Total Pageviews

Friday, December 30, 2011

ধনেপাতায় ধনদৌলত

নিজের ধনেপাতা খেতে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার ভেতরকুঠি গ্রামের তৈয়ব আলী
ছবি: প্রথম আলো
শীত মৌসুমে ধনেপাতার কদর বাঙালির ঘরে ঘরে। তরিতরকারিতে স্বাদ আনতে ধনেপাতার জুড়ি নেই। মচমচে মুড়ি, তেল-মরিচ-পেঁয়াজের সঙ্গে ধনেপাতা কুচি কুচি করে কেটে মেখে খেতে খুবই মজা। অনেকেই আছেন, পাতে একটু ধনেপাতার ভর্তা হলেই তাঁদের ভরপেট ভাত খাওয়া হয়ে যায়।
গ্রামবাংলার অনেক বাড়িতে ধনেপাতার চাষ করে মূলত পরিবারের চাহিদা মেটানো হয়। তবে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সাড়াই ইউনিয়নের ভেতরকুটি গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় ধনেপাতার। ১৬ বছর আগে তৈয়ব আলীর (৬০) হাত ধরে সূচনা হয় এ চাষের। তাঁর সাফল্য দেখে গ্রামের অন্যরাও চাষে লেগে পড়েন। এখন গ্রামের মাঠের পর মাঠ ধনেপাতার চাষ হয়। যাঁদের জমি নেই, তাঁরা বর্গা নিয়ে চাষ করেন।
অথচ একসময় এ গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিলেন অভাবী। উঁচু এলাকা বলে ধানসহ অন্যান্য ফসল এখানে ভালো হতো না। খাবারও জুটত না অনেকের। তবে এখন দিন বদলেছে। ভেতরকুটির মানুষ ধনেপাতা চাষ করে ভালো করেছেন আর্থিক অবস্থা। এই গ্রামের সবাই বেশ সচ্ছল, সুখী জীবন।
এক দিন সেই গ্রামে: কাউনিয়া উপজেলার সদর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে ভেতরকুটি গ্রাম। লোকসংখ্যা হাজার দেড়েক।
কাঁচা-পাকা পথ ধরে গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে মাঠজুড়ে অসংখ্য ধনেপাতার খেত। বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চাল। আধাপাকা বাড়িও আছে কয়েকটি। কোথাও শণ বা খড়ের কুঁড়েঘর দেখা গেল না। তৈয়ব আলীর বাড়ি খোঁজ করতেই একজন দেখিয়ে দেন। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, তৈয়ব ধনেপাতা তুলছেন, সঙ্গে পুত্রবধূরাও।
সংগ্রাম: ১৯৫১ সালে অভাবের সংসারে জন্ম তৈয়ব আলীর। লেখাপড়া করা হয়নি। এক ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি বড়। ১০ বছর বয়সে মারা যান বাবা। ১১ বছর বয়সে হারান মাকে। ১৩ বছর বয়সে ধরেন সংসারের হাল।
বাড়িতে ধান সিদ্ধ করে চাল তৈরির পর তা বাজারে বেচার কাজ শুরু করেন তৈয়ব। কয়েক বছর চালের ব্যবসা করেন, কিন্তু অভাব পিছু ছাড়ে না। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে চালের ব্যবসা ছেড়ে দেন। কয়েক মাস বেকার ঘুরে বেড়ানোর পর গ্রামের মোজাম্মেল হোসেনের পরামর্শে শুরু করেন কাঁচা তরকারির ব্যবসা। ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে খেত থেকে করলা কিনতে পাশের নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলী গ্রামে যান। সেখানে নাজমুল নামের একজনের কাছে ধনেপাতা চাষ করে ভাগ্য বদলানোর গল্প শোনেন। বিষয়টি তাঁর মনে ধরে। ঠিক করেন, ধনেপাতা চাষ করে অভাব জয় করবেন।
ওই বছরের নভেম্বরে ১০ শতক জমিতে তিনি ধনেপাতার চাষ করেন। ৩০ দিনে এ ধনেপাতা বেচে খরচ বাদে চার হাজার টাকা আয়ও হয়। পরের বছর ৪০ শতকে দুই দফায় ৭০ দিনে চাষ করে আয় করেন ৩০ হাজার টাকা। এরপর পুরোপুরি লেগে পড়েন। স্ত্রী-পুত্ররাও তৈয়ব আলীর সঙ্গে হাত লাগান। সংসারে আসে সচ্ছলতা।
ধনেপাতার চাষের টাকায় কেনেন তিন একর জমি, বানান পাকা বাড়ি। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তিন ছেলে ধনেপাতা আর নানা সবজি চাষে লেগে আছেন। এবার দেড় একর জমিতে ধনেপাতার চাষ করে এক লাখ টাকা আয় করেছেন।
ভাগ্য বদলাল যাঁরা: ভেতরকুটি গ্রামের আবুল কালাম সংসার চালাতে কখনো দিনমজুরি, কখনো বা রিকশা চালাতেন। এর পরও আট সদস্যের পরিবারে অভাব লেগে থাকত। তৈয়ব আলীর সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি অন্যের ১৫ শতক জমি বর্গা নেন।
শুরু করেন ধনেপাতার চাষ। বদলে যায় ভাগ্যের চাকা। ধনেপাতা বেচার টাকায় কেনেন দেড় একর জমি। বানান পাকা বাড়ি। এবার ৮০ শতকে ধনেপাতার চাষ করে আয় করেছেন ৫২ হাজার টাকা।
গ্রামের মোসলেমার স্বামী ২০ শতক বসতভিটা আর দুই সন্তান রেখে ১২ বছর আগে মারা যান। অসহায় মোসলেমা শুরু করেন দিনমজুরি। এ কষ্ট দেখে তৈয়ব আলী পরামর্শ দেন ধনেপাতা চাষের। তৈয়বের কাছ থেকে বীজ নিয়ে মোসলেমা বসতভিটার চারদিকে ধনেপাতা চাষ করেন।
৩০ দিনের মধ্যে এ ধনেপাতা বেচে আয় হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। পরের বছর অন্যের ২০ শতক জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। এবার ৭০ শতক জমিতে এ ফসলের চাষ করেছেন। সন্তানদের নিয়ে বেশ ভালো আছেন।
গ্রামের আবদুল হালিম, ফিরোজা বেগম, মঞ্জিলা খাতুন, মোর্শেদা বেগম, সাহেদা খাতুন, জহরা বেগম, লাল মিয়াসহ অনেকেই ধনেপাতা চাষ করে ভাগ্য বদলের গল্প শোনালেন।
লাভ অনেক: গ্রামের কৃষক মোবারক হোসেন বলেন, ধনেপাতা চাষে পরিশ্রম কম। চারবার লাঙলের হাল দিয়ে চাষ করে একরে ৭০ কেজি ধনেপাতার বীজ ছিটিয়ে দিতে হয়। বীজ বপনের ২০ দিনের মাথায় হালকা একটা সেচ দিতে হয়। সার, কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। লাগে না তেমন পরিচর্যাও। ৩০ দিন পর খেত থেকে ধনেপাতা তুলে ওই জমিতে আবারও ধনেপাতা চাষ করা যায়।
কাউনিয়া উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুভলচন্দ্র বর্মণ বলেন, ধনেপাতার চাষ খুবই লাভজনক। এক একর জমিতে ধনেপাতা চাষ করতে বীজ-গোবর-চাষাবাদ বাবদ নয় থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। শুরুতে ১০০ টাকা এবং শেষে ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও একরপ্রতি ৬০ হাজার টাকা আয় হয়, যা অন্য কোনো ফসল থেকে এত কম সময়ে আয় করা যায় না।
ধূমেরকুটি গ্রামের ধনেপাতার পাইকারি ব্যবসায়ী লাল মিয়া ও আবু বকর জানান, তাঁরা খেত থেকে ধনেপাতা কেনেন। এরপর হকের বাজার, মায়ার বাজার, খানসামা বাজার, কাউনিয়া বাজার, মেরাজের বাজারে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন।
অন্যদের কথা: সাড়াই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বলেন, এক যুগ আগেও ভেতরকুটি গ্রামের মানুষের কষ্টের শেষ ছিল না। উঁচু এ এলাকায় ফসলাদি ভালো হতো না। এখন ধনেপাতাসহ নানান সবজি চাষ করে গ্রামবাসী অভাবকে জয় করেছেন। এ গ্রামের মানুষের সাফল্য দেখে পাশের বাইরাকুটি, সোনাতলা, কদমতলা, বালাপাড়া, বিশ্বনাথ চরে কৃষকেরা এসব ফসলের চাষ করছেন।
কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, ভেতরকুটি গ্রামে ১৪-১৫ বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে ধনেপাতার চাষ হচ্ছে। গ্রামের অন্তত ৭০ শতাংশ লোক এ চাষের সঙ্গে জড়িত। পুরো উপজেলায় প্রায় ৭২০ একর জমিতে ধনেপাতার চাষ হয়। prothom-alo

Friday, December 2, 2011

জয়তু সুবর্ণা আপা!

নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আ� নিজের বাড়ির উঠানে হাতপাখা ও টুপিতে নকশার কাজে তদারক করছেন পীরগাছার ইটাকুমারী গ্রামের সুবর্ণা আক্তার
ছবি: প্রথম আলো
‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছেন তাঁরা। তাঁদের হারতে হয়নি, তাঁরা জিতে চলেছেন। স্বাবলম্বী হয়েছেন, অন্যদের এগিয়ে নিচ্ছেন সেই পথে।
বলা হচ্ছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী গ্রামের নারীদের কথা। ‘গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি’ নামে সমবায় সমিতি গড়ে বদলে ফেলেছেন নিজেদের ভাগ্য। আর এই সমিতি গড়তে গ্রামের নারীদের এক সুতোয় গেঁথেছেন একজন—সুবর্ণা আক্তার। সদস্যদের কাছে তিনি কেবলই ‘সুবর্ণা আপা’।
সুবর্ণার নেতৃত্বে ওই সমিতির সদস্যরা হাতপাখা, লেপ, টুপিতে নকশা তোলা, মাছ, সবজি ও লিচু চাষ করে ইটাকুমারীকে কর্মমুখর এক গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
শুরুর গল্প: পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণের গ্রাম ইটাকুমারী। এক দশক আগেও এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ ছিল দিনমজুর।
এই গ্রামেরই সচ্ছল এক পরিবারের মেয়ে সুবর্ণা। খুব কাছ থেকে দেখা গ্রামের মানুষের এমন কষ্ট তাঁকে নাড়া দিত। কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করতেন। সেই ভাবনা থেকে তাঁর মাথায় আসে সমবায় সমিতি গড়ার কথা। বিষয়টি গ্রামের নারীদের বোঝাতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর ডাকে সাড়া দেন নারীরাও।
সাফল্যের পথে: ২০০২ সালের ১০ জানুয়ারি। সুবর্ণা ১৪০ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে গঠন করেন গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি। সিদ্ধান্ত হয়, সদস্যরা সপ্তাহে পাঁচ টাকা করে সমিতিতে জমা দেবেন। চার বছরে সমিতির সঞ্চয় আর তা বিনিয়োগ করে পাওয়া লাভে তহবিলে জমা হয় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। সদস্যরা তা ভাগ করে নেন।
২০০৫ সালে সমিতির সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ৩৫০ করা হয়। সাপ্তাহিক চাঁদা বাড়িয়ে করা হয় ১০ টাকা। দুই বছরে সদস্যদের জমা এবং তা বিনিয়োগে পাওয়া যায় তিন লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে ২০০৭ সালে তিন একর আয়তনের একটি পুকুর ও দুই একর ফসলি জমি ইজারা নেওয়া হয় সমিতির নামে। পুকুরে মাছ ও জমিতে সবজি চাষ করে এক বছরে খরচ বাদে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়। মূলধন সমিতির তহবিলে রেখে লাভের অংশ সদস্যরা ভাগ করে নেন।
এগিয়ে চলা: সুবর্ণার চাওয়া ছিল, গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী করবেন। তাই সমিতির লাভের অংশ ভাগ করে দিয়ে চুপ থাকেননি। প্রতিবেশীদের কাছে গল্প শুনে ২০০৮ সালের শুরুতে তিনি পাশের কামদেব গ্রামের রওশন আরা বেগমের কাছে যান। তাঁর কাছ থেকে শিখে নেন হাতপাখা তৈরির কৌশল। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সমিতির সদস্যদের হাতপাখা তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। সমিতির তহবিল থেকে পোশাক কারখানার পরিত্যক্ত রঙিন সুতা কিনে শুরু হয় হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির কাজ।
ওই বছরের জুন মাসে সমিতির নারীরা শুরু করেন টুপিতে নকশা তোলার কাজ। এর পর থেকে সমিতির সদস্য ছাড়াও আড়াই শতাধিক নারী হাতপাখা তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজ করছেন। পাশাপাশি অনেকে লেপ-তোষক তৈরির কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।
গৃহবধূ ছালেহা বেগম ও নাজমা আকতার জানালেন, একটি পাখা তৈরিতে ছয় থেকে সাত টাকা খরচ হয়, বিক্রি হয় ১৮ থেকে ২০ টাকায়। তাঁদের নকশা করা টুপি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। একটি লেপ তৈরি করে ২০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়।
সমিতিতে এক দিন: সম্প্রতি এক সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব বাড়িতেই নারীরা কেউ হাতপাখা, কেউ লেপ তৈরি, কেউ বা টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছেন। সুবর্ণার বাড়িতেই একটি ঘর সমিতির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহূত হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সুবর্ণা নারীদের নিয়ে সমিতির বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন।
সুবর্ণা জানালেন, সমিতির অধীনে মাছ-সবজির চাষ চলছে। চলছে হাতপাখা, লেপ তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা। ৫০ শতক আয়তনের একটি লিচুবাগান ইজারা নেওয়া হয়েছে। এসব উ ৎস থেকে আয় হওয়া অর্থ শুধু সমিতির সদস্যরাই ভাগ করে নেন না, আয়ের ৫ শতাংশ গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েদের বিয়েতে ব্যয় করা হয়। অভাবী শিক্ষার্থীদের কিনে দেওয়া হয় বই-খাতা। এ ছাড়া সমিতির উদ্যোগে নিরক্ষর গৃহবধূদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিচর্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌতুক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
সফল যাঁরা: সমিতির সদস্য আরজিনা খাতুন, খালেদা আকতারসহ কয়েকজন তাঁদের দিনবদলের গল্প শোনালেন। তাঁদের টিনের ঘর উঠেছে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। নিজেদের হাঁস, মুরগি, গাভি, ছাগল আছে। সর্বোপরি সংসারে তাঁদের মতামত গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাছনা বেওয়া জানালেন, ১৫ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। এরপর ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন। তবে এখন তাঁর হাঁস-মুরগি ও একটি গাভি আছে। ভিক্ষা ছেড়েছেন অনেক আগেই। এ সবই হয়েছে সমিতির সদস্য হয়ে।
২০০০ সালে এই গ্রামের চায়না বেগমের বিয়ে হয় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী গ্রামে। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তিন বছরের মাথায় এক সন্তানসহ তাঁকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। তিনি এই সমিতির সদস্য হয়ে এখন মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করছেন।
এ ছাড়া গ্রামের লাকী বেগম, সহিদা বেগম, মঞ্জুয়ারা খাতুন, আছমা বেগম, মাজেদা খাতুনসহ অনেকের কাছেই শোনা গেল তাঁদের অভাব জয়ের গল্প।
একজন সুবর্ণা: স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত নারী সদস্য গুলশান আরা বেগমের ছোট মেয়ে সুবর্ণা। বিএ পাস সুবর্ণার বিয়ে হয় একই গ্রামের আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে। তাঁদের সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে আছে। স্ত্রীর উদ্যোগের প্রতি সম্মান আছে স্বামী আশরাফুজ্জামানের। ‘সুবর্ণার কর্মকাণ্ডে আমরা খুশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সব সময় সমিতির কাজে উ ৎসাহ দিই।’ বলছিলেন তিনি।
ইটাকুমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান দছিজল হক বলেন, সুবর্ণার মতো নারীই এই সমাজে প্রয়োজন। ইটাকুমারী গ্রামে বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কমেছে যৌতুকের প্রবণতাও। স্বাস্থ্যসচেতনতা, শিক্ষার প্রতি আগ্রহও বেড়েছে।
যেতে চান অনেক দূর: গ্রামের নারীদের জন্য আর কী করতে চান? সুবর্ণার উত্তর, ‘প্রত্যেক সদস্যকে একটি করে বিদেশি গাভির খামার করে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। হাতপাখা, লেপ তৈরি ও টুপিতে নকশার কাজে পুরো উপজেলার দরিদ্র নারীদের যুক্ত করার বিষয়টিও মাথায় আছে।’
সুবর্ণা জানালেন, তাঁর স্বপ্ন—উপজেলার প্রতিটি নারী মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। এ জন্য নারীদের সংগঠিত করে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার আওতায় এনে বাল্যবিবাহ, যৌতুকের কুফল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে চান তিনি।
সফল হোক তাঁর এই যাত্রা!

Friday, October 21, 2011

 নিপীড়িত মানুষের প্রেরণা

  • ইলা মিত্র (জন্ম: ১৯২৫—মৃত্যু: ২০০২) ইলা মিত্র 
 কলকাতায় আন্দোলনের সময় বন্দী ইলা মিত্র
কলকাতায় আন্দোলনের সময় বন্দী ইলা মিত্র
মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ইলা মিত্র কিংবদন্তিসম এক নাম। তাঁর যুগে শ্রমের ফসল কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে যা ছিল বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আজ তা হয়েছে জাতিসত্তার পরিচয় কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে অন্তহীন সংগ্রাম। গত ১৮ অক্টোবর ছিল মহীয়সী এই নারীর জন্মদিন।

ইলা মিত্র (১৯২৫-২০০২) নিত্যস্মরণীয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্র। সংগ্রামী মানুষের আন্দোলনের ইতিহাসে দেশ-কাল-ধর্ম-জাতি-শ্রেণী-লিঙ্গ তুচ্ছ করা অনমনীয় মৃত্যুহীন প্রাণ ইলা মিত্র। তাঁর ইতি নেই। অন্তহীন তাঁর ইতিহাস, ইতিবৃত্ত ও ইতিকথা। আজও তাঁর নাম, তাঁর সংগ্রামের প্রেরণা নাচোলের অধিকারহারা সাঁওতাল জনগণের প্রাণে সাড়া জাগায়। আজও বাংলাদেশের সংগ্রামী অধিকারহারা যেকোনো স্তরের এবং শ্রেণীর মানুষ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করার জন্য ইলা মিত্রের সংগ্রাম থেকে পাঠ নেয়।

১৯৪৫ থেকে ১৯৫৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন—মাঠে-প্রান্তরে-সংগ্রামে এবং জেলে বন্দী অবস্থায়। নাচোলের তেভাগা আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা সে সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে হলেও ব্যক্তি ইলা মিত্রের সংগ্রামী চেতনার বিদ্রোহ অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো উদ্দীপ্ত করেছিল সেই আন্দোলনের অধিকারহারা সাঁওতাল কৃষক নারী-পুরুষের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে।
১৯৪৮-এ শুরু হয়ে ১৯৫০ সালের প্রথম কাল পর্যন্ত নাচোলে তেভাগা আন্দোলন বা কৃষক বিদ্রোহ উত্তুঙ্গে উঠেছিল। সাঁওতাল এই কৃষকদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ভারত উপমহাদেশের সাঁওতাল পরগনা জেলার অধিবাসী। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সাঁওতাল আদিবাসীরা মহাবিদ্রোহের হুংকার তুলেছিলেন। সেই বিদ্রোহীরা এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের সাঁওতাল অধিবাসীরা নিজ বাসভূমে শান্তিতে বাস করতে পারেননি—হয়েছিলেন শোষিত, নির্যাতিত, জীবিকাবঞ্চিত দরিদ্র, নিঃশেষিত। এঁরা ছিলেন বর্গাচাষি। বর্গাচাষিদের শ্রমের ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ কেড়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে জোতদারেরা কৃষকের ন্যায্য অধিকারের ওপর আঘাত করলেন। কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক সাঁওতালদের সংগঠিত করে নাচোলের তেভাগা আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের পর সে সময় দেশের অন্যান্য স্থানের তেভাগা আন্দোলনের নতুন জাগরণ ঘটেনি—শেষ হয়ে গিয়েছিল তেভাগা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড। হঠাৎ করেই নতুন পর্যায়ের তেভাগা আন্দোলন শুরু হলো নাচোলে।
নাচোল থানার চণ্ডীপুর গ্রামের সাঁওতাল নেতা মাতলা সরদার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন। সেই এলাকার কমিউনিস্ট রমেন মিত্র, ইলা মিত্র, অনিমেষ লাহিড়ী, শিবু কোড়ামুদি, বৃন্দাবন সাহা, আজহার হোসেন, চিত্ত চক্রবর্তী আত্মগোপনে থেকে সাঁওতালদের সংগঠিত করেছেন, এলাকার অন্যান্য হিন্দু-মুসলিম ধর্মনির্বিশেষে সব কৃষক সংগঠিত হয়েছিলেন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে।
পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণ-কর্তৃত্ব নাচোলের সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুতে কৃষক সমিতির নেতারা আহ্বান জানালেন আমন ধান কেটে তিন ভাগের দুই ভাগ ধান নিজেদের গোলায় তোলার জন্য। সে সময়ে পার্টির নেতা রণদীভের তত্ত্ব এবং নির্দেশিত সিদ্ধান্তে হঠকারীভাবে, অপ্রস্তুত পদ্ধতিতে নাচোলে কৃষক বিপ্লব ও পুলিশ-কৃষক সংঘর্ষ ঘটল এই ধান কাটা ও তিন ভাগের দুই ভাগ কৃষকের গোলায় তুলে নেওয়ার আন্দোলনের ফলে।
এ অবস্থায় পুলিশি আক্রমণের সময় ইলা মিত্র ছদ্মবেশে আত্মগোপনে যাওয়ার পথে ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি পুলিশের হাতে বন্দী হন রহনপুর স্টেশনে। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত জেল-জুলুম আর শারীরিক-মানসিকভাবে পুলিশি সন্ত্রাস ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
১৯৫০-৫৪ পর্যন্ত তাঁর মুক্তির দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাঁকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠায় পাকিস্তান সরকার।

 
ইলা মিত্রের সংগ্রাম সে সময় থেমে যায়নি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তিনি আজীবন রাজনৈতিক আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে নিবেদিত ছিলেন। একসময়ের ক্রীড়াবিদ ইলা সেন, বেথুন কলেজের ছাত্রী ইলা সেন। বিদ্রোহে-বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠেছিলেন ইলা মিত্র। তাঁর জীবন ছিল কর্মময়। অধ্যাপনার পেশায় তিনি যেমন ছিলেন কর্মনিষ্ঠ, তেমনি নিবেদিত ছিলেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। মানুষের কল্যাণ সাধনায় ছিলেন তিনি সক্রিয় মানবতাবাদী।
তাঁর সংগ্রামী জীবনের নানা দিকের আলোকপাতে আমরা জানি তিনি কখনোই অতিমানব হয়ে ওঠার আগ্রহ পোষণ করেননি; বরং সেই ধরনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর সংগ্রাম ছিল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ‘রাষ্ট্র বনাম অধিকারহারা মানুষের সংগ্রাম’। এই সংগ্রামের উত্তরাধিকারীদের কাছে তিনি দিয়ে গেছেন তাঁর এবং আরও সব বিপ্লবী-সংগ্রামীর অসমাপ্ত কাজ। সেই সংগ্রামের সূত্র ধরেই ইলা মিত্র আজও প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক এবং যুদ্ধ-সন্ত্রাসের শিকার করা হয়েছিল ইলা মিত্রকে। ‘নারীর বিদ্রোহ’ বলে ভাবা হয়েছিল তাঁর সংগ্রামকে। তাই তাঁর শরীরের ওপর নির্যাতনের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বীভৎস কদর্যরূপে নিজেদের কলঙ্ক লেপন করতে চেয়েছিল। পারেনি ইলা মিত্রের মনোবল ভেঙে দিতে। তাঁর পাশে এ দেশের অগণিত মানুষ দাঁড়িয়েছিল। নিপীড়িত মানুষ নিজেদের শিকল ছিঁড়েছে তাঁর বন্দিত্বের শিকল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে।
ইলা মিত্র জন্ম নিয়েছিলেন ১৮ অক্টোবর ১৯২৫ সালে। তাঁর জীবনাবসান হয়েছে ১৩ অক্টোবর ২০০২ সালে। ৭৭ বছরের সংগ্রামী, প্রাণস্ফূর্ত ইলা মিত্র দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। তাঁর স্মরণে ইতিহাসের মর্মবাণী গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে নিপীড়িত সাঁওতালসহ প্রান্তিক, দলিত, অধিকারহারা আদিবাসীদের অস্তিত্বের সংগ্রাম। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস রূপান্তরিত হয়েছে সাঁওতাল-প্রান্তিক আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ পরিচয় বাংলাদেশের সংবিধানে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে। এমনকি সম্প্রতি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও তাদের আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি মেলেনি।
ইলা মিত্রের সংগ্রামের যুগে যা ছিল ‘শ্রমের ফসল কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে’ বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আজ তা হয়েছে ‘জাতিসত্তার পরিচয় কেড়ে নেওয়ার’ বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার অন্তহীন সংগ্রাম। এই সংগ্রামের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরম্পরায় ইলা মিত্র সম্পৃক্ত হয়ে আছেন; থাকবেন যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত-অধিকারহারা মানুষের সংগ্রামের প্রেরণারূপে। প্রথম আলো

Saturday, October 1, 2011

স্বপ্ন পূরণের সারথি

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্লাস নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী একজন শিক্ষক সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্লাস নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী একজন শিক্ষক
ছবি: প্রথম আলো
অভাবের সংসারে ইরফানের জন্ম। একদিন বাবা মারা গেলেন। ইরফান তখন মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে। থমকে দাঁড়াল লেখাপড়া শিখে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন। সংসারের হাল ধরতে ওই বয়সেই কাজ নিতে হলো পাটকলে।
তবে ইরফানের স্বপ্ন থমকে দাঁড়াতে দেয়নি ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মানুষ হওয়ার স্বপ্নের জাল বুনছেন।
শুধু ইরফান নন, তাঁর মতো অন্তত ৪০০ শিক্ষার্থী ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’র সহায়তায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সারথি একজন হাফিজুর রহমান। তিনিই গড়ে তুলেছেন বিনা পয়সার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’। নরওয়ে প্রবাসী হাফিজুরের বাড়ি খুলনা মহানগরের ফুলবাড়ী গেটে। নগরের যোগীপোল এলাকায় চলছে তাঁর এ শিক্ষা কার্যক্রম।
যেভাবে শুরু: স্কুলে পড়ার সময় থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা ভাবতেন হাফিজুর রহমান। স্বপ্ন দেখতেন, একটি দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষিত সমাজের। সেই স্বপ্নের কাজ শুরু করেন নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন। তখন থেকেই বাড়ির পাশের বস্তির শিশুদের বাড়িতে এনে বিনা পয়সায় পড়াতেন। পুরো ছাত্রজীবনে এটা চালিয়ে যান। ২০০৫ সালে সাতটি শিশুকে বই-খাতা কিনে দিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন তিনি। একই বছর উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে নরওয়ে চলে যান। তবে সেখানে গিয়েও ওই সব শিশুর কথা ভোলেননি। ওদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেন ভাগনে আল আমিনকে।
আল আমিন নিজের বাড়ির একটি কক্ষে মাদুর বিছিয়েই ওদের পড়াতেন। মামা-ভাগনের এই উদ্যোগের কথা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বিষয়টি মামাকে জানান আল আমিন। মামা নরওয়ে থেকে তাঁর বৃত্তির অর্থ থেকে একটি অংশ পাঠিয়ে দেন। সেই অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি বেঞ্চ, একটি ব্ল্যাকবোর্ড ও কিছু বই-খাতা কেনেন আল আমিন। চালিয়ে যান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর কাজ।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: হাফিজুর রহমানের এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০০৮ সালে গঠিত হয় ‘বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা’ (এডুকেশন ফর ডিপ্রাইভ স্টুডেন্ট), সংক্ষেপে ইডিএস। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন হাফিজুরের বৃত্তি থেকে পাঠানো অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে নরওয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পান হাফিজুর। তাঁর বেতন থেকে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা করে পাঠানো শুরু করেন। ওই বছর প্রতিষ্ঠানের জন্য আট লাখ টাকা দিয়ে নগরের যোগীপোল এলাকায় একটি একতলা ভবন কেনা হয়। পরের বছর ওই ভবনে পড়ানোর কাজ শুরু করেন আল আমিন। শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমে পড়ানো শুরু করেন।
শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ায় ওই ভবনেও জায়গা হচ্ছিল না। তাই ভবনের পাশের গোলপাতার ছাউনির একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়। এখানে সকাল ও বিকেলে পালা করে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ২০০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চলছে।
কিন্তু শিক্ষার্থী আরও বাড়তে থাকায় সোনালী জুটমিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অ্যাজাক্স জুটমিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই পালায় আরও ২০০ শিক্ষার্থীকে পড়ানো হচ্ছে।
সাড়া: নগরের মহেশ্বরপাশা, কার্তিককুল, তেলিগাতি, খানাবাড়ী, জাবদিপুর, যোগীপোল, বণিকপাড়া, মানিকতলা, কালীবাড়ি, সেনপাড়া ও ফুলবাড়ী গেটসহ বিভিন্ন এলাকার হতদরিদ্র ও স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তানেরা এখানে পড়ছে। অভাবী পরিবারের যে শিশুরা ভিক্ষা, দিনমজুরি বা চুরিতে জড়িয়ে পড়েছিল, হাফিজুরের প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এখন তারা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিনোদন, খেলাধুলা ও বনভোজনেরও ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। ভালো ফলের জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।
এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা অনেকেই ভালো ফল করছে। চলতি বছর এখানে পড়াশোনা করেছেন এমন ১২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষা দেন। সবাই পাস করেছেন। একজন জিপিএ ৫ পেয়েছেন। যাঁদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তাঁরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংয়ের ফিও দিচ্ছেন হাফিজুর।
শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবক: আটজন শিক্ষককে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে। সঙ্গে রয়েছেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী। তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমে পড়াচ্ছেন। সঙ্গে আছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মতিউল ইসলাম ও খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক বিষ্ণু সরকার।
স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেলিম রেজা বলেন, ‘হাফিজুর রহমানের এমন মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে অংশীদার হতে পেরে আমি গর্বিত।’
ওদের কথা: নগরের ফুলবাড়ী গেটের হোটেল কর্মচারী আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে মারিয়া বেগম। তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। হাফিজুরের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয় তাকে। এখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। ‘হাফিজুর ভাই না হলে ক্লাস এইটে ওঠা হতো না।’ জানাল, মারিয়া।
ভ্যানচালক আবুল গাজীর মেয়ে জান্নাতুল আখতার। পঞ্চম শ্রেণীর পর সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছিল না। এখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। জান্নাতুল বলে, ‘হাফিজুর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে বিনা পয়সায় পড়ছি। এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছি।’
নরসুন্দর বিষ্ণুপদ সরকারের ছেলে গৌরাঙ্গ সরকার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। ছেলেকে ওই প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রসঙ্গ তুললে বিষ্ণুপদের উত্তর, ‘প্রাইভেট পড়াতে না পারায় ছেলে পড়াশোনায় ভালো করছিল না। ওখানে পাঠানোর পর ভালো করছে।’
তাঁরা যা বলেন: প্রায় শুরু থেকেই হাফিজুর রহমানের উদ্যোগের সঙ্গে আছেন আল আমিন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ‘মামার এই উদ্যোগে সহায়তা করতে পেরে আমি গর্বিত। তাঁর মতো মানুষ আমাদের সমাজের দৃষ্টান্ত।’ বলেন, আল আমিন।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান কে এম আজহারুল জানান, তিনি কয়েকবার ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটা ভালো উদ্যোগ। এতে উৎসাহ দিতে আমার বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওখানে স্বেচ্ছাশ্রমে ক্লাস নিতে উদ্বুদ্ধ করেছি। অনেকে ক্লাসও নিচ্ছে।’
মুঠোফোনে কথা হয় হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান তাঁর স্বপ্নের কথা। ‘এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করবে। দেশ ও জনগণ এগিয়ে যাবে। জানি কঠিন কাজ, তার পরও চেষ্টা থাকবে।’ বলে যান তিনি, ‘প্রতিষ্ঠানটি আমার প্রাণ। এটি আরও বড় করার ইচ্ছা আছে। আমার স্বপ্ন সেদিনই সার্থক হবে, যেদিন সুবিধাবঞ্চিত এই শিক্ষার্থীরা শিক্ষিত হয়ে সমাজে আলো জ্বালাবে

Friday, September 16, 2011

দীপ জ্বেলে যাই

পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে জনির পাঠশালায় পাঠদান চলছে
ছবি: প্রথম আলো
ছেলে অসুস্থ। ওষুধ খাওয়াতে হবে। আশপাশে কেউ নেই যে সাহায্য নেবেন। গ্রামের নিরক্ষর মা ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। একপর্যায়ে ওষুধ মনে করে ঘরে থাকা কীটনাশক ছেলের মুখে তুলে দিলেন। যখন বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে।
মর্মান্তিক এ ঘটনা প্রতিবেশী এক তরুণের মনে নাড়া দেয়। ওই তরুণ ভাবেন, ওই মা যদি লিখতে-পড়তে পারতেন, তবে হয়তো এমন ভুল করতেন না। এসব মানুষকে শিক্ষার আলো দেওয়ার ব্রত নেন তিনি। সেই ব্রত থেকেই গ্রামে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। গৃহশিক্ষকতা করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যাত্রা শুরু সেই পাঠশালার, যেটি পরিচিতি পায় ‘জনির স্কুল’ নামে।
তরুণের নাম নজরুল ইসলাম জনি। পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে তাঁর বাড়ি। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। পড়াশোনা করেছেন এইচএসসি পর্যন্ত। এরপর ওই স্কুল নিয়েই ব্যস্ত।
শুরুর কথা: মন নাড়া দেওয়া ওই ঘটনাটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের। এ ছাড়া লেখাপড়া না জানায় গ্রামের সাধারণ মানুষের নানাভাবে প্রতারণার শিকার হওয়া, শিশু ও নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, মাদকের ছোবল তো আছেই। বিষয়টি ভাবায় জনিকে। তিনি চিন্তা করেন, শিক্ষাই এর সমাধান। এসব নিয়ে আলোচনা করেন সহপাঠী একই গ্রামের একরামুল হাসানের সঙ্গে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন পাঠশালা গড়বেন। দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেন জনির বাড়ির পাশের সুপারির বাগানে গ্রামের নিরক্ষরদের পড়ানো হবে।
জনি ও একরামুল তাঁদের ইচ্ছার কথা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানান। নিরক্ষর নারী-পুরুষকে পড়তে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নারীদের ঘর থেকে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে খোলা আকাশের নিচে শুরু হয় লেখাপড়া। প্রথমদিকে সেখানে পড়তে আসত মাত্র ১৮ থেকে ২০ জন। দুটি পালায় পড়ানো শুরু হয়। বিকেলে পড়েন নারীরা, রাতে পুুরুষেরা। জনির প্রাইভেট পড়ানোর টাকায় কেনা তিনটি হারিকেন ও পাঁচ লিটার কেরোসিন তেল দিয়ে শুরু হয় রাতের পড়া।
দিনের পালায় পড়ানো ভালোমতো চললেও রাতের পালায় সমস্যা হতো। কারণ, কেরোসিন কেনার খরচ কম নয়। একপর্যায়ে একরামুলের সহায়তা আর পান না জনি।
জনির হার না মানা মানসিকতা দেখে এগিয়ে আসেন গ্রামের দিনার চৌধুরী। দুজনে মিলে স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের বই, খাতা-কলম, চক-ডাস্টার, বসার চট, মোমবাতি-হারিকেনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করেন। তার পরও যেন এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না। জনির উদ্যোগের কথা জানতে পেরে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা এগিয়ে আসেন।
জনির বাড়ির উঠানে টিনের চালা করে বানানো হয় পাঠশালা। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে তিন পালায় চলছে পাঠদান। দুপুরের পালায় পড়ানো হয় শিশুদের। বর্তমানে এ পালায় সুবিধাবঞ্চিত ৩৬টি শিশু পড়াশোনা করছে। বিকেলের পালায় পড়ছেন ৩০ জন নারী। আর রাতের পালায় পড়েন ২৫ থেকে ৩০ জন পুরুষ। কাউকে বেতন দিতে হয় না।
পাঠশালার শিক্ষক বলতে জনি নিজেই। শিশুরা ছয় মাস এখানে পড়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়। বয়সী নারী-পুরুষেরাও ছয় মাস এখানে পড়েন।
আরও কিছু: জনির পাঠশালায় লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রথা রোধ, ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি, মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বিপদে-আপদে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করা, সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা, বাড়িতে ছোটখাটো খামার তৈরি, শাকসবজির বাগান, হাঁস-মুরগি-কবুতর, গরু-ছাগল পালনেও উদ্বুদ্ধ করা হয়।
একদিন পাঠশালায়: জনির পাঠশালায় ঢুকে দেখা গেল, দুই সারিতে বসে শিশুশিক্ষার্থীরা বই নিয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার জানাল, সে আগে স্কুলে যেতে পারেনি। এখন জনির স্কুলে এসে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক সব বিষয় পড়ছে।
কথা হলো বিকেলের পালায় পড়তে আসা গৃহবধূ আছিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি বললেন, পড়তে না পারায় ওষুধ ভেবে ছেলেকে কীটনাশক খাইয়েছিলেন। সেই যন্ত্রণা এখনো ভোগ করছেন। এ স্কুলে এসে এখন পড়া ও লেখা দুটোই পারেন। ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে পারিনি। কম বয়সেই বিয়ে হয়। পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল। এখন এই স্কুলে এসে পড়াশোনা করছি।’ বলছিলেন গৃহবধূ মমতাজ বেগম। গৃহবধূ সহিদা বেগম বললেন, প্রথম প্রথম পড়তে আসতে লজ্জা লাগত। কিন্তু এখন ভালোই লাগছে।
সারা দিন খাটা-খাটুনির পর রাতের পালায় পড়তে আসেন মনজুর রহমান (৪০)। ‘পড়াশোনা না জানলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এখন পড়তে ও লিখতে পারি।’ সরল উত্তর মনজুরের।
অন্যদের কথা: জনির সহযোগী দিনার বলেন, ‘জনির মহ ৎ উদ্যোগ আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। তাই ওঁর সঙ্গে যোগ দিই। এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পেরে ভালোই লাগছে।’
জনির বাবা আবদুস ছাত্তার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আবদুস ছাত্তার বলেন, এ কাজকে প্রথমদিকে ছেলের পাগলামি মনে হতো। এখন সবাই ছেলের প্রশংসা করে। খুব গর্ব হয়।
পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মো. মজাহারুল হক প্রধান এ উদ্যোগের প্রশংসা করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। একই কথা বলেন পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলাম। তিনি স্কুলের উন্নয়নে সহযোগিতাও করেছেন।
জনির ইচ্ছা: এরই মধ্যে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন জনি। সাক্ষরতাদানে বিশেষ অবদান রাখায় ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে জেলা প্রশাসন জনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্মাননা সনদ’ দিয়েছে।
জনি বলেন, ‘ইচ্ছা আছে পাঠশালার জন্য একটি পাকা ঘর তৈরি করার। সেখানে বিদ্যু ৎ, পানীয় জল এবং শৌচাগার থাকবে। এ ছাড়া সুযোগ পেলে এ এলাকার প্রতিটি গ্রামে এমন একটি করে পাঠশালা গড়ে তুলব।

Wednesday, September 14, 2011

 কিলিমানজারো জয় করলেন মুসা ইব্রাহীম ও নিয়াজ

কিলিমানজারোর উহুরু পিক-এ বাংলাদেশের পতাকা হাতে (বাঁ থেকে) নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও মুসা ইব্রাহীম: কিলিমানজারোর উহুরু পিক-এ বাংলাদেশের পতাকা হাতে (বাঁ থেকে) নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও মুসা ইব্রাহীম: ছবিটি ই-মেইলে পাঠিয়েছেন মুসা ইব্রাহীম
বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী পর্বতারোহী মুসা ইব্রাহীম এবার জয় করলেন আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট কিলিমানজারো। নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশের (এনএসিবি) এই অভিযানে মুসার সঙ্গে এ পর্বতচূড়া জয় করেছেন নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী। কিলিমানজারো জয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ চূড়া জয়ের (সেভেন সামিট) দ্বিতীয় ধাপ অতিক্রম করল এনএসিবি।
মুসা ইব্রাহীম ই-মেইল বার্তায় জানান, ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সকাল সাতটা ৪৮ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১০টা ৪৮ মিনিট) কিলিমানজারো জয় করেন দুই বাংলাদেশি পর্বতারোহী। তানজানিয়ায় অবস্থিত ১৯ হাজার ৩৪০ ফুট উঁচু আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতে এদিন এনএসিবির সাধারণ সম্পাদক মুসা ইব্রাহীম ও সদস্য এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। এনএসিবির পক্ষ থেকে এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
জানা যায়, এই অভিযানে কিলিমানজারো পর্বতের মাচামি রুট অনুসরণ করা হয়। তবে এই অভিযানের অপর সদস্য ৫৭ বছর বয়সী এম এ সাত্তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১১ সেপ্টেম্বর ১৩ হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বারানকো ক্যাম্প থেকে মোশি শহরে ফিরে আসেন।
এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর এনএসিবির সদস্যরা ছয় হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মাচামি গেট থেকে কিলিমানজারো পর্বতাভিযান শুরু করেছিলেন। এরপর মাচামি ক্যাম্প, শিরা ক্যাম্প ও বারানকো ক্যাম্প হয়ে তাঁরা ১১ সেপ্টেম্বর ১৫ হাজার ৮৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সর্বশেষ ক্যাম্প বারাফুতে পৌঁছান। এখান থেকে অভিযাত্রীরা ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত সোয়া একটায় পর্বতচূড়া জয়ের জন্য যাত্রা (সামিট পুশ) শুরু করেন। ছয় ঘণ্টা ৩৩ মিনিট আরোহণ শেষে তাঁরা কিলিমানজারোর সর্বোচ্চ পয়েন্ট ১৯ হাজার ৩৪০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট উহুরু পিকে পৌঁছে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। একই দিন তাঁরা ১০ হাজার ১৬৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মেওকা ক্যাম্পে নেমে আসেন।
এনএসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গতকাল মেওকা গেটে কিলিমানজারো ন্যাশনাল পার্ক ও তানজানিয়া ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষ তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে উহুরু পিক আরোহণ করার সনদ দেন। ২০ সেপ্টেম্বর তাঁরা দেশে ফিরবেন।
সামিট গ্রুপ, এমিরেটস এয়ারলাইনস, শাহ্ সিমেন্ট, জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড ও ডেইলি স্টার এনএসিবির সেভেন সামিট অভিযানের কিলিমানজারো পর্বতাভিযান পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
কিলিমানজারো অভিযানের প্রাক্কালে মুসা ইব্রাহীমকে বাংলাদেশের পর্যটন দূত হিসেবে ঘোষণা দেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদের। মুসা ইব্রাহীম ২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করে সেভেন সামিটের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেন।

Friday, September 2, 2011

মাহামুদা এখন সবার প্রিয়

হাতপাখা তৈরি করতে ব্যস্ত তারাগঞ্জ উপজেলার পাশারী পাড়া গ্রামের মাহমুদাসহ গ্রামের অন্য নারীরা হাতপাখা তৈরি করতে ব্যস্ত তারাগঞ্জ উপজেলার পাশারী পাড়া গ্রামের মাহমুদাসহ গ্রামের অন্য নারীরা
ছবি: প্রথম আলো
চতুর্থ শ্রেণীতে উঠে অভাবের কারণে স্কুল ছেড়েছিল মেয়েটি। ১৪ বছর বয়সে বাধ্য হয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে বসতে। দিনমজুর স্বামীর সংসারে এসেও অভাব পিছু ছাড়েনি। জোটেনি ঠিকমতো দুইবেলা ভাতও। এরই মধ্যে মেয়েটি স্বপ্ন দেখেছে নিজে কিছু করার। একসময় শুরু করে হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা। আসে সাফল্য। অভাবের সংসারে আসে সচ্ছলতা।
এই সংগ্রামী মানুষটির নাম মাহামুদা বেগম। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের পাশারীপাড়া গ্রামে তাঁর বাড়ি।
হাতপাখা তৈরি করে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাঁর দেখানো পথেই ওই গ্রামের অন্তত তিন শতাধিক গৃহবধূ দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। তালপাখা তৈরি করে বেশ কাটছে তাঁদের দিন।
মাহামুদা এখন গ্রামের সবার প্রিয়। তাঁর স্বামীর কথা, ‘অর জন্যে হামারা এলা সমাজোত মাথা উঁচা করি চলবার পারি।’
সংগ্রাম: তারাগঞ্জের হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের নদীরপার গ্রামে ১৯৬৫ সালে দরিদ্র পরিবারে জন্ম মাহামুদার। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। বাবার অভাবের সংসার। ১৯৭৯ সালে বাবা মোবারক হোসেন কিশোরী মেয়েকে তুলে দেন পাশারীপাড়া গ্রামের খোয়াজ উদ্দিনের হাতে।
স্বামীর বাড়িতে এসেও সুখ হয়নি মাহামুদার। প্রায়ই অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হতো। কিন্তু এত অভাব, এত দরিদ্র তিনি মেনে নিতে পারেন না। তাঁর কিশোরী মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। স্বপ্ন দেখেন নিজে কিছু করার। মুড়ি বানিয়ে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন। এতে কিছু আয় হয়। এক বছরের লাভের টাকায় কেনেন চারটি ছাগল। তাঁর নতুন জীবনের গল্পটা এখান থেকে শুরু।
গল্পটা এ রকম: ১৯৯০ সালে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুরা গ্রামের হাতপাখা বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম পাশারীপাড়া গ্রামে পাখা নিয়ে আসেন। মাহামুদা তাঁর কাছ থেকে দুটি পাখা কেনেন। হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি এলে তিনি মাহামুদার বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নেন। সারা দিনে ঝড়-বৃষ্টি না থামায় তাঁকে রাত যাপন করতে দেন মাহামুদার শ্বশুর আফজাল হোসেন। রাতে খাওয়ার সময় নানা কথার ফাঁকে রফিকুল মাহামুদাকে পাখা তৈরির পরামর্শ দেন। পরের দিন পাখা বিক্রি শেষে বিকেলে রফিকুল তাঁর বাড়িতে মাহামুদা ও তাঁর শ্বশুরকে নিয়ে যান। রফিকুলের স্ত্রী মমতাজ খাতুন মাহামুদাকে দুই দিনে শিখিয়ে দেন পাখা তৈরির কলাকৌশল।
বাড়ি ফিরে মাহামুদা তাঁর স্বামীকে তালপাতা সংগ্রহ করতে বললে তিনি এনে দেন। দুই দিনে মাহামুদা তৈরি করেন ২৫টি পাখা। এ পাখা বেঁচে আয় হয় ৮০ টাকা। খুলে যায় মাহামুদার চোখ। স্বামী-স্ত্রী লেগে পড়েন পাখা তৈরির কাজে। ভালো মুনাফা হওয়ায় বদলাতে থাকে সংসারের মলিন চেহারা।
তাঁর উন্নতি দেখে প্রতিবেশী অন্য নারীরা পাখা তৈরির কৌশল শিখতে আসেন। মাহামুদা তাঁদের শিখিয়ে দেন।
পাশারীপাড়া গ্রামের তিন শতাধিক গৃহবধূ ছাড়াও দামোদরপুর, ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের শতাধিক নারী এখন পাখা তৈরি করে বেশ আয় করছেন।
মাহামুদা পাখা বিক্রির টাকায় এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। কিনেছেন আবাদি জমি। খড়ের ঘরের জায়গায় উঠেছে টিনের ঘর। বাড়িতে বসিয়েছেন নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। তিনটি গাভি, হাঁস-মুরগি ও ছাগল আছে। নলকূপের কিনারেই বানিয়েছেন ছোট্ট একটি পুকুর, তাতে চলছে হাঁস পালন ও মাছের চাষ। তাঁর দুই মেয়ে লেখাপড়া করছে। দুই ছেলে বিয়ের পর পাখার ব্যবসা করে আলাদাভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
মাহামুদার পথ ধরে: মাহামুদার পথ অনুসরণ করে যাঁরা সফল হয়েছেন, তাঁদের একজন লাইলী খাতুন। ১২ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। এখন প্রতি মাসে তাঁর গড়ে তিন হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
হাছিনা খাতুনের স্বামী মনোয়ার হোসেন জুয়া খেলতেন। হাছিনা সংসার চালাতেন ঝিয়ের কাজ করে। মাহামুদার পরামর্শে ১০ বছর আগে তিনি হাতপাখা তৈরি শুরু করেন। স্বামী জুয়া ছেড়ে এখন করেন পাখা বিক্রির ব্যবসা।
সোহাগী খাতুনের বিয়ে হয় ১৪ বছর বয়সে। ভূমিহীন স্বামীর আয়ে সংসার চলত না। তিন সন্তান নিয়ে প্রায়ই উপোস থাকতে হতো। এখন তাঁর পাখা তৈরির আয়ের টাকায় সংসার চলছে, স্বামীর আয় জমা থাকছে।
ওই পল্লিতে এক দিন: পাশারীপাড়া গ্রামের ৩০০টি পরিবারের কেউ পাখার কারিগর, কেউ ব্যবসায়ী। সম্প্রতি গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, কেউ পাখা বানাচ্ছে, কেউ তালপাতা পানিতে ভেজাচ্ছে। কেউ পাখার জন্য বাঁশের শলা কেটে রোদে শুকাতে দিচ্ছে। ঘরের কাজ সামলাতে সামলাতে, বিশ্রাম নিতে নিতে চলছে পাখা তৈরির কাজ।
মাহামুদার বাড়িতে দেখা গেল, তিনি পাখা বানাচ্ছেন। তাঁকে সহায়তা করছে দুই মেয়ে। গ্রামের অন্য ১৫-২০ জন নারীও তাঁর উঠানে বসে পাখা বানাচ্ছেন।
পাখার কারবার শুরু হয় চৈত্র মাস আসার আগেই। চলে কার্তিকের শুরু পর্যন্ত।
তৈরির কৌশল: ঘুরানি, পকেট, হরতন, মোড়া, একডান্ডা, ধাড়াইসহ বিভিন্ন ধরনের পাখা তৈরি করেন তাঁরা। পাখা তৈরিতে মূলত ব্যবহূত হয় তালপাতা, বাঁশ, খুদে পেরেক, সুই-সুতা ও রং। প্রথমে শুকানো তালপাতা চার-পাঁচ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। তালপাতা পানি থেকে তুলে বাঁশের কঞ্চির কলম লাগিয়ে রোদে শুকাতে হয়। এরপর রাতে খোলা আকাশের নিচে রেখে সকালে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে তালপাতার চারদিকে গোলাকার করা হয়। সবশেষে পাখায় সুই-সুতার কাজ করা হয়। এরপর রং দিয়ে চোখ জুড়ানো নানা নকশা করা হয়।
পাখা তৈরির কারিগর আসমা খাতুন জানান, একটি তালপাতা তাঁরা নয়-১০ টাকায় গাছের মালিকদের কাছ থেকে কেনেন। একটি তালপাতা দিয়ে ১০ থেকে ১৪টি পর্যন্ত পাখা বানানো যায়। পাইকারেরা গ্রামে এসে পাখা কিনে নিয়ে যায়। এ পাখা চলে যায় দিনাজপুর, রাজশাহী, নীলফামারী, গাইবান্ধা। ঢাকায়ও যায়। প্রতিটি পাখা তৈরিতে খরচ পড়ে দুই থেকে তিন টাকা। বিক্রি হয় আট থেকে ১০ টাকা। একজন কারিগর দিনে ৩০-৩৫টি পাখা তৈরি করতে পারেন।
পরিবারের কথা: মাহামুদাকে নিয়ে গর্বিত তাঁর স্বামী খোয়াজ উদ্দিন। আলাপকালে বললেন, ‘বাহে, আগোত সমাজোত হামার কোনো দাম আছিল না। সোবায় মোক ডাকতো কিষান খাটা কয়া। অভাবের জন্যে মাহামুদার সাথে মোর প্রত্যেক দিন ঝগড়াও নাগছিলো। আশ্বিন-কার্তিক মাসতো থাকপার নাগছিলো সেক আলু উসা (মিষ্টি আলু সেদ্ধ) খায়া। মাহামুদাই সংসারের চাকা ঘুরি দিছে। অর জন্যে হামরা এলা সমাজোত মাথা উঁচা করি চলবার পারি।’
মাহামুদার ছেলে রবিউল ইসলামেরও একই কথা, ‘আগতো গ্রামের ছেলেমেয়েরা হামাক কিষান খাটার বেটা কয়া গালি দিত। এলা ওমরা ফির ডাকি কথা কয়, আদরও করে।’
তাঁরা যা বলেন: সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মহিলা সদস্য রেহেনা আক্তার বলেন, আগে ওই গ্রামের মানুষের কষ্টের শেষ ছিল না। তারা সরকারি ত্রাণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে ধরনা দিত। গ্রামের নারীরাও তাঁদের স্বামীর হাতে নানা রকম নির্যাতনের শিকার হতেন। এখন গ্রামটির চিত্র বদলে গেছে।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুন নবী বলেন, ‘পাশারীপাড়া গ্রামের নারীরা পরিশ্রমী। তাঁরা সংসারের অন্য কাজের ফাঁকে হাতপাখা তৈরি করে যেভাবে বাড়তি আয় করছেন, অন্য এলাকার নারীরাও তাঁদের অনুসরণ করে অনুপ্রেরণা পেতে পারেন।’
রহিদুল মিয়া, তারাগঞ্জ, রংপুর Prothom-alo

 
Design by Wordpress Theme | Bloggerized by Free Blogger Templates | JCPenney Coupons