একজন দেখিয়ে দেন। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, তৈয়ব ধনেপাতা তুলছেন, সঙ্গে পুত্রবধূরাও।
সংগ্রাম: ১৯৫১ সালে অভাবের সংসারে জন্ম তৈয়ব আলীর। লেখাপড়া করা হয়নি। এক ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি বড়। ১০ বছর বয়সে মারা যান বাবা। ১১ বছর বয়সে হারান মাকে। ১৩ বছর বয়সে ধরেন সংসারের হাল।
বাড়িতে ধান সিদ্ধ করে চাল তৈরির পর তা বাজারে বেচার কাজ শুরু করেন তৈয়ব। কয়েক বছর চালের ব্যবসা করেন, কিন্তু অভাব পিছু ছাড়ে না। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে চালের ব্যবসা ছেড়ে দেন। কয়েক মাস বেকার ঘুরে বেড়ানোর পর গ্রামের মোজাম্মেল হোসেনের পরামর্শে শুরু করেন কাঁচা তরকারির ব্যবসা। ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে খেত থেকে করলা কিনতে পাশের নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলী গ্রামে যান। সেখানে নাজমুল নামের একজনের কাছে ধনেপাতা চাষ করে ভাগ্য বদলানোর গল্প শোনেন। বিষয়টি তাঁর মনে ধরে। ঠিক করেন, ধনেপাতা চাষ করে অভাব জয় করবেন।
ওই বছরের নভেম্বরে ১০ শতক জমিতে তিনি ধনেপাতার চাষ করেন। ৩০ দিনে এ ধনেপাতা বেচে খরচ বাদে চার হাজার টাকা আয়ও হয়। পরের বছর ৪০ শতকে দুই দফায় ৭০ দিনে চাষ করে আয় করেন ৩০ হাজার টাকা। এরপর পুরোপুরি লেগে পড়েন। স্ত্রী-পুত্ররাও তৈয়ব আলীর সঙ্গে হাত লাগান। সংসারে আসে সচ্ছলতা।
ধনেপাতার চাষের টাকায় কেনেন তিন একর জমি, বানান পাকা বাড়ি। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তিন ছেলে ধনেপাতা আর নানা সবজি চাষে লেগে আছেন। এবার দেড় একর জমিতে ধনেপাতার চাষ করে এক লাখ টাকা আয় করেছেন।
ভাগ্য বদলাল যাঁরা: ভেতরকুটি গ্রামের আবুল কালাম সংসার চালাতে কখনো দিনমজুরি, কখনো বা রিকশা চালাতেন। এর পরও আট সদস্যের পরিবারে অভাব লেগে থাকত। তৈয়ব আলীর সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি অন্যের ১৫ শতক জমি বর্গা নেন।
শুরু করেন ধনেপাতার চাষ। বদলে যায় ভাগ্যের চাকা। ধনেপাতা বেচার টাকায় কেনেন দেড় একর জমি। বানান পাকা বাড়ি। এবার ৮০ শতকে ধনেপাতার চাষ করে আয় করেছেন ৫২ হাজার টাকা।
গ্রামের মোসলেমার স্বামী ২০ শতক বসতভিটা আর দুই সন্তান রেখে ১২ বছর আগে মারা যান। অসহায় মোসলেমা শুরু করেন দিনমজুরি। এ কষ্ট দেখে তৈয়ব আলী পরামর্শ দেন ধনেপাতা চাষের। তৈয়বের কাছ থেকে বীজ নিয়ে মোসলেমা বসতভিটার চারদিকে ধনেপাতা চাষ করেন।
৩০ দিনের মধ্যে এ ধনেপাতা বেচে আয় হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। পরের বছর অন্যের ২০ শতক জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। এবার ৭০ শতক জমিতে এ ফসলের চাষ করেছেন। সন্তানদের নিয়ে বেশ ভালো আছেন।
গ্রামের আবদুল হালিম, ফিরোজা বেগম, মঞ্জিলা খাতুন, মোর্শেদা বেগম, সাহেদা খাতুন, জহরা বেগম, লাল মিয়াসহ অনেকেই ধনেপাতা চাষ করে ভাগ্য বদলের গল্প শোনালেন।
লাভ অনেক: গ্রামের কৃষক মোবারক হোসেন বলেন, ধনেপাতা চাষে পরিশ্রম কম। চারবার লাঙলের হাল দিয়ে চাষ করে একরে ৭০ কেজি ধনেপাতার বীজ ছিটিয়ে দিতে হয়। বীজ বপনের ২০ দিনের মাথায় হালকা একটা সেচ দিতে হয়। সার, কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। লাগে না তেমন পরিচর্যাও। ৩০ দিন পর খেত থেকে ধনেপাতা তুলে ওই জমিতে আবারও ধনেপাতা চাষ করা যায়।
কাউনিয়া উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুভলচন্দ্র বর্মণ বলেন, ধনেপাতার চাষ খুবই লাভজনক। এক একর জমিতে ধনেপাতা চাষ করতে বীজ-গোবর-চাষাবাদ বাবদ নয় থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। শুরুতে ১০০ টাকা এবং শেষে ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও একরপ্রতি ৬০ হাজার টাকা আয় হয়, যা অন্য কোনো ফসল থেকে এত কম সময়ে আয় করা যায় না।
ধূমেরকুটি গ্রামের ধনেপাতার পাইকারি ব্যবসায়ী লাল মিয়া ও আবু বকর জানান, তাঁরা খেত থেকে ধনেপাতা কেনেন। এরপর হকের বাজার, মায়ার বাজার, খানসামা বাজার, কাউনিয়া বাজার, মেরাজের বাজারে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন।
অন্যদের কথা: সাড়াই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বলেন, এক যুগ আগেও ভেতরকুটি গ্রামের মানুষের কষ্টের শেষ ছিল না। উঁচু এ এলাকায় ফসলাদি ভালো হতো না। এখন ধনেপাতাসহ নানান সবজি চাষ করে গ্রামবাসী অভাবকে জয় করেছেন। এ গ্রামের মানুষের সাফল্য দেখে পাশের বাইরাকুটি, সোনাতলা, কদমতলা, বালাপাড়া, বিশ্বনাথ চরে কৃষকেরা এসব ফসলের চাষ করছেন।
কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, ভেতরকুটি গ্রামে ১৪-১৫ বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে ধনেপাতার চাষ হচ্ছে। গ্রামের অন্তত ৭০ শতাংশ লোক এ চাষের সঙ্গে জড়িত। পুরো উপজেলায় প্রায় ৭২০ একর জমিতে ধনেপাতার চাষ হয়। prothom-alo

Friday, December 2, 2011

জয়তু সুবর্ণা আপা!

নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আ� নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আক্তার
ছবি: প্রথম আলো
‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছেন তাঁরা। তাঁদের হারতে হয়নি, তাঁরা জিতে চলেছেন। স্বাবলম্বী হয়েছেন, অন্যদের এগিয়ে নিচ্ছেন সেই পথে।
বলা হচ্ছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী গ্রামের নারীদের কথা। ‘গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি’ নামে সমবায় সমিতি গড়ে বদলে ফেলেছেন নিজেদের ভাগ্য। আর এই সমিতি গড়তে গ্রামের নারীদের এক সুতোয় গেঁথেছেন একজন—সুবর্ণা আক্তার। সদস্যদের কাছে তিনি কেবলই ‘সুবর্ণা আপা’।
সুবর্ণার নেতৃত্বে ওই সমিতির সদস্যরা হাতপাখা, লেপ, টুপিতে নকশা তোলা, মাছ, সবজি ও লিচু চাষ করে ইটাকুমারীকে কর্মমুখর এক গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
শুরুর গল্প: পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণের গ্রাম ইটাকুমারী। এক দশক আগেও এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ ছিল দিনমজুর।
এই গ্রামেরই সচ্ছল এক পরিবারের মেয়ে সুবর্ণা। খুব কাছ থেকে দেখা গ্রামের মানুষের এমন কষ্ট তাঁকে নাড়া দিত। কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করতেন। সেই ভাবনা থেকে তাঁর মাথায় আসে সমবায় সমিতি গড়ার কথা। বিষয়টি গ্রামের নারীদের বোঝাতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর ডাকে সাড়া দেন নারীরাও।
সাফল্যের পথে: ২০০২ সালের ১০ জানুয়ারি। সুবর্ণা ১৪০ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে গঠন করেন গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি। সিদ্ধান্ত হয়, সদস্যরা সপ্তাহে পাঁচ টাকা করে সমিতিতে জমা দেবেন। চার বছরে সমিতির সঞ্চয় আর তা বিনিয়োগ করে পাওয়া লাভে তহবিলে জমা হয় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। সদস্যরা তা ভাগ করে নেন।
২০০৫ সালে সমিতির সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ৩৫০ করা হয়। সাপ্তাহিক চাঁদা বাড়িয়ে করা হয় ১০ টাকা। দুই বছরে সদস্যদের জমা এবং তা বিনিয়োগে পাওয়া যায় তিন লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে ২০০৭ সালে তিন একর আয়তনের একটি পুকুর ও দুই একর ফসলি জমি ইজারা নেওয়া হয় সমিতির নামে। পুকুরে মাছ ও জমিতে সবজি চাষ করে এক বছরে খরচ বাদে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়। মূলধন সমিতির তহবিলে রেখে লাভের অংশ সদস্যরা ভাগ করে নেন।
এগিয়ে চলা: সুবর্ণার চাওয়া ছিল, গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী করবেন। তাই সমিতির লাভের অংশ ভাগ করে দিয়ে চুপ থাকেননি। প্রতিবেশীদের কাছে গল্প শুনে ২০০৮ সালের শুরুতে তিনি পাশের কামদেব গ্রামের রওশন আরা বেগমের কাছে যান। তাঁর কাছ থেকে শিখে নেন হাতপাখা তৈরির কৌশল। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সমিতির সদস্যদের হাতপাখা তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। সমিতির তহবিল থেকে পোশাক কারখানার পরিত্যক্ত রঙিন সুতা কিনে শুরু হয় হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির কাজ।
ওই বছরের জুন মাসে সমিতির নারীরা শুরু করেন টুপিতে নকশা তোলার কাজ। এর পর থেকে সমিতির সদস্য ছাড়াও আড়াই শতাধিক নারী হাতপাখা তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজ করছেন। পাশাপাশি অনেকে লেপ-তোষক তৈরির কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।
গৃহবধূ ছালেহা বেগম ও নাজমা আকতার জানালেন, একটি পাখা তৈরিতে ছয় থেকে সাত টাকা খরচ হয়, বিক্রি হয় ১৮ থেকে ২০ টাকায়। তাঁদের নকশা করা টুপি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। একটি লেপ তৈরি করে ২০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়।
সমিতিতে এক দিন: সম্প্রতি এক সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব বাড়িতেই নারীরা কেউ হাতপাখা, কেউ লেপ তৈরি, কেউ বা টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছেন। সুবর্ণার বাড়িতেই একটি ঘর সমিতির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহূত হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সুবর্ণা নারীদের নিয়ে সমিতির বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন।
সুবর্ণা জানালেন, সমিতির অধীনে মাছ-সবজির চাষ চলছে। চলছে হাতপাখা, লেপ তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা। ৫০ শতক আয়তনের একটি লিচুবাগান ইজারা নেওয়া হয়েছে। এসব উ ৎস থেকে আয় হওয়া অর্থ শুধু সমিতির সদস্যরাই ভাগ করে নেন না, আয়ের ৫ শতাংশ গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েদের বিয়েতে ব্যয় করা হয়। অভাবী শিক্ষার্থীদের কিনে দেওয়া হয় বই-খাতা। এ ছাড়া সমিতির উদ্যোগে নিরক্ষর গৃহবধূদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিচর্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌতুক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
সফল যাঁরা: সমিতির সদস্য আরজিনা খাতুন, খালেদা আকতারসহ কয়েকজন তাঁদের দিনবদলের গল্প শোনালেন। তাঁদের টিনের ঘর উঠেছে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। নিজেদের হাঁস, মুরগি, গাভি, ছাগল আছে। সর্বোপরি সংসারে তাঁদের মতামত গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাছনা বেওয়া জানালেন, ১৫ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। এরপর ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন। তবে এখন তাঁর হাঁস-মুরগি ও একটি গাভি আছে। ভিক্ষা ছেড়েছেন অনেক আগেই। এ সবই হয়েছে সমিতির সদস্য হয়ে।
২০০০ সালে এই গ্রামের চায়না বেগমের বিয়ে হয় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী গ্রামে। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তিন বছরের মাথায় এক সন্তানসহ তাঁকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। তিনি এই সমিতির সদস্য হয়ে এখন মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করছেন।
এ ছাড়া গ্রামের লাকী বেগম, সহিদা বেগম, মঞ্জুয়ারা খাতুন, আছমা বেগম, মাজেদা খাতুনসহ অনেকের কাছেই শোনা গেল তাঁদের অভাব জয়ের গল্প।
একজন সুবর্ণা: স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত নারী সদস্য গুলশান আরা বেগমের ছোট মেয়ে সুবর্ণা। বিএ পাস সুবর্ণার বিয়ে হয় একই গ্রামের আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে। তাঁদের সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে আছে। স্ত্রীর উদ্যোগের প্রতি সম্মান আছে স্বামী আশরাফুজ্জামানের। ‘সুবর্ণার কর্মকাণ্ডে আমরা খুশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সব সময় সমিতির কাজে উ ৎসাহ দিই।’ বলছিলেন তিনি।
ইটাকুমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান দছিজল হক বলেন, সুবর্ণার মতো নারীই এই সমাজে প্রয়োজন। ইটাকুমারী গ্রামে বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কমেছে যৌতুকের প্রবণতাও। স্বাস্থ্যসচেতনতা, শিক্ষার প্রতি আগ্রহও বেড়েছে।
যেতে চান অনেক দূর: গ্রামের নারীদের জন্য আর কী করতে চান? সুবর্ণার উত্তর, ‘প্রত্যেক সদস্যকে একটি করে বিদেশি গাভির খামার করে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। হাতপাখা, লেপ তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজে পুরো উপজেলার দরিদ্র নারীদের যুক্ত করার বিষয়টিও মাথায় আছে।’
সুবর্ণা জানালেন, তাঁর স্বপ্ন—উপজেলার প্রতিটি নারী মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। এ জন্য নারীদের সংগঠিত করে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার আওতায় এনে বাল্যবিবাহ, যৌতুকের কুফল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে চান তিনি।
সফল হোক তাঁর এই যাত্রা!

Friday, October 21, 2011

 নিপীড়িত মানুষের প্রেরণা

  • ইলা মিত্র (জন্ম: ১৯২৫—মৃত্যু: ২০০২) ইলা মিত্র 
 কলকাতায় আন্দোলনের সময় বন্দী ইলা মিত্র
কলকাতায় আন্দোলনের সময় বন্দী ইলা মিত্র
মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ইলা মিত্র কিংবদন্তিসম এক নাম। তাঁর যুগে শ্রমের ফসল কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে যা ছিল বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আজ তা হয়েছে জাতিসত্তার পরিচয় কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে অন্তহীন সংগ্রাম। গত ১৮ অক্টোবর ছিল মহীয়সী এই নারীর জন্মদিন।

ইলা মিত্র (১৯২৫-২০০২) নিত্যস্মরণীয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্র। সংগ্রামী মানুষের আন্দোলনের ইতিহাসে দেশ-কাল-ধর্ম-জাতি-শ্রেণী-লিঙ্গ তুচ্ছ করা অনমনীয় মৃত্যুহীন প্রাণ ইলা মিত্র। তাঁর ইতি নেই। অন্তহীন তাঁর ইতিহাস, ইতিবৃত্ত ও ইতিকথা। আজও তাঁর নাম, তাঁর সংগ্রামের প্রেরণা নাচোলের অধিকারহারা সাঁওতাল জনগণের প্রাণে সাড়া জাগায়। আজও বাংলাদেশের সংগ্রামী অধিকারহারা যেকোনো স্তরের এবং শ্রেণীর মানুষ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করার জন্য ইলা মিত্রের সংগ্রাম থেকে পাঠ নেয়।

১৯৪৫ থেকে ১৯৫৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন—মাঠে-প্রান্তরে-সংগ্রামে এবং জেলে বন্দী অবস্থায়। নাচোলের তেভাগা আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা সে সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে হলেও ব্যক্তি ইলা মিত্রের সংগ্রামী চেতনার বিদ্রোহ অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো উদ্দীপ্ত করেছিল সেই আন্দোলনের অধিকারহারা সাঁওতাল কৃষক নারী-পুরুষের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে।
১৯৪৮-এ শুরু হয়ে ১৯৫০ সালের প্রথম কাল পর্যন্ত নাচোলে তেভাগা আন্দোলন বা কৃষক বিদ্রোহ উত্তুঙ্গে উঠেছিল। সাঁওতাল এই কৃষকদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ভারত উপমহাদেশের সাঁওতাল পরগনা জেলার অধিবাসী। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সাঁওতাল আদিবাসীরা মহাবিদ্রোহের হুংকার তুলেছিলেন। সেই বিদ্রোহীরা এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের সাঁওতাল অধিবাসীরা নিজ বাসভূমে শান্তিতে বাস করতে পারেননি—হয়েছিলেন শোষিত, নির্যাতিত, জীবিকাবঞ্চিত দরিদ্র, নিঃশেষিত। এঁরা ছিলেন বর্গাচাষি। বর্গাচাষিদের শ্রমের ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ কেড়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে জোতদারেরা কৃষকের ন্যায্য অধিকারের ওপর আঘাত করলেন। কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক সাঁওতালদের সংগঠিত করে নাচোলের তেভাগা আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের পর সে সময় দেশের অন্যান্য স্থানের তেভাগা আন্দোলনের নতুন জাগরণ ঘটেনি—শেষ হয়ে গিয়েছিল তেভাগা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড। হঠাৎ করেই নতুন পর্যায়ের তেভাগা আন্দোলন শুরু হলো নাচোলে।
নাচোল থানার চণ্ডীপুর গ্রামের সাঁওতাল নেতা মাতলা সরদার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন। সেই এলাকার কমিউনিস্ট রমেন মিত্র, ইলা মিত্র, অনিমেষ লাহিড়ী, শিবু কোড়ামুদি, বৃন্দাবন সাহা, আজহার হোসেন, চিত্ত চক্রবর্তী আত্মগোপনে থেকে সাঁওতালদের সংগঠিত করেছেন, এলাকার অন্যান্য হিন্দু-মুসলিম ধর্মনির্বিশেষে সব কৃষক সংগঠিত হয়েছিলেন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে।
পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণ-কর্তৃত্ব নাচোলের সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুতে কৃষক সমিতির নেতারা আহ্বান জানালেন আমন ধান কেটে তিন ভাগের দুই ভাগ ধান নিজেদের গোলায় তোলার জন্য। সে সময়ে পার্টির নেতা রণদীভের তত্ত্ব এবং নির্দেশিত সিদ্ধান্তে হঠকারীভাবে, অপ্রস্তুত পদ্ধতিতে নাচোলে কৃষক বিপ্লব ও পুলিশ-কৃষক সংঘর্ষ ঘটল এই ধান কাটা ও তিন ভাগের দুই ভাগ কৃষকের গোলায় তুলে নেওয়ার আন্দোলনের ফলে।
এ অবস্থায় পুলিশি আক্রমণের সময় ইলা মিত্র ছদ্মবেশে আত্মগোপনে যাওয়ার পথে ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি পুলিশের হাতে বন্দী হন রহনপুর স্টেশনে। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত জেল-জুলুম আর শারীরিক-মানসিকভাবে পুলিশি সন্ত্রাস ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
১৯৫০-৫৪ পর্যন্ত তাঁর মুক্তির দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাঁকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠায় পাকিস্তান সরকার।

 
ইলা মিত্রের সংগ্রাম সে সময় থেমে যায়নি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তিনি আজীবন রাজনৈতিক আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে নিবেদিত ছিলেন। একসময়ের ক্রীড়াবিদ ইলা সেন, বেথুন কলেজের ছাত্রী ইলা সেন। বিদ্রোহে-বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠেছিলেন ইলা মিত্র। তাঁর জীবন ছিল কর্মময়। অধ্যাপনার পেশায় তিনি যেমন ছিলেন কর্মনিষ্ঠ, তেমনি নিবেদিত ছিলেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। মানুষের কল্যাণ সাধনায় ছিলেন তিনি সক্রিয় মানবতাবাদী।
তাঁর সংগ্রামী জীবনের নানা দিকের আলোকপাতে আমরা জানি তিনি কখনোই অতিমানব হয়ে ওঠার আগ্রহ পোষণ করেননি; বরং সেই ধরনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর সংগ্রাম ছিল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ‘রাষ্ট্র বনাম অধিকারহারা মানুষের সংগ্রাম’। এই সংগ্রামের উত্তরাধিকারীদের কাছে তিনি দিয়ে গেছেন তাঁর এবং আরও সব বিপ্লবী-সংগ্রামীর অসমাপ্ত কাজ। সেই সংগ্রামের সূত্র ধরেই ইলা মিত্র আজও প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক এবং যুদ্ধ-সন্ত্রাসের শিকার করা হয়েছিল ইলা মিত্রকে। ‘নারীর বিদ্রোহ’ বলে ভাবা হয়েছিল তাঁর সংগ্রামকে। তাই তাঁর শরীরের ওপর নির্যাতনের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বীভৎস কদর্যরূপে নিজেদের কলঙ্ক লেপন করতে চেয়েছিল। পারেনি ইলা মিত্রের মনোবল ভেঙে দিতে। তাঁর পাশে এ দেশের অগণিত মানুষ দাঁড়িয়েছিল। নিপীড়িত মানুষ নিজেদের শিকল ছিঁড়েছে তাঁর বন্দিত্বের শিকল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে।
ইলা মিত্র জন্ম নিয়েছিলেন ১৮ অক্টোবর ১৯২৫ সালে। তাঁর জীবনাবসান হয়েছে ১৩ অক্টোবর ২০০২ সালে। ৭৭ বছরের সংগ্রামী, প্রাণস্ফূর্ত ইলা মিত্র দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। তাঁর স্মরণে ইতিহাসের মর্মবাণী গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে নিপীড়িত সাঁওতালসহ প্রান্তিক, দলিত, অধিকারহারা আদিবাসীদের অস্তিত্বের সংগ্রাম। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস রূপান্তরিত হয়েছে সাঁওতাল-প্রান্তিক আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ পরিচয় বাংলাদেশের সংবিধানে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে। এমনকি সম্প্রতি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও তাদের আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি মেলেনি।
ইলা মিত্রের সংগ্রামের যুগে যা ছিল ‘শ্রমের ফসল কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে’ বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আজ তা হয়েছে ‘জাতিসত্তার পরিচয় কেড়ে নেওয়ার’ বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার অন্তহীন সংগ্রাম। এই সংগ্রামের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরম্পরায় ইলা মিত্র সম্পৃক্ত হয়ে আছেন; থাকবেন যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত-অধিকারহারা মানুষের সংগ্রামের প্রেরণারূপে। প্রথম আলো

Saturday, October 1, 2011

স্বপ্ন পূরণের সারথি

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্লাস নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী একজন শিক্ষক সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্লাস নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী একজন শিক্ষক
ছবি: প্রথম আলো
অভাবের সংসারে ইরফানের জন্ম। একদিন বাবা মারা গেলেন। ইরফান তখন মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে। থমকে দাঁড়াল লেখাপড়া শিখে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন। সংসারের হাল ধরতে ওই বয়সেই কাজ নিতে হলো পাটকলে।
তবে ইরফানের স্বপ্ন থমকে দাঁড়াতে দেয়নি ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মানুষ হওয়ার স্বপ্নের জাল বুনছেন।
শুধু ইরফান নন, তাঁর মতো অন্তত ৪০০ শিক্ষার্থী ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’র সহায়তায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সারথি একজন হাফিজুর রহমান। তিনিই গড়ে তুলেছেন বিনা পয়সার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’। নরওয়ে প্রবাসী হাফিজুরের বাড়ি খুলনা মহানগরের ফুলবাড়ী গেটে। নগরের যোগীপোল এলাকায় চলছে তাঁর এ শিক্ষা কার্যক্রম।
যেভাবে শুরু: স্কুলে পড়ার সময় থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা ভাবতেন হাফিজুর রহমান। স্বপ্ন দেখতেন, একটি দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষিত সমাজের। সেই স্বপ্নের কাজ শুরু করেন নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন। তখন থেকেই বাড়ির পাশের বস্তির শিশুদের বাড়িতে এনে বিনা পয়সায় পড়াতেন। পুরো ছাত্রজীবনে এটা চালিয়ে যান। ২০০৫ সালে সাতটি শিশুকে বই-খাতা কিনে দিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন তিনি। একই বছর উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে নরওয়ে চলে যান। তবে সেখানে গিয়েও ওই সব শিশুর কথা ভোলেননি। ওদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেন ভাগনে আল আমিনকে।
আল আমিন নিজের বাড়ির একটি কক্ষে মাদুর বিছিয়েই ওদের পড়াতেন। মামা-ভাগনের এই উদ্যোগের কথা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বিষয়টি মামাকে জানান আল আমিন। মামা নরওয়ে থেকে তাঁর বৃত্তির অর্থ থেকে একটি অংশ পাঠিয়ে দেন। সেই অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি বেঞ্চ, একটি ব্ল্যাকবোর্ড ও কিছু বই-খাতা কেনেন আল আমিন। চালিয়ে যান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর কাজ।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: হাফিজুর রহমানের এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০০৮ সালে গঠিত হয় ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’ (এডুকেশন ফর ডিপ্রাইভ স্টুডেন্ট), সংক্ষেপে ইডিএস। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন হাফিজুরের বৃত্তি থেকে পাঠানো অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে নরওয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পান হাফিজুর। তাঁর বেতন থেকে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা করে পাঠানো শুরু করেন। ওই বছর প্রতিষ্ঠানের জন্য আট লাখ টাকা দিয়ে নগরের যোগীপোল এলাকায় একটি একতলা ভবন কেনা হয়। পরের বছর ওই ভবনে পড়ানোর কাজ শুরু করেন আল আমিন। শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমে পড়ানো শুরু করেন।
শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ায় ওই ভবনেও জায়গা হচ্ছিল না। তাই ভবনের পাশের গোলপাতার ছাউনির একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়। এখানে সকাল ও বিকেলে পালা করে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ২০০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চলছে।
কিন্তু শিক্ষার্থী আরও বাড়তে থাকায় সোনালী জুটমিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অ্যাজাক্স জুটমিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই পালায় আরও ২০০ শিক্ষার্থীকে পড়ানো হচ্ছে।
সাড়া: নগরের মহেশ্বরপাশা, কার্তিককুল, তেলিগাতি, খানাবাড়ী, জাবদিপুর, যোগীপোল, বণিকপাড়া, মানিকতলা, কালীবাড়ি, সেনপাড়া ও ফুলবাড়ী গেটসহ বিভিন্ন এলাকার হতদরিদ্র ও স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তানেরা এখানে পড়ছে। অভাবী পরিবারের যে শিশুরা ভিক্ষা, দিনমজুরি বা চুরিতে জড়িয়ে পড়েছিল, হাফিজুরের প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এখন তারা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিনোদন, খেলাধুলা ও বনভোজনেরও ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। ভালো ফলের জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।
এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা অনেকেই ভালো ফল করছে। চলতি বছর এখানে পড়াশোনা করেছেন এমন ১২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষা দেন। সবাই পাস করেছেন। একজন জিপিএ ৫ পেয়েছেন। যাঁদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তাঁরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংয়ের ফিও দিচ্ছেন হাফিজুর।
শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবক: আটজন শিক্ষককে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে। সঙ্গে রয়েছেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী। তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমে পড়াচ্ছেন। সঙ্গে আছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মতিউল ইসলাম ও খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক বিষ্ণু সরকার।
স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেলিম রেজা বলেন, ‘হাফিজুর রহমানের এমন মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে অংশীদার হতে পেরে আমি গর্বিত।’
ওদের কথা: নগরের ফুলবাড়ী গেটের হোটেল কর্মচারী আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে মারিয়া বেগম। তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। হাফিজুরের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয় তাকে। এখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। ‘হাফিজুর ভাই না হলে ক্লাস এইটে ওঠা হতো না।’ জানাল, মারিয়া।
ভ্যানচালক আবুল গাজীর মেয়ে জান্নাতুল আখতার। পঞ্চম শ্রেণীর পর সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছিল না। এখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। জান্নাতুল বলে, ‘হাফিজুর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে বিনা পয়সায় পড়ছি। এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছি।’
নরসুন্দর বিষ্ণুপদ সরকারের ছেলে গৌরাঙ্গ সরকার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। ছেলেকে ওই প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রসঙ্গ তুললে বিষ্ণুপদের উত্তর, ‘প্রাইভেট পড়াতে না পারায় ছেলে পড়াশোনায় ভালো করছিল না। ওখানে পাঠানোর পর ভালো করছে।’
তাঁরা যা বলেন: প্রায় শুরু থেকেই হাফিজুর রহমানের উদ্যোগের সঙ্গে আছেন আল আমিন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ‘মামার এই উদ্যোগে সহায়তা করতে পেরে আমি গর্বিত। তাঁর মতো মানুষ আমাদের সমাজের দৃষ্টান্ত।’ বলেন, আল আমিন।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান কে এম আজহারুল জানান, তিনি কয়েকবার ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটা ভালো উদ্যোগ। এতে উৎসাহ দিতে আমার বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওখানে স্বেচ্ছাশ্রমে ক্লাস নিতে উদ্বুদ্ধ করেছি। অনেকে ক্লাসও নিচ্ছে।’
মুঠোফোনে কথা হয় হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান তাঁর স্বপ্নের কথা। ‘এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করবে। দেশ ও জনগণ এগিয়ে যাবে। জানি কঠিন কাজ, তার পরও চেষ্টা থাকবে।’ বলে যান তিনি, ‘প্রতিষ্ঠানটি আমার প্রাণ। এটি আরও বড় করার ইচ্ছা আছে। আমার স্বপ্ন সেদিনই সার্থক হবে, যেদিন সুবিধাবঞ্চিত এই শিক্ষার্থীরা শিক্ষিত হয়ে সমাজে আলো জ্বালাবে

Friday, September 16, 2011

দীপ জ্বেলে যাই

পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে
ছবি: প্রথম আলো
ছেলে অসুস্থ। ওষুধ খাওয়াতে হবে। আশপাশে কেউ নেই যে সাহায্য নেবেন। গ্রামের নিরক্ষর মা ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। একপর্যায়ে ওষুধ মনে করে ঘরে থাকা কীটনাশক ছেলের মুখে তুলে দিলেন। যখন বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে।
মর্মান্তিক এ ঘটনা প্রতিবেশী এক তরুণের মনে নাড়া দেয়। ওই তরুণ ভাবেন, ওই মা যদি লিখতে-পড়তে পারতেন, তবে হয়তো এমন ভুল করতেন না। এসব মানুষকে শিক্ষার আলো দেওয়ার ব্রত নেন তিনি। সেই ব্রত থেকেই গ্রামে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। গৃহশিক্ষকতা করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যাত্রা শুরু সেই পাঠশালার, যেটি পরিচিতি পায় ‘জনির স্কুল’ নামে।
তরুণের নাম নজরুল ইসলাম জনি। পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে তাঁর বাড়ি। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। পড়াশোনা করেছেন এইচএসসি পর্যন্ত। এরপর ওই স্কুল নিয়েই ব্যস্ত।
শুরুর কথা: মন নাড়া দেওয়া ওই ঘটনাটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের। এ ছাড়া লেখাপড়া না জানায় গ্রামের সাধারণ মানুষের নানাভাবে প্রতারণার শিকার হওয়া, শিশু ও নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, মাদকের ছোবল তো আছেই। বিষয়টি ভাবায় জনিকে। তিনি চিন্তা করেন, শিক্ষাই এর সমাধান। এসব নিয়ে আলোচনা করেন সহপাঠী একই গ্রামের একরামুল হাসানের সঙ্গে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন পাঠশালা গড়বেন। দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেন জনির বাড়ির পাশের সুপারির বাগানে গ্রামের নিরক্ষরদের পড়ানো হবে।
জনি ও একরামুল তাঁদের ইচ্ছার কথা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানান। নিরক্ষর নারী-পুরুষকে পড়তে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নারীদের ঘর থেকে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে খোলা আকাশের নিচে শুরু হয় লেখাপড়া। প্রথমদিকে সেখানে পড়তে আসত মাত্র ১৮ থেকে ২০ জন। দুটি পালায় পড়ানো শুরু হয়। বিকেলে পড়েন নারীরা, রাতে পুুরুষেরা। জনির প্রাইভেট পড়ানোর টাকায় কেনা তিনটি হারিকেন ও পাঁচ লিটার কেরোসিন তেল দিয়ে শুরু হয় রাতের পড়া।
দিনের পালায় পড়ানো ভালোমতো চললেও রাতের পালায় সমস্যা হতো। কারণ, কেরোসিন কেনার খরচ কম নয়। একপর্যায়ে একরামুলের সহায়তা আর পান না জনি।
জনির হার না মানা মানসিকতা দেখে এগিয়ে আসেন গ্রামের দিনার চৌধুরী। দুজনে মিলে স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের বই, খাতা-কলম, চক-ডাস্টার, বসার চট, মোমবাতি-হারিকেনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করেন। তার পরও যেন এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না। জনির উদ্যোগের কথা জানতে পেরে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা এগিয়ে আসেন।
জনির বাড়ির উঠানে টিনের চালা করে বানানো হয় পাঠশালা। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে তিন পালায় চলছে পাঠদান। দুপুরের পালায় পড়ানো হয় শিশুদের। বর্তমানে এ পালায় সুবিধাবঞ্চিত ৩৬টি শিশু পড়াশোনা করছে। বিকেলের পালায় পড়ছেন ৩০ জন নারী। আর রাতের পালায় পড়েন ২৫ থেকে ৩০ জন পুরুষ। কাউকে বেতন দিতে হয় না।
পাঠশালার শিক্ষক বলতে জনি নিজেই। শিশুরা ছয় মাস এখানে পড়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়। বয়সী নারী-পুরুষেরাও ছয় মাস এখানে পড়েন।
আরও কিছু: জনির পাঠশালায় লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রথা রোধ, ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি, মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বিপদে-আপদে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করা, সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা, বাড়িতে ছোটখাটো খামার তৈরি, শাকসবজির বাগান, হাঁস-মুরগি-কবুতর, গরু-ছাগল পালনেও উদ্বুদ্ধ করা হয়।
একদিন পাঠশালায়: জনির পাঠশালায় ঢুকে দেখা গেল, দুই সারিতে বসে শিশুশিক্ষার্থীরা বই নিয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার জানাল, সে আগে স্কুলে যেতে পারেনি। এখন জনির স্কুলে এসে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক সব বিষয় পড়ছে।
কথা হলো বিকেলের পালায় পড়তে আসা গৃহবধূ আছিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি বললেন, পড়তে না পারায় ওষুধ ভেবে ছেলেকে কীটনাশক খাইয়েছিলেন। সেই যন্ত্রণা এখনো ভোগ করছেন। এ স্কুলে এসে এখন পড়া ও লেখা দুটোই পারেন। ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে পারিনি। কম বয়সেই বিয়ে হয়। পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল। এখন এই স্কুলে এসে পড়াশোনা করছি।’ বলছিলেন গৃহবধূ মমতাজ বেগম। গৃহবধূ সহিদা বেগম বললেন, প্রথম প্রথম পড়তে আসতে লজ্জা লাগত। কিন্তু এখন ভালোই লাগছে।
সারা দিন খাটা-খাটুনির পর রাতের পালায় পড়তে আসেন মনজুর রহমান (৪০)। ‘পড়াশোনা না জানলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এখন পড়তে ও লিখতে পারি।’ সরল উত্তর মনজুরের।
অন্যদের কথা: জনির সহযোগী দিনার বলেন, ‘জনির মহ ৎ উদ্যোগ আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। তাই ওঁর সঙ্গে যোগ দিই। এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পেরে ভালোই লাগছে।’
জনির বাবা আবদুস ছাত্তার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আবদুস ছাত্তার বলেন, এ কাজকে প্রথমদিকে ছেলের পাগলামি মনে হতো। এখন সবাই ছেলের প্রশংসা করে। খুব গর্ব হয়।
পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মো. মজাহারুল হক প্রধান এ উদ্যোগের প্রশংসা করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। একই কথা বলেন পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলাম। তিনি স্কুলের উন্নয়নে সহযোগিতাও করেছেন।
জনির ইচ্ছা: এরই মধ্যে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন জনি। সাক্ষরতাদানে বিশেষ অবদান রাখায় ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে জেলা প্রশাসন জনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্মাননা সনদ’ দিয়েছে।
জনি বলেন, ‘ইচ্ছা আছে পাঠশালার জন্য একটি পাকা ঘর তৈরি করার। সেখানে বিদ্যু ৎ, পানীয় জল এবং শৌচাগার থাকবে। এ ছাড়া সুযোগ পেলে এ এলাকার প্রতিটি গ্রামে এমন একটি করে পাঠশালা গড়ে তুলব।

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons