Total Pageviews

Friday, September 16, 2011

দীপ জ্বেলে যাই

পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে
ছবি: প্রথম আলো
ছেলে অসুস্থ। ওষুধ খাওয়াতে হবে। আশপাশে কেউ নেই যে সাহায্য নেবেন। গ্রামের নিরক্ষর মা ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। একপর্যায়ে ওষুধ মনে করে ঘরে থাকা কীটনাশক ছেলের মুখে তুলে দিলেন। যখন বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে।
মর্মান্তিক এ ঘটনা প্রতিবেশী এক তরুণের মনে নাড়া দেয়। ওই তরুণ ভাবেন, ওই মা যদি লিখতে-পড়তে পারতেন, তবে হয়তো এমন ভুল করতেন না। এসব মানুষকে শিক্ষার আলো দেওয়ার ব্রত নেন তিনি। সেই ব্রত থেকেই গ্রামে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। গৃহশিক্ষকতা করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যাত্রা শুরু সেই পাঠশালার, যেটি পরিচিতি পায় ‘জনির স্কুল’ নামে।
তরুণের নাম নজরুল ইসলাম জনি। পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে তাঁর বাড়ি। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। পড়াশোনা করেছেন এইচএসসি পর্যন্ত। এরপর ওই স্কুল নিয়েই ব্যস্ত।
শুরুর কথা: মন নাড়া দেওয়া ওই ঘটনাটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের। এ ছাড়া লেখাপড়া না জানায় গ্রামের সাধারণ মানুষের নানাভাবে প্রতারণার শিকার হওয়া, শিশু ও নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, মাদকের ছোবল তো আছেই। বিষয়টি ভাবায় জনিকে। তিনি চিন্তা করেন, শিক্ষাই এর সমাধান। এসব নিয়ে আলোচনা করেন সহপাঠী একই গ্রামের একরামুল হাসানের সঙ্গে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন পাঠশালা গড়বেন। দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেন জনির বাড়ির পাশের সুপারির বাগানে গ্রামের নিরক্ষরদের পড়ানো হবে।
জনি ও একরামুল তাঁদের ইচ্ছার কথা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানান। নিরক্ষর নারী-পুরুষকে পড়তে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নারীদের ঘর থেকে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে খোলা আকাশের নিচে শুরু হয় লেখাপড়া। প্রথমদিকে সেখানে পড়তে আসত মাত্র ১৮ থেকে ২০ জন। দুটি পালায় পড়ানো শুরু হয়। বিকেলে পড়েন নারীরা, রাতে পুুরুষেরা। জনির প্রাইভেট পড়ানোর টাকায় কেনা তিনটি হারিকেন ও পাঁচ লিটার কেরোসিন তেল দিয়ে শুরু হয় রাতের পড়া।
দিনের পালায় পড়ানো ভালোমতো চললেও রাতের পালায় সমস্যা হতো। কারণ, কেরোসিন কেনার খরচ কম নয়। একপর্যায়ে একরামুলের সহায়তা আর পান না জনি।
জনির হার না মানা মানসিকতা দেখে এগিয়ে আসেন গ্রামের দিনার চৌধুরী। দুজনে মিলে স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের বই, খাতা-কলম, চক-ডাস্টার, বসার চট, মোমবাতি-হারিকেনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করেন। তার পরও যেন এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না। জনির উদ্যোগের কথা জানতে পেরে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা এগিয়ে আসেন।
জনির বাড়ির উঠানে টিনের চালা করে বানানো হয় পাঠশালা। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে তিন পালায় চলছে পাঠদান। দুপুরের পালায় পড়ানো হয় শিশুদের। বর্তমানে এ পালায় সুবিধাবঞ্চিত ৩৬টি শিশু পড়াশোনা করছে। বিকেলের পালায় পড়ছেন ৩০ জন নারী। আর রাতের পালায় পড়েন ২৫ থেকে ৩০ জন পুরুষ। কাউকে বেতন দিতে হয় না।
পাঠশালার শিক্ষক বলতে জনি নিজেই। শিশুরা ছয় মাস এখানে পড়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়। বয়সী নারী-পুরুষেরাও ছয় মাস এখানে পড়েন।
আরও কিছু: জনির পাঠশালায় লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রথা রোধ, ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি, মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বিপদে-আপদে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করা, সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা, বাড়িতে ছোটখাটো খামার তৈরি, শাকসবজির বাগান, হাঁস-মুরগি-কবুতর, গরু-ছাগল পালনেও উদ্বুদ্ধ করা হয়।
একদিন পাঠশালায়: জনির পাঠশালায় ঢুকে দেখা গেল, দুই সারিতে বসে শিশুশিক্ষার্থীরা বই নিয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার জানাল, সে আগে স্কুলে যেতে পারেনি। এখন জনির স্কুলে এসে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক সব বিষয় পড়ছে।
কথা হলো বিকেলের পালায় পড়তে আসা গৃহবধূ আছিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি বললেন, পড়তে না পারায় ওষুধ ভেবে ছেলেকে কীটনাশক খাইয়েছিলেন। সেই যন্ত্রণা এখনো ভোগ করছেন। এ স্কুলে এসে এখন পড়া ও লেখা দুটোই পারেন। ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে পারিনি। কম বয়সেই বিয়ে হয়। পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল। এখন এই স্কুলে এসে পড়াশোনা করছি।’ বলছিলেন গৃহবধূ মমতাজ বেগম। গৃহবধূ সহিদা বেগম বললেন, প্রথম প্রথম পড়তে আসতে লজ্জা লাগত। কিন্তু এখন ভালোই লাগছে।
সারা দিন খাটা-খাটুনির পর রাতের পালায় পড়তে আসেন মনজুর রহমান (৪০)। ‘পড়াশোনা না জানলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এখন পড়তে ও লিখতে পারি।’ সরল উত্তর মনজুরের।
অন্যদের কথা: জনির সহযোগী দিনার বলেন, ‘জনির মহ ৎ উদ্যোগ আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। তাই ওঁর সঙ্গে যোগ দিই। এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পেরে ভালোই লাগছে।’
জনির বাবা আবদুস ছাত্তার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আবদুস ছাত্তার বলেন, এ কাজকে প্রথমদিকে ছেলের পাগলামি মনে হতো। এখন সবাই ছেলের প্রশংসা করে। খুব গর্ব হয়।
পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মো. মজাহারুল হক প্রধান এ উদ্যোগের প্রশংসা করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। একই কথা বলেন পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলাম। তিনি স্কুলের উন্নয়নে সহযোগিতাও করেছেন।
জনির ইচ্ছা: এরই মধ্যে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন জনি। সাক্ষরতাদানে বিশেষ অবদান রাখায় ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে জেলা প্রশাসন জনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্মাননা সনদ’ দিয়েছে।
জনি বলেন, ‘ইচ্ছা আছে পাঠশালার জন্য একটি পাকা ঘর তৈরি করার। সেখানে বিদ্যু ৎ, পানীয় জল এবং শৌচাগার থাকবে। এ ছাড়া সুযোগ পেলে এ এলাকার প্রতিটি গ্রামে এমন একটি করে পাঠশালা গড়ে তুলব।

Wednesday, September 14, 2011

 কিলিমানজারো জয় করলেন মুসা ইব্রাহীম ও নিয়াজ

কিলিমানজারোর উহুরু পিক-এ বাংলাদেশের পতাকা হাতে (বাঁ থেকে) নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও মুসা ইব্রাহীম: কিলিমানজারোর উহুরু পিক-এ বাংলাদেশের পতাকা হাতে (বাঁ থেকে) নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও মুসা ইব্রাহীম: ছবিটি ই-মেইলে পাঠিয়েছেন মুসা ইব্রাহীম
বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী পর্বতারোহী মুসা ইব্রাহীম এবার জয় করলেন আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট কিলিমানজারো। নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশের (এনএসিবি) এই অভিযানে মুসার সঙ্গে এ পর্বতচূড়া জয় করেছেন নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী। কিলিমানজারো জয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ চূড়া জয়ের (সেভেন সামিট) দ্বিতীয় ধাপ অতিক্রম করল এনএসিবি।
মুসা ইব্রাহীম ই-মেইল বার্তায় জানান, ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সকাল সাতটা ৪৮ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১০টা ৪৮ মিনিট) কিলিমানজারো জয় করেন দুই বাংলাদেশি পর্বতারোহী। তানজানিয়ায় অবস্থিত ১৯ হাজার ৩৪০ ফুট উঁচু আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতে এদিন এনএসিবির সাধারণ সম্পাদক মুসা ইব্রাহীম ও সদস্য এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। এনএসিবির পক্ষ থেকে এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
জানা যায়, এই অভিযানে কিলিমানজারো পর্বতের মাচামি রুট অনুসরণ করা হয়। তবে এই অভিযানের অপর সদস্য ৫৭ বছর বয়সী এম এ সাত্তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১১ সেপ্টেম্বর ১৩ হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বারানকো ক্যাম্প থেকে মোশি শহরে ফিরে আসেন।
এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর এনএসিবির সদস্যরা ছয় হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মাচামি গেট থেকে কিলিমানজারো পর্বতাভিযান শুরু করেছিলেন। এরপর মাচামি ক্যাম্প, শিরা ক্যাম্প ও বারানকো ক্যাম্প হয়ে তাঁরা ১১ সেপ্টেম্বর ১৫ হাজার ৮৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সর্বশেষ ক্যাম্প বারাফুতে পৌঁছান। এখান থেকে অভিযাত্রীরা ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত সোয়া একটায় পর্বতচূড়া জয়ের জন্য যাত্রা (সামিট পুশ) শুরু করেন। ছয় ঘণ্টা ৩৩ মিনিট আরোহণ শেষে তাঁরা কিলিমানজারোর সর্বোচ্চ পয়েন্ট ১৯ হাজার ৩৪০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট উহুরু পিকে পৌঁছে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। একই দিন তাঁরা ১০ হাজার ১৬৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মেওকা ক্যাম্পে নেমে আসেন।
এনএসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গতকাল মেওকা গেটে কিলিমানজারো ন্যাশনাল পার্ক ও তানজানিয়া ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষ তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে উহুরু পিক আরোহণ করার সনদ দেন। ২০ সেপ্টেম্বর তাঁরা দেশে ফিরবেন।
সামিট গ্রুপ, এমিরেটস এয়ারলাইনস, শাহ্ সিমেন্ট, জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড ও ডেইলি স্টার এনএসিবির সেভেন সামিট অভিযানের কিলিমানজারো পর্বতাভিযান পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
কিলিমানজারো অভিযানের প্রাক্কালে মুসা ইব্রাহীমকে বাংলাদেশের পর্যটন দূত হিসেবে ঘোষণা দেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদের। মুসা ইব্রাহীম ২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করে সেভেন সামিটের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেন।

Friday, September 2, 2011

মাহামুদা এখন সবার প্রিয়

হাতপাখা তৈরি করতে ব্যস্ত তারাগঞ্জ উপজেলার পাশারী পাড়া গ্রামের মাহমুদাসহ গ্রামের অন্য নারীরা হাতপাখা তৈরি করতে ব্যস্ত তারাগঞ্জ উপজেলার পাশারী পাড়া গ্রামের মাহমুদাসহ গ্রামের অন্য নারীরা
ছবি: প্রথম আলো
চতুর্থ শ্রেণীতে উঠে অভাবের কারণে স্কুল ছেড়েছিল মেয়েটি। ১৪ বছর বয়সে বাধ্য হয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে বসতে। দিনমজুর স্বামীর সংসারে এসেও অভাব পিছু ছাড়েনি। জোটেনি ঠিকমতো দুইবেলা ভাতও। এরই মধ্যে মেয়েটি স্বপ্ন দেখেছে নিজে কিছু করার। একসময় শুরু করে হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা। আসে সাফল্য। অভাবের সংসারে আসে সচ্ছলতা।
এই সংগ্রামী মানুষটির নাম মাহামুদা বেগম। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের পাশারীপাড়া গ্রামে তাঁর বাড়ি।
হাতপাখা তৈরি করে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাঁর দেখানো পথেই ওই গ্রামের অন্তত তিন শতাধিক গৃহবধূ দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। তালপাখা তৈরি করে বেশ কাটছে তাঁদের দিন।
মাহামুদা এখন গ্রামের সবার প্রিয়। তাঁর স্বামীর কথা, ‘অর জন্যে হামারা এলা সমাজোত মাথা উঁচা করি চলবার পারি।’
সংগ্রাম: তারাগঞ্জের হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের নদীরপার গ্রামে ১৯৬৫ সালে দরিদ্র পরিবারে জন্ম মাহামুদার। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। বাবার অভাবের সংসার। ১৯৭৯ সালে বাবা মোবারক হোসেন কিশোরী মেয়েকে তুলে দেন পাশারীপাড়া গ্রামের খোয়াজ উদ্দিনের হাতে।
স্বামীর বাড়িতে এসেও সুখ হয়নি মাহামুদার। প্রায়ই অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হতো। কিন্তু এত অভাব, এত দরিদ্র তিনি মেনে নিতে পারেন না। তাঁর কিশোরী মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। স্বপ্ন দেখেন নিজে কিছু করার। মুড়ি বানিয়ে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন। এতে কিছু আয় হয়। এক বছরের লাভের টাকায় কেনেন চারটি ছাগল। তাঁর নতুন জীবনের গল্পটা এখান থেকে শুরু।
গল্পটা এ রকম: ১৯৯০ সালে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুরা গ্রামের হাতপাখা বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম পাশারীপাড়া গ্রামে পাখা নিয়ে আসেন। মাহামুদা তাঁর কাছ থেকে দুটি পাখা কেনেন। হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি এলে তিনি মাহামুদার বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নেন। সারা দিনে ঝড়-বৃষ্টি না থামায় তাঁকে রাত যাপন করতে দেন মাহামুদার শ্বশুর আফজাল হোসেন। রাতে খাওয়ার সময় নানা কথার ফাঁকে রফিকুল মাহামুদাকে পাখা তৈরির পরামর্শ দেন। পরের দিন পাখা বিক্রি শেষে বিকেলে রফিকুল তাঁর বাড়িতে মাহামুদা ও তাঁর শ্বশুরকে নিয়ে যান। রফিকুলের স্ত্রী মমতাজ খাতুন মাহামুদাকে দুই দিনে শিখিয়ে দেন পাখা তৈরির কলাকৌশল।
বাড়ি ফিরে মাহামুদা তাঁর স্বামীকে তালপাতা সংগ্রহ করতে বললে তিনি এনে দেন। দুই দিনে মাহামুদা তৈরি করেন ২৫টি পাখা। এ পাখা বেঁচে আয় হয় ৮০ টাকা। খুলে যায় মাহামুদার চোখ। স্বামী-স্ত্রী লেগে পড়েন পাখা তৈরির কাজে। ভালো মুনাফা হওয়ায় বদলাতে থাকে সংসারের মলিন চেহারা।
তাঁর উন্নতি দেখে প্রতিবেশী অন্য নারীরা পাখা তৈরির কৌশল শিখতে আসেন। মাহামুদা তাঁদের শিখিয়ে দেন।
পাশারীপাড়া গ্রামের তিন শতাধিক গৃহবধূ ছাড়াও দামোদরপুর, ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের শতাধিক নারী এখন পাখা তৈরি করে বেশ আয় করছেন।
মাহামুদা পাখা বিক্রির টাকায় এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। কিনেছেন আবাদি জমি। খড়ের ঘরের জায়গায় উঠেছে টিনের ঘর। বাড়িতে বসিয়েছেন নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। তিনটি গাভি, হাঁস-মুরগি ও ছাগল আছে। নলকূপের কিনারেই বানিয়েছেন ছোট্ট একটি পুকুর, তাতে চলছে হাঁস পালন ও মাছের চাষ। তাঁর দুই মেয়ে লেখাপড়া করছে। দুই ছেলে বিয়ের পর পাখার ব্যবসা করে আলাদাভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
মাহামুদার পথ ধরে: মাহামুদার পথ অনুসরণ করে যাঁরা সফল হয়েছেন, তাঁদের একজন লাইলী খাতুন। ১২ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। এখন প্রতি মাসে তাঁর গড়ে তিন হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
হাছিনা খাতুনের স্বামী মনোয়ার হোসেন জুয়া খেলতেন। হাছিনা সংসার চালাতেন ঝিয়ের কাজ করে। মাহামুদার পরামর্শে ১০ বছর আগে তিনি হাতপাখা তৈরি শুরু করেন। স্বামী জুয়া ছেড়ে এখন করেন পাখা বিক্রির ব্যবসা।
সোহাগী খাতুনের বিয়ে হয় ১৪ বছর বয়সে। ভূমিহীন স্বামীর আয়ে সংসার চলত না। তিন সন্তান নিয়ে প্রায়ই উপোস থাকতে হতো। এখন তাঁর পাখা তৈরির আয়ের টাকায় সংসার চলছে, স্বামীর আয় জমা থাকছে।
ওই পল্লিতে এক দিন: পাশারীপাড়া গ্রামের ৩০০টি পরিবারের কেউ পাখার কারিগর, কেউ ব্যবসায়ী। সম্প্রতি গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, কেউ পাখা বানাচ্ছে, কেউ তালপাতা পানিতে ভেজাচ্ছে। কেউ পাখার জন্য বাঁশের শলা কেটে রোদে শুকাতে দিচ্ছে। ঘরের কাজ সামলাতে সামলাতে, বিশ্রাম নিতে নিতে চলছে পাখা তৈরির কাজ।
মাহামুদার বাড়িতে দেখা গেল, তিনি পাখা বানাচ্ছেন। তাঁকে সহায়তা করছে দুই মেয়ে। গ্রামের অন্য ১৫-২০ জন নারীও তাঁর উঠানে বসে পাখা বানাচ্ছেন।
পাখার কারবার শুরু হয় চৈত্র মাস আসার আগেই। চলে কার্তিকের শুরু পর্যন্ত।
তৈরির কৌশল: ঘুরানি, পকেট, হরতন, মোড়া, একডান্ডা, ধাড়াইসহ বিভিন্ন ধরনের পাখা তৈরি করেন তাঁরা। পাখা তৈরিতে মূলত ব্যবহূত হয় তালপাতা, বাঁশ, খুদে পেরেক, সুই-সুতা ও রং। প্রথমে শুকানো তালপাতা চার-পাঁচ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। তালপাতা পানি থেকে তুলে বাঁশের কঞ্চির কলম লাগিয়ে রোদে শুকাতে হয়। এরপর রাতে খোলা আকাশের নিচে রেখে সকালে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে তালপাতার চারদিকে গোলাকার করা হয়। সবশেষে পাখায় সুই-সুতার কাজ করা হয়। এরপর রং দিয়ে চোখ জুড়ানো নানা নকশা করা হয়।
পাখা তৈরির কারিগর আসমা খাতুন জানান, একটি তালপাতা তাঁরা নয়-১০ টাকায় গাছের মালিকদের কাছ থেকে কেনেন। একটি তালপাতা দিয়ে ১০ থেকে ১৪টি পর্যন্ত পাখা বানানো যায়। পাইকারেরা গ্রামে এসে পাখা কিনে নিয়ে যায়। এ পাখা চলে যায় দিনাজপুর, রাজশাহী, নীলফামারী, গাইবান্ধা। ঢাকায়ও যায়। প্রতিটি পাখা তৈরিতে খরচ পড়ে দুই থেকে তিন টাকা। বিক্রি হয় আট থেকে ১০ টাকা। একজন কারিগর দিনে ৩০-৩৫টি পাখা তৈরি করতে পারেন।
পরিবারের কথা: মাহামুদাকে নিয়ে গর্বিত তাঁর স্বামী খোয়াজ উদ্দিন। আলাপকালে বললেন, ‘বাহে, আগোত সমাজোত হামার কোনো দাম আছিল না। সোবায় মোক ডাকতো কিষান খাটা কয়া। অভাবের জন্যে মাহামুদার সাথে মোর প্রত্যেক দিন ঝগড়াও নাগছিলো। আশ্বিন-কার্তিক মাসতো থাকপার নাগছিলো সেক আলু উসা (মিষ্টি আলু সেদ্ধ) খায়া। মাহামুদাই সংসারের চাকা ঘুরি দিছে। অর জন্যে হামরা এলা সমাজোত মাথা উঁচা করি চলবার পারি।’
মাহামুদার ছেলে রবিউল ইসলামেরও একই কথা, ‘আগতো গ্রামের ছেলেমেয়েরা হামাক কিষান খাটার বেটা কয়া গালি দিত। এলা ওমরা ফির ডাকি কথা কয়, আদরও করে।’
তাঁরা যা বলেন: সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মহিলা সদস্য রেহেনা আক্তার বলেন, আগে ওই গ্রামের মানুষের কষ্টের শেষ ছিল না। তারা সরকারি ত্রাণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে ধরনা দিত। গ্রামের নারীরাও তাঁদের স্বামীর হাতে নানা রকম নির্যাতনের শিকার হতেন। এখন গ্রামটির চিত্র বদলে গেছে।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুন নবী বলেন, ‘পাশারীপাড়া গ্রামের নারীরা পরিশ্রমী। তাঁরা সংসারের অন্য কাজের ফাঁকে হাতপাখা তৈরি করে যেভাবে বাড়তি আয় করছেন, অন্য এলাকার নারীরাও তাঁদের অনুসরণ করে অনুপ্রেরণা পেতে পারেন।’
রহিদুল মিয়া, তারাগঞ্জ, রংপুর Prothom-alo

Sunday, August 14, 2011

“পাঁচ তরুণের ব্লগিং সাফল্য” গাথা গল্প নিয়ে কালের কন্ঠ পত্রিকায় রিপোর্ট


গত ৩ আগষ্ট ২০১১ তারিখে কালের কন্ঠ পত্রিকার টেক বিশ্ব পাতায় “পাঁচ তরুণের ব্লগিং সাফল্য” শিরোনামে রিপোর্ট টি তৈরী হয়েছিল। যেখানে কিছু তরুন ব্লগার এবং তাদের গড়া অনলাইন সাপোর্টের সাফল্য সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে এইভাবেঃ
তেজগাঁও কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদুর রশীদের ইন্টারনেটে হাতেখড়ি ২০০৫ সালে। ইন্টারনেটে সার্চ আর ওয়েবসাইট ঘুরেফিরে বেড়ানোই ছিল তখন তাঁর একমাত্র কাজ। এভাবেই কেটে যায় প্রায় তিনটি বছর। ২০০৮ সালে তাঁর বড় ভাই জহিরুল ইসলাম মামুনের কাছ থেকে শেখেন নতুন এক মন্ত্র_ব্লগিং! অনেকে শখের বসে ব্লগিং শেখেন, ব্লগিং করেন। তবে মামুন শিখেছিলেন পেশাগতভাবে। ‘আমার মূল লক্ষ্য ছিল ব্যতিক্রম কিছু করা, ব্লগিংয়ে যুক্ত হওয়ার পর পরই অনেক ভালো লেগে যায় বিষয়টি। এরপর এটিকে পেশা হিসেবে কিভাবে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ পাই বড় ভাইয়ের কাছ থেকে।’ ব্লগিং ক্যারিয়ারে আসার শুরুটা এভাবেই বর্ণনা করেন মাসুদ। ব্লগিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে দুই বছরের মাথায়ই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন এ তরুণ। গত মাসে ব্লগ লিখে আয় করেছেন প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা (এক হাজার ৯০০ ডলার)। তবে নিজের এ সাফল্যে থেমে থাকেননি মাসুদ। একই কলেজের সহপাঠী তাহের চৌধুরী সুমনকেও উৎসাহ দিয়েছেন ব্লগিংয়ে, হাতে-কলমে শিখিয়েছেন অনেক কিছু। সুমনের শুরুটা একেবারে গোড়া থেকেই হয়েছিল। ২০০৯ সালের শেষ দিকে তাঁর প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ হয়। ওয়েব সার্ফিংয়েও তখন অনেকটাই কাঁচা ছিলেন তিনি। ২০১০ সালের প্রথম দিকে বন্ধু মাসুদের হাত ধরে তাঁরও শুরু হয় ব্লগিং ক্যারিয়ার। অল্প সময়ে তিনিও পেয়েছেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য। আর মাসুদুরকে ব্লগিংয়ে যিনি হাতেখড়ি দিয়েছিলেন, সেই জহিরুল ইসলাম মামুনও এ সময়ের মধ্যে অন্যদের চেয়ে বেশ এগিয়ে গেছেন ব্লগিংয়ে। এই দলের তত্ত্বাবধানেই স্বল্প সময়ে সাফল্য পান আরো দুই তরুণ_দিপু শিকদার ও মাসুদুর রহমান। ইন্টারনেটে নিজ নিজ বিষয়ে এখন সবাই প্রায় প্রতিষ্ঠিত ব্লগার, তাঁদের মাসিক আয়ও বেশ উৎসাহজনক।
সমস্যা, তবুও!
বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ওয়েবসাইটে লেখালেখি করাকেই মূলত ব্লগিং বলা হয়ে থাকে। আর এসব ওয়েবসাইটে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর সেখানে বিজ্ঞাপন বসিয়ে আয় করতে পারেন ব্লগাররা। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য সবচেয়ে ভালো প্ল্যাটফর্ম হলো, সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগলের ‘গুগল অ্যাডসেন্স’। এ পাঁচ তরুণও ব্লগিং থেকে আয়ের জন্য গুগল অ্যাডসেন্সই বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে সফল ব্লগার হিসেবে নিজেদের পরিচিত করলেও এ সফলতা এক দিনে আসেনি তাঁদের। অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন শুরুর দিকে। মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ব্লগিং শেখার জন্য আমাদের দেশে তখন তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তাই প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাই পাইনি ব্লগিং বিষয়ে। কাজ করতে গিয়েও অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়েছি। এমনকি ইন্টারনেটে কাজ করার জন্য যে ইন্টারনেট গতি দরকার, সেটিও পাইনি। একটি ব্লগ পোস্ট হয়তো লিখতে বসছি, অমনি লুকোচরি খেলছে বিদ্যুৎ।’ তাহের চৌধুরী সুমন বলেন, ‘টাকা আয় করে যে দেশে আনব, সেটির জন্যও নানা প্রতিবন্ধকতা পোহাতে হচ্ছে আমাদের। পেপালের সুবিধা না থাকায় অনেক কাজের মাধ্যমেই আমরা টাকা আয় করতে পারছি না।’ এমন নানা সমস্যার কথা জানান মামুন, দিপু আর মাসুদুর রহমান। তবে শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁরা উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পেঁৗছাতে পেরেছেন, নিজেরা যেমন ছাত্রাবস্থায়ই স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি দেশের জন্যও প্রতি মাসে নিয়ে আসছেন হাজার হাজার ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা। আর তাই ফ্রিল্যান্সারদের অর্থ লেনদেন সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে দাবি জানাতেই পারেন তাঁরা।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
ব্লগিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন যেকোনো উদ্যমী সৃজনশীল তরুণ। ইন্টারনেটের বিশাল এ প্ল্যাটফর্মটি সবার জন্যই উন্মুক্ত। আর ব্লগিং থেকে আয়ের পরিমাণও তুলনামূলক অনেক বেশি। যাঁদের অনলাইনে কাজ করার যোগ্যতা, ধৈর্য, মননশীলতা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রয়েছে, তাঁরাই পেশা গড়তে পারেন ব্লগিংয়ে। নতুন যাঁরা ব্লগিংয়ে আসতে চান, তাঁদের জন্য পরামর্শ কী_এ প্রশ্নের উত্তরে জহিরুল ইসলাম মামুন জানান, ইন্টারনেটে বিভিন্ন বিষয়ে আর্টিকেল লেখা, মতামত প্রকাশ করা আর অন্য ওয়েবসাইটের সঙ্গে নিজ ওয়েবসাইটের সংযোগ স্থাপনই ব্লগিংয়ের মূলমন্ত্র। তবে যাঁরা খুব অল্প সময়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন, তাঁদের জন্য ব্লগিং নয়, একটু সময় নিয়ে এ ক্ষেত্রে আসতে হবে। লেগে থাকতে পারলে সাফল্য আসবেই। দিপু শিকদার জানান, পড়ালেখা বা চাকরির পাশাপাশি যে কেউ এ পেশাকে ‘পার্টটাইম’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আর ভালোভাবে সাফল্য লাভ করার পর ফুলটাইম ব্লগার হিসেবেও শুরু করতে পারেন ব্লগিং। এ ক্ষেত্রে রয়েছে কাজের বিশাল সম্ভাবনা।
পাঁচ তরুণের ‘অনলাইন সাপোর্ট’
ব্লগিংয়ে নিজেরা সাফল্য লাভ করায় নতুন ব্লগারদের সাহায্য করতেও উদ্যোগ নিয়েছেন এ পাঁচ তরুণ। তাঁরা এখন নতুনদের ব্লগিংয়ের মাধ্যমে আয়ের বিষয়গুলোও শেখানো শুরু করেছেন। এ জন্য গঠন করেছেন ‘অনলাইন সাপোর্ট’ নামের একটি ব্লগিং ক্যারিয়ার সহায়তা প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে তাহের চৌধুরী সুমন বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক বেকার তরুণ-তরুণী রয়েছে, যারা ব্লগিংয়ের মাধ্যমে টাকা আয় করতে পারে। তাদের সহায়তা করার লক্ষ্যেই বর্তমানে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে আমাদের অনলাইন সাপোর্টে ওয়েব ডিজাইন-ডেভেলপমেন্ট এবং অ্যাডভান্স সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন কোর্স চালু রয়েছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ডেমরায় রয়েছে অনলাইন সাপোর্টের অফিস। তবে অফিসে শেখানোর পাশাপাশি অনলাইনেও তাঁরা নতুনদের ব্লগিং এবং আউটসোর্সিং বিষয়ে তথ্য সহায়তা করছেন। আর এ জন্য তাঁরা www.earntricks.com ঠিকানার একটি বাংলা কমিউনিটি ব্লগও পরিচালনা করছেন।


Sunday, August 7, 2011

তাহমিমার উপন্যাস দ্য গুড মুসলিম


নতুন বই ‘দ্য গুড মুসলিম’ হাতে তাহমিমা আনাম
নতুন বই ‘দ্য গুড মুসলিম’ হাতে তাহমিমা আনাম
প্রথম আলো
সুন্দর নীল শাড়ি পরে হাস্যোজ্জ্বল মুখে এলেন তাহমিমা আনাম, লন্ডনবাসী বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক, যাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস এ গোল্ডেন এজ ‘শ্রেষ্ঠ প্রথম বই’ হিসেবে ২০০৭ সালে কমনওয়েলথ লেখক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল। গতকাল বিকেলে প্রথম আলোর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসে তিনি জানালেন, তাঁর পরিকল্পিত উপন্যাসত্রয়ীর দ্বিতীয়টি সম্প্রতি বের হয়েছে। দ্য গুড মুসলিম নামের বইটি প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি ও ভারত থেকে; এবং তিনি উপন্যাসটির ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ বাংলাদেশে প্রকাশের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
তাহমিমা আনাম ভারতের মুম্বাই, দিল্লি ও কলকাতায় তাঁর নতুন বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে অংশগ্রহণ শেষে বাংলাদেশে এসেছেন। তাঁর প্রথম বই এ গোল্ডেন এজ (সোনাঝরা দিন) বাংলাসহ ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক বাঙালি পরিবারের সংগ্রামের কাহিনি নিয়ে রচিত, কমনওয়েলথ লেখক পুরস্কারে ভূষিত উপন্যাসটি দেশে-বিদেশে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল। বইটির যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ও যুক্তরাষ্ট্রে ২০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল।
দ্য গুড মুসলিম সম্পর্কেও তাহমিমা আনাম নিজের আশাবাদ ব্যক্ত করে জানালেন, বইটির বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের জীবন, যখন এ গোল্ডেন এজ-এর দুই পাত্রপাত্রী মায়া ও সোহেলের পথ দুটি ভিন্ন দিকে বাঁক নিয়েছে। মায়া মানবসেবার পথ বেছে নেয়, আর সোহেল আলিঙ্গন করে ধর্মকে, ছেলেকে পাঠায় মাদ্রাসায়। তাহলে কে ভালো মুসলমান? ঔপন্যাসিক তাহমিমা আনাম এই প্রশ্নটি খোলা রেখেছেন পাঠকদের নিজস্ব বিবেচনার জন্য। কথাশিল্পী হিসেবে তিনি মনে করেন, প্রশ্ন তোলাই তাঁর কাজ, কোনো উত্তর বা রায় চাপিয়ে দেওয়া নয়। দ্য গুড মুসলিম উপন্যাসে তাহমিমা আনাম আশির দশকের বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে ধর্মীয় প্রভাব বেড়ে ওঠার ছবি এঁকেছেন; একই সমাজে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবোধ ও ধর্মীয় অধ্যাত্মবোধের পাশাপাশি অবস্থানের গল্প বলেছেন।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী তাহমিমা আনাম যশস্বী লেখক-বুদ্ধিজীবী আবুল মনসুর আহমদের পৌত্রী, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের মেয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রয়্যাল হলওয়ে থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তাহমিমা আনাম উপন্যাস লেখার পাশাপাশি লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায়ও লেখালেখি করেন। দ্য গুড মুসলিম উপন্যাসটি ইংরেজি ও বাংলায় বাংলাদেশে প্রকাশের উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি জানালেন, এ বিষয়ে প্রথমা প্রকাশনের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চলছে।
গতকাল বিকেলে প্রথম আলোর কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক মতিউর রহমান, উপসম্পাদক ও সাহিত্যিক আনিসুল হক, সহযোগী সম্পাদক ও কবি সোহরাব হাসান, প্রথমা প্রকাশনের জাফর আহমদ, প্রথম আলোর শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকীর দায়িত্ব পালনকারী সহকারী সম্পাদক আলীম আজিজ প্রমুখ।
সূত্র প্রথম আলো

Thursday, July 28, 2011

মানুষ সরওয়ার

সরওয়ার আলম সরওয়ার আলম
রিকশায় উঠতেই টের পাই, চালক অন্য মানুষ। আচার-আচরণ, কথাবার্তা—সবই অন্য রকম। কৌতূহল নিয়ে নাম-পরিচয় জানতে চাই। মুচকি হেসে জবাব আসে, ‘সরওয়ার, সরওয়ার আলম; বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ।’
পথ চলতে চলতে কয়েকটি পারিবারিক ছবি দেখছিলাম। হঠাৎ রিকশাচালক সরওয়ার পেছনে ফিরে একনজর ছবির দিকে তাকান। কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর তাঁর ঝোড়ো মন্তব্য, ‘ছবির কম্পোজিশন ভালো না।’
অবাক হয়ে ভাবি, রিকশাচালক এই ‘কম্পোজিশন’ শব্দ জানল কী করে! বিস্ময় জাগে মনে। তারপর চলতে চলতে গল্প হয় সরওয়ারের সঙ্গে।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সরওয়ার দ্বিতীয়। ময়মনসিংহের তারাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে পঞ্চম শ্রেণীর পড়ালেখা শেষ করেছেন। ১৯৯৭ সালে পেটের তাগিদে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় আসেন তিনি। প্রথমে শাকসবজির দোকানে কাজ করেছেন; পরে কুলিও খেটেছেন। ২০০৩ সাল থেকে রিকশা চালানো শুরু তাঁর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরওয়ার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল, কিন্তু সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ায় তা আর হয়নি। তাই বলে পড়ালেখা থেকে একেবারে দূরেও থাকিনি।’
সরওয়ারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রিকশা চালানোর পাশাপাশি ২০০৫ সালে ইউসেপের একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে আর পড়ালেখা হয়নি তাঁর। তবে জ্ঞান আহরণের তীব্র তৃষ্ণা থেকে নিজে নিজেই অনেক কিছু শিখছেন। নজরুলের বিভিন্ন কবিতা, ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস মা, অরুন্ধতী রায়ের দ্য গড অব স্মল থিংকস, লেভ তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প, উপন্যাসসহ অনেক কিছুই পড়েছেন তিনি। আর নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাসটা তো তাঁর বেশ পুরোনো। প্রিয় পত্রিকা প্রথম আলোর আদ্যোপান্ত তাঁর মুখস্থ। প্রথম আলোয় প্রকাশিত এবিএম মূসা, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আসিফ নজরুলের কলাম পড়ার চেষ্টা করেন তিনি।
‘কেন এই পড়া?’ জানতে চাই সরওয়ারের কাছে। একটু ভেবে গম্ভীর কণ্ঠে সরওয়ার বলেন, ‘কত কিছু শেখা যায়, জানা যায়। নিজেকে গড়া, ভাষা-জ্ঞান জানা, মানুষ হওয়া—এসবের জন্যই পড়ি। জ্ঞান-বুদ্ধির ভারসাম্য না থাকলে মানুষ হওয়া যায় না।’
শিক্ষার গুরুত্বটা বোঝেন বলেই অন্য ভাইবোনদের পড়ালেখায় নিয়মিত উৎসাহ দেন সরওয়ার। তাঁর বাকি পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে চারজনই পড়ালেখা করছেন। তবে নিজের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখাটা বেশিদূর এগোয়নি বলে স্বপ্ন দেখা থেমে নেই সরওয়ারের। গল্প বলতে বলতে হঠাৎ স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যান তিনি। গোধূলির আলো-আঁধারির মধ্যেও তাঁর চোখে-মুখে আলো খেলা করে। দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে সরওয়ার বলতে থাকেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গল্পের বই পড়তাম, ছবি আঁকতাম। এ পর্যন্ত ৫০টা কবিতা লিখেছি, গল্প আছে তিনটা। এখনো স্বপ্ন দেখি লেখক হব। আচ্ছা, এত কম পড়ালেখা নিয়ে কি লেখক হওয়া যায় না? নজরুল তো পড়ালেখা না করেও কত বড় কবি!’
কথা বলতে বলতে সরওয়ারের আরও অনেক সৃজনশীলতার সন্ধান মেলে। সাহিত্যের পাশাপাশি স্থাপত্যবিদ্যায়ও তাঁর আগ্রহ আছে ঢের। এক বছর ধরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষক ফেরদৌস হাবিব খানের কাছে তিনি এ বিষয়ে পাঠ নিচ্ছেন। স্থাপত্যবিদ্যার প্রাথমিক জ্ঞান এখন তাঁর ঠোঁটে ঠোঁটে। প্রশ্ন করি, ‘কী হবে এসব শিখে?’ সরওয়ারের সহজ জবাব, ‘নিজের জন্য একটা খড়ের ঘর বানালেও তাঁর নকশাটা আমার হাতেই হবে।’
সরওয়ার আলম সম্পর্কে ফেরদৌস হাবিব খান বলেন, ‘ও আসলে আমার ভালো বন্ধু। আমি আমার জ্ঞান ওর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। আবার ওর কাছ থেকেও আমি অনেক কিছু শিখি। সরওয়ার অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। জানার প্রতি তাঁর আগ্রহের তীব্রতা দেখে আমার অবাক লাগে। রিকশা চালিয়েও শেখার জন্য সে সময় দেয়। এটা সত্যিই বিরল।’
সরওয়ার জানান, একবেলা রিকশা চালিয়ে বাকি সময় জ্ঞান অর্জনের কাজে সময় দেন তিনি। এর মধ্যে সপ্তাহে তিন দিন সন্ধ্যার পর শেখেন স্থাপত্যবিদ্যা। আর অভিধান ঘেঁটে ইংরেজি শব্দ জানার চর্চাটাও করেন মাঝেমধ্যে। হাজার খানেক ইংরেজি শব্দ আছে তাঁর জ্ঞানভান্ডারে। যে কারও সঙ্গে ইংরেজিতে টুকটাক আলাপও করতে পারেন তিনি।
গন্তব্যস্থলের কাছাকাছি এসে সরওয়ারের কাছে জানতে চাই, ‘মানুষ হতে আর কত বাকি!’ সরওয়ারের মুখে লাজুক হাসি। ভেবেচিন্তে দার্শনিকের মতো জবাব দেন, ‘মানুষ হতে হলে আগে দরকার ভালো মানসিকতা। চেষ্টা করি মানুষ হতে, পারছি কিনা মানুষই জানে। মানুষ হওয়া কঠিন কাজ।’
সরওয়ারের কথা শুনে থমকে যাই। নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। আমি নিজে মানুষ হতে পেরেছি তো! সরওয়ারের মতো মানুষ। প্রথম আলো
সাইফুল সামিন
saiful.samin@yahoo.com

Sunday, July 10, 2011

ঢাকার প্রথম মুসলিম নারী চিত্রশিল্পী

  • ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত মেহের বানু খানমের আঁকা ছবি ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত মেহের বানু খানমের আঁকা ছবি
  • ছবি আঁকছেন শিল্পী মেহের বানু খানম ছবি আঁকছেন শিল্পী মেহের বানু খানম
1 2
মোসলেম ভারত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আফজালুল হক দুটি ছবি সংগ্রহ করেছেন ঢাকা থেকে। ছবি দুটি এঁকেছেন ঢাকার বিখ্যাত নবাব পরিবারের নওয়াবজাদি মেহের বানু খানম। পত্রিকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছবি দুটি ছাপবেন তিনি।
ছবি দুটির পরিচিতি লিখে দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। কবি ছবি দেখে মুগ্ধ। পরিচিতি না লিখে লিখলেন কবিতা। দুটি ছবির একটি তাঁর মনে যে ভাবের জন্ম দেয়, তারই ফসল ‘খেয়াপারের তরণী’ নামের বিখ্যাত কবিতাটি। কবি নজরুলের বন্ধু মুজফ্ফর আহমেদ লিখলেন, ‘এই কবিতাটিকে ঘিরে যে আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা একান্তভাবে বেগম সাহেবারই।’
একটি ছিল নদী পারাপাররত নৌকার ছবি এবং অন্যটি বিক্রমপুরের একটি গ্রামের দৃশ্য। যেহেতু নজরুল লিখলেন কবিতা, তাই ওই চিত্র দুটির পরিচিতি লেখার দায়িত্ব বর্তাল সেকালের বিখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ আলীর ওপর। বেগম সাহেবার দুটি চিত্র ও নজরুলের কবিতা এবং এমদাদ আলীর চিত্র-পরিচয় নিয়ে ১৯২০ সালের আগস্টে অর্থাৎ বাংলা ১৩২৭ সালের শ্রাবণ মাসে কলকাতায় মোসলেম ভারত-এর আলোচিত সংখ্যাটি বের হলো। নদী পারাপাররত ছবিটি রঙিন এবং অপরটি সাদাকালো। অন্য পাতায় কবির পরিচয় ‘হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম’ আর তাঁর কবিতা ‘খেয়াপারের তরণী’ ছাপা হলো। ‘যাত্রীরা রাত্তিরে হ’তে এল খেয়া পার,/ বজ্রেরি তূর্যে এ গর্জ্জেছে কে আবার?/ প্রলয়েরি আহ্বান ধ্বনিল কে বিষাণে/ ঝঞ্ঝা ও ঘন দেয়া স্বণিল রে ঈশানে!’ ৩০ লাইনের কবিতাটি এভাবেই শুরু হয়েছিল।
ইমদাদ আলী দুটি ছবি নিয়েই বিস্তারিত লিখলেন, যার কিছুটা উল্লেখ করছি। তিনি লিখেছেন, ‘প্রথম চিত্র: ইহা একখানি ধর্মচিত্র। পাপের নদী উত্তাল তরঙ্গে ছুটিয়া চলিয়াছে। এই নদীতে কান্ডারীহীন গোমরাহীর তরণী আত্মরক্ষা করিতে না পারিয়া আরোহীসহ নিমজ্জিত হইতেছে। তাহার হালের দিকটা মাত্র ডুবিতে বাকি আছে। তাহার উদ্ধারের কোন আশা নাই। কিন্তু যাহারা তাওহিদের তরণীতে আশ্রয় লইয়াছেন, তাহারা বাঁচিয়া আছেন, কারণ এই তরণীর কর্ণধার হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (স.)। তাহার চারি প্রধান আসহাব এই তরণীর বাহক।
‘দ্বিতীয় চিত্র: পল্লী দৃশ্য। বিক্রমপুরের উত্তর দিকে তালতলা একটি বন্দর। এই বন্দরের পূর্ব দিকের যে গ্রামখানি নদী তীরে বিস্তৃত রহিয়াছে, চিত্রে তাহাই অংকিত হইয়াছে।
‘মৃদুল বায়ু হিল্লোলে নদী বুকে যে তরঙ্গের লীলা আরম্ভ হইয়াছে চিত্রে তাহা বড়ই সুন্দর করিয়া অঙ্কিত হইয়াছে। আলো ও ছায়ার সুসমাবেশে উহা কি মনোরমই না দেখাইতেছে।’
প্রায় শত বছর আগে একজন নারীর, তা-ও আবার রক্ষণশীল সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার থেকে চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া মোটেই সহজ ছিল না। তখন রক্ষণশীল ধ্যানধারণা পোষণের ফলে বিশেষ করে নারীদের সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রটি ছিল রুদ্ধ।
সাধারণ নিয়মানুযায়ী ঢাকার নবাববাড়ির মেয়েদের অন্দরমহলই ছিল একমাত্র ঠিকানা। কিন্তু শিল্প সৃষ্টির প্রেরণা যদি একবার সত্তায় জেগে ওঠে, তবে তাকে অবদমন করা সত্যিই কঠিন। আর তাই রক্ষণশীল পরিবার ও সমাজের বাধা অতিক্রম করে নিজেকে চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন মেহের বানু খানম।
ঢাকার নবাব খাজা আহসানউল্লাহর কন্যা মেহের বানু খানমের (নবাব সলিমুল্লাহর ছোট বোন) মায়ের নাম ছিল কামরুন্নেসা খানম। মেহের বানুর জন্ম কবে, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। লেখক অনুপম হায়াৎ অনুমান করেন, তাঁর জন্ম ১৮৮৫-৮৮ সালের মধ্যে। হায়াৎ তাঁর পুরনো ঢাকার সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘তাদের বাড়িতে ছিল দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা চিত্র শিল্পীর আঁকা ছবির সংগ্রহ। ছিল অনেক সচিত্র বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা। তিনি এখান থেকেই অঙ্কন চর্চা শুরু করেন। তবে তাঁর অঙ্কন চর্চায় কখনো কোনো জীবজন্তুর অস্তিত্ব থাকতো না। তিনি সব সময়ই প্রকৃতি ও ইসলামের ধর্মীয় চেতনাকে তাঁর শিল্পসত্তায় ধরে রাখতেন।’
দুঃখজনক বিষয় হলো, মোসলেম ভারত-এ প্রকাশিত ছবি দুটি বাদে মেহের বানুর আঁকা আর কোনো ছবি এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে মেহের বানুর চিত্রাঙ্কনরত অবস্থার একটি আলোকচিত্র পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, তিনি ইজেলের ওপরের দিকে সেঁটে রাখা একটি চিত্রের অনুকরণে ঠিক নিচেই আরেকটি কাগজে ছবি আঁকছেন। লক্ষ করলে বোঝা যায়, এটি নদীতে একটি নৌকার দৃশ্য। আলোকচিত্রে দৃশ্যমান চিত্রটি এবং প্রকাশিত অন্য চিত্র দুটি বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে তিনি ‘ল্যান্ডস্কেপ’ই বেশি আঁকতেন। এই তিনটিই নদীর দৃশ্য। সুতরাং নদী ও নৌকা, সম্ভবত, তাঁর আঁকা ছবিতে বারবার এসে থাকবে। এ সবই অনুমান মাত্র। মেহের বানুর আরও ছবি পাওয়া গেলে তাঁর ছবির বিষয় ও মান সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হওয়া সম্ভব হবে।
সম্ভবত, ১৯১২-১৩ সাল থেকে মেহের বানু ছবি আঁকা শুরু করেন। মেহের বানুর বিয়ে হয় ২৫ পৌষ ১৩০৮ বাংলা সালে অর্থাৎ ১৯০২ সালে। তাঁর স্বামী খাজা মোহাম্মদ আজম ছিলেন একজন সাহিত্যিক এবং ঢাকার পঞ্চায়েত সরদারদের তত্ত্বাবধায়ক। ঢাকার ওপর একটি উল্লেখযোগ্য বই দ্য পঞ্চায়েত সিসটেম অব ঢাকা তাঁরই লেখা। এ জন্য সংস্কৃতিমনা স্বামীর কাছ থেকে মেহের বানু শিল্পসাধনায় সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
এই সংস্কৃতিমনা পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানেরাও ঢাকার ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সেই সময়ে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। তাঁর এক ছেলে খাজা মোহাম্মদ আদিল ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক ও জাদু পত্রিকার সম্পাদক। খাজা আদিল ও তাঁর ভাই খাজা আজমলের উদ্যোগে ঢাকায় ১৯২৯-৩১ সালে ঢাকার প্রথম চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস ও সুকুমারী নির্মিত হয়। দ্য লাস্ট কিস-এর নায়ক ছিলেন খাজা আজমল নিজেই।
মেহের বানু খানম ১৯২৫ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে দিলখুশা মসজিদের পূর্ব পাশে নবাব পরিবারের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনিই ঢাকার প্রথম নারী চিত্রশিল্পী।
প্রথম আলো

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons